২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮:০৮

ফিরে দেখা ৭৫৩ একরের কাব্যলীলা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস  © টিডিসি ফটো

ঘটনাবহুল সাল ২০২০। বছর জুড়েই ঘটনার ঘনঘটা গোটা বিশ্বময়। বছরের শুরুতেই করোনা নামক অদৃশ্য শক্তির মায়াজালে আটকা পড়েছে বিশ্ব। সফলতার তুঙ্গে বিচরণ করা বিশ্বকে নিমেষেই ঘরবন্দী করেছে করোনার এই ভয়াল থাবা। একদিকে মার্চের মাঝামাঝি থেকে শিক্ষার্থীরা হয়েছে শিক্ষাঙ্গন ছাড়া। অন্যদিকে থমকে যাচ্ছিল অর্থনীতির চাকা। নীতি-দুর্নীতি, সুখ-দুঃখ এবং সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে এবছরে দেশ ও জাতির মধ্যে রচিত হয়েছে এক নতুন কাব্য।

এদিকে বছরজুড়ে সেই কাব্যের আলোচিত অংশ হয়েছে দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রাঙ্গনটিও। প্রশাসনের দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, উড়োচিঠিতে শিক্ষককে হত্যার হুমকি, ধর্ষণের ঘটনাগুলো যেমন হৃদয়বিদারক, অপরদিকে শিক্ষা ও গবেষণায় অবদান, ৫০ বছরের মাস্টার প্ল্যান, করোনায় দরিদ্রদের খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের বিষয়গুলো সমান প্রশংসার দাবি রাখে। এতসব ঘটনাকে ছাপিয়ে সকলের প্রত্যাশা

নতুন বছরে সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ একটি ক্যাম্পাসের। ফলে বছর জুড়ে ৭৫৩ একরের মাঝে ঘটে যাওয়া সব আলোচিত ঘটনায় রচিত হয়েছে এবাবের কাব্য; ফিরে দেখা-২০২০।

রাবিতে দুর্নীতর গুমর ফাঁস, বছর জুড়ে রঙ্গলীলা

করোনা আতঙ্কে বিশ্ব যখন নতুন বছরে পা দিল তখনও করোনা মুক্ত শীতের নির্মল বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল মতিহারের সবুজ চত্বরে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান। জানুয়ারী মাসের দক্ষিণা বাতাসে যখন শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ঠিক তখনই ‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজ’ এর ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষকদের তীক্ষ দংশনে উন্মোচিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সকল অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র। এরপর একে একে বছর জুড়ে ফাঁস হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির সকল গুমর!

৪ জানুয়ারি উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত সংবলিত ৩০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে জমা দেয় ‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজ’র ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষক সমাজ।

এর পর সেপ্টেম্বর মাসে উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে ৯ সেপ্টেম্বর ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি ডাকা গণশুনানিকে বেআইনি, আদালত অবমাননাকর ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্বের শামিল বলে উল্লেখ করেন উপাচার্য এম আবদুস সোবহান।

পরে তদন্ত কমিটি ১৭ সেপ্টেম্বর অভিযোকারী চারজন শিক্ষক প্রতিনিধি দলসহ ১৯ সেপ্টেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়াকে শুনানির জন্য ডাকে। শুনানির এই আয়োজনকে অভিযোগকারী শিক্ষকগণ স্বাগত জানালেও সেই আয়োজনে স্বয়ং উপস্থিত হন নি উপাচার্য। ফলে ঘটনা আরো গভীরে যেতে থাকে!

১০ ডিসেম্বর ইউসিজির করা তদন্ত শুনানির পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য বরাবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ডজন খানেক চিঠি আসে। যেখানে অনিয়ম-দুর্নীতির করে নিজ মেয়ে জামাতা চাকুরী দেয়া পদ বাতিল, বিশ্বিবদ্যালয়ের সকল নিয়োগ স্থগিত,অবৈধভাবে বাড়ি দখলের অভিযোগে উপাচার্যের জরিমানা এবং রেজিস্ট্রারকে স্বীয় পদ থেকে অব্যাহতিসহ আনুষাঙ্গিক অন্যান্য বিষয় যুক্ত ছিল সেই চিঠিগুলোতে।

উড়োচিঠিতে হত্যার হুমকি

বছরের বিভিন্ন সময়ে বেনামে উড়োচিঠি দিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে বিশ্বিবদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপককে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে উড়ো চিঠির মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগে দফায় দফায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মু. আলী আসগর চিঠির মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এতে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন উভয় শিক্ষক।

তবে কে এই হুমকিদাতা তা এখন জানা যায়নি! খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমন উড়ো চিঠি ঘটনা বেশ কিছু বছর আগে থেকেই চালু হয়েছে। তবে কেউ আক্রমণ বা হত্যার শিকার হয়নি। এটাকে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা বলে ধারণা করছেন শিক্ষকরা।

বিশ্ব গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ব গবেষণা আউটপুটের শীর্ষ সংগঠন স্কোপাসের জরিপে বরাবরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাল অবস্থান রয়েছে। এবছরও ব্যক্তিগত গবেষণাপত্র প্রকাশে সংখ্যার ভিত্তিতে শীর্ষে অবস্থান রয়েছেন ফিসারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইয়ামিন হোসাইন। জরিপে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তাঁর ৮৫টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে এবং একই সাথে ৮৩ টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন দেশের একমাত্র পদার্থ বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রণীত ধাতববিদ্যা ও খনিবিদ্যা উপশাখার বিশ্বসেরা ২৭,৫৬৮ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে ২৮৪তম স্থান অর্জন পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. রঞ্জিত কুমার বিশ্বাস। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক গবেষক তাদের গবেষণায় অবদান রেখেই যাচ্ছেন।

ধর্ষণের ঘটনায় রাবি

গত ১৪ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে মামলা করেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একছাত্রী। অভিযুক্ত ওই ছাত্রলীগ নেতা ফেরদৌস মোহাম্মদ শ্রাবণ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক। এ ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। এছাড়া গত ১০ বছর আগে ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপপরিচালক (সংগীত) রকিবুল হাসান রবিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চলতি বছরের ১৪ সেপ্টম্বর রাতে রাজশাহী নগরের মতিহার থানায় মামলাটি করেন ওই ছাত্রীর বাবা।

করোনায় প্রশাসনের উদ্যোগ

করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে ক্যাম্পাসের দোকানীদের দোকানপাট বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দোকানীদের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়াও করোনা সংক্রমণ রোধে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসবিহীন জীবনের দীর্ঘশ্বাস!

মার্চের ১৮ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর থেকে নজিরবিহীন ছুটি যাপনে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা। এখন যেন ছুটিই তাদের একমাত্র বিরক্ত আর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ বন্ধ জীবনের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তাই বছর জুড়ে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে ক্যাম্পাস খোলার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে অনেকে আবার করোনার ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে ক্যাম্পাস না খোলার পক্ষে মতামত তুলে ধরছে। অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের মধ্যেও। সব মিলে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় শেষ হতে চলেছে করোনাময় এই বছরটি। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দফায় দফায় ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। কবে খুলে দেয়া হবে প্রতিষ্ঠান তা নিয়ে ধোয়াশা কাজ করছে সকালে মাঝে।

দীর্ঘ সেশনজটের ও চাকুরির অনিশ্চয়াতায় শিক্ষার্থীরা

করোনার ছুটি চলছে। কেউ জানেনা এর শেষ কোথায়। এদিকে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেটে উঠা সেশনজটে ফের পড়ার আশংকায় শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টজনরা। অন্যদিকে, আটকে থাকা অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষা না দিতে পেরে চাকুরীর বাজারে যোগ্যতা হারাতে বসা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সংগ্রামে বছর জুড়ে ক্যাম্পাস বেশ আন্দোলিত হয়েছে। তবে আগামী জানুয়ারি থেকে পরীক্ষাগুলো নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

৫০ বছরের মেগা প্রকল্প: ‘একটি স্বপ্নময় ক্যাম্পাসের প্রতিচ্ছবি’

শিক্ষার গুণগতমানের উৎকর্ষ সাধন ও সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫০ বছর মেয়াদী (২০২০-২০৭০) মেগা প্ল্যান প্রণয়ন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাসের ৭৫০ একর এলাকাকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৌশলগত এবং স্থানিক পরিকল্পনার মতো মূল তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ৫০ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পে।

বিশ্ববিদ্যালযে গুণগত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই মেগা প্ল্যানের প্রকল্পে একাডেমিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, গ্রন্থাগার আধুনিকীকরণ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাস্তা-ঘাট ও উন্মুক্ত স্থানের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আধুনিক জিমনেসিয়াম স্থাপন, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ড্রেনেজ, বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ অন্যান্য বিষয় সংযুক্ত হয়েছে।