৬ যুগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণায় নানামুখী সফলতা

০৬ জুলাই ২০২৪, ০৭:৪৩ PM , আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৫, ১১:৫১ AM
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত

১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আজ ৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। গৌরব ও ঐতিহ্যের ৭১ বছর পেরিয়ে ৭২ বছরে পদার্পণ করেছে এ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গবেষণা খাতে যে সফলতা দেখিয়ে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা নিয়ে থাকছে আজকের আয়োজন। 

১. চার সবজিতে ক্যান্সার প্রতিরোধী গুণ
একদল গবেষককে সঙ্গে নিয়ে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ভোজ্য খাবারের ক্যান্সার প্রতিরোধী ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করে আসছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এইচ এম খুরশীদ আলম। সম্প্রতি তাঁর নেতৃত্বে এক গবেষণায় উঠে এসেছে টমেটো, পালংপাতা, ধনিয়াপাতা এবং লেবুর খোসা ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিকস, কিডনি রোগ প্রতিরোধকসহ বিভিন্ন রোগের নিরাময় হিসেবে কাজ করে। তাঁরা বাংলাদেশের মার্কেটে পাওয়া যায় এমন ভোজ্য খাবারের (Edible Foods) প্রায় ৬৮টি প্রকরণ সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৩১টি শাকসবজি, ১৭টি ফলমূল এবং ২০টি মসলা ছিল যা নিয়ে গবেষণা করে যাচাই করার চেষ্টা করেন এগুলো ক্যান্সার প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা পালন করে কি না। 

গবেষণায় তাঁরা প্রমাণ করেন টমেটো, পালংপাতা, ধনিয়াপাতা এবং লেবুর খোসা ক্যান্সার প্রতিরোধী। গবেষণাটি ২০২৪ সালে পহেলা জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত ‘ক্যান্সার রিসার্চ’ (Cancer Research) জার্নালে প্রকাশিত হয়। অপর একটি পর্যালোচনা নিবন্ধে ১১টি ভোজ্য খাবারের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী (boost up) করায় আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ‘হেলিয়ন’ (Heliyon) জার্নালে ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

২. হারানো ঐতিহ্য ‘ঢাকাই মসলিন’ পুনরুদ্ধার
প্রায় ১৭০ বছর পর আবার বাংলাদেশে বোনা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এই গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেন। ২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার নির্দেশ প্রদানের দীর্ঘ ছয় বছর পরে ঠিক সে রকমই কাপড় তৈরি করতে সক্ষম হন গবেষক দলটি। যেমনটি বলা হতো—আংটির ভেতর দিয়ে গলে যায় আস্ত একটি শাড়ি! অর্ধযুগ নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় সফল হন তাঁরা। প্রাথমিকভাবে তৈরি হয়েছে ছয়টি মসলিন শাড়ি।

৩. তুঁতে মিলল ক্যান্সার ও হৃদরোগ প্রতিরোধী গুণ
২০১০ সাল থেকে একদল গবেষককে সঙ্গে নিয়ে তুঁতের ক্যানসার প্রতিরোধী ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করে আসছেন অধ্যাপক ড. এ.এইচ.এম. খুরশীদ আলম। তাঁরা প্রমাণ করেন তুঁত গাছের পাতা, ফল, বাকল এমনকি মূল সবই ঔষধি গুণসম্পন্ন। কাজ করে ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি কিডনি রোগ প্রতিরোধক হিসেবেও। এ সুযোগ কাজে লাগানো গেলে খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে বিপুল সম্ভাবনাময় বহুমুখী এ উদ্ভিদে পাল্টে যেতে পারে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি।

২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারি এ গবেষণাপত্র প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী বায়োমেড সেন্ট্রাল রিসার্চ নোট। পরে আরেকটি গবেষণা নিয়ে ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পোলস ওয়ান’- এ গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই সালে ড. এ.এইচ.এম. খুরশীদ আলম বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন স্বর্ণপদক পান।

গবেষক দল জানান, তুঁত ফলের ৮৫ শতাংশই পানি। এছাড়া শতাংশ কার্বোহাইড্রেট, ২ শতাংশ ফাইবার, ১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রোটিন ও দশমিক ৫ শতাংশ চর্বি বিদ্যমান। প্রতি কাপ অর্থাৎ ১৫০ গ্রাম তুঁত ফলে শক্তি থাকে মাত্র ৬০ কিলোক্যালরি। ভিটামিন-সি থাকে ৩০ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। এছাড়া ভিটামিন এ ও বি, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও পটাশিয়ামও রয়েছে। কিশমিশের মতো শুকিয়ে তুঁত সংরক্ষণ করা যায়। এতে প্রোটিনের মাত্রা বাড়ে। শুকনো তুঁত ফলে শতাংশ ২० কার্বোহাইড্রেট, ১৪ শতাংশ ফাইবার, ১২ শতাংশ প্রোটিন ও ৩ শতাংশ চর্বি রয়েছে। 

৪. পানিকে আর্সেনিক দূষণমুক্ত করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ‘গ্রিন চিলি পাউডার’ ও সজনে পাতার গুঁড়ো তৈরি
জাপানের গবেষকদের সাথে একযোগে কাজ করে কম খরচে পানিকে আর্সেনিক দূষণমুক্ত করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন। জাপানের তৈয়মা বিশ্ববিদ্যলয়ের ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. তমুনুরি কাওয়াকামির সঙ্গে উদ্ভাবিত ওই প্রযুক্তির নাম ‘রিমোভাল অব আর্সেনিক থ্রু ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম’। স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছে প্রযুক্তিটি।

এদিকে বাজারজাতকরণের উপযোগী কাঁচা মরিচের গুঁড়ো তৈরি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক। দুই বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উদ্ভাবিত এই গুঁড়ো ব্যবহার করা যাবে কাঁচা মরিচের বিকল্প হিসেবে। কোনো ধরনের রাসায়নিক ছাড়াই তৈরি গুঁড়োর রং, ঘ্রাণ, স্বাদেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। গবেষক এর নাম দিয়েছেন ‘গ্রিন চিলি পাউডার’। এছাড়া দীর্ঘদিন গবেষণার পর তিনি সজনে গাছের পাতা প্রক্রিয়া করে এক ধরনের গুঁড়া তৈরিতে সক্ষম হন। তাঁর উদ্ভাবিত এ পাউডারটি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ৩-৫ গ্রাম বা এক চা চামচ পরিমাণ গুঁড়া পানির এক গ্লাস পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলেই পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’সহ বিভিন্ন পুষ্টিগুণ পাবে মানবশরীর।

মূলত একজন কৃষি গবেষক অধ্যাপক মনজুর হোসেন। আমের হিমাগার তৈরি ও রাজশাহী অঞ্চলে স্ট্রবেরি চাষের উপযোগী প্রজাতি উদ্ভাবনেও সফলতা পেয়েছেন এই গবেষক। এছাড়া মিশরের একটি প্রাচীন তুলার সন্ধান পেয়েছেন তাঁর গবেষকদল।

৫. হাওড়ে ফিরছে ৮ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছ
দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো বিলুপ্ত রক্ষায় কাজ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেনের নেতৃত্বে একদল গবেষক। প্রায় ৮টি দেশি প্রজাতির মাছ হাওড়ে মজুদ করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা। হাওড়ে দেশীয় প্রজাতির মাছ ফিরিয়ে আনতে চলমান একটি প্রকল্পের সফলতা এটি। দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো ফেরানো যাবে বলে সম্ভাবনার কথা বলছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষকদল। এছাড়া কাজ করছেন হাওড় নির্ভর ৮৪ হাজার মানুষের জাবীনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তনের আশায়। বিলুপ্তির পথে থাকা দেশীয় মাছের প্রাচুর্যতা ফিরিয়ে আনাসহ হাওড়ের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, হাওড় সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর উপার্জন ও পুষ্টিচাহিদা পূরণে গবেষণা চলা এই প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসাইন।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৯ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ চলছে ঝিনাইদহের সার্জাত ও সাগান্না এই দুটি হাওড়ে। হাওড়ে ফেরা দেশি মাছগুলো হলো কই, শিং, দেশি মাগুর, পাবদা, গুলশা টেংরা, ছোট টেংরা, বাজারী টেংরা এবং টাকি পার্শ্ববর্তী বিল এবং নদী হতে সংগ্রহ করে হাওড়ে মজুদ করা হয়েছে। হাওড়ে ফেরা মাছগুলো ডিম দিচ্ছে এবং বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছেন গবেষকরা। ৫০টি প্রজাতির দেশি মাছ ২০ থেকে ৩০ বছর আগেও সেগুলো সচারচর নদী নালা, খাল বিল ও হাওড়গুলোতে পাওয়া যেত। জলবায়ু পরিবর্তন ও কিছুটা মানবসৃষ্ট কারণে হুমকির মুখে পড়া দেশি মাছের অস্তিত্ব, ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়া মাছগুলো হাওড়ে ফিরবে ২০২২ এর মধ্যে আশাবাদি গবেষকরা।

প্রজেক্ট শেষে শতভাগ সফলতা পাওয়া গেলে হাওড়ে স্থায়ীত্ব পাবে এসব মাছ এবং এতে দেশি মাছের জিনব্যাংক ও ব্রুড ব্যাংক রূপ নিবে হাওড়গুলো। ফলে দেশের কোথাও না পাওয়া গেলেও ওখানে পাওয়া যাবে এবং হ্যাচারিগুলোতে মা মাছ নিয়ে গিয়ে ডিম ফুটাতে পারবেন। ফলস্বরূপ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত হাওড়গুলোতে বার্ষিক গড় মৎস্য উৎপাদন ৭,৭২৯ মেট্রিক টন দেশি মাছ উৎপাদন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়া ইলিশ ধরার সময় পূনর্গঠনের জন্যও কাজ করছেন এই গবেষক। সেই সাথে কাজ করছেন সামুদ্রিক মাছ ও মাছের খাদ্য ও বাসস্থানের বিষয়ে।

৬. দেশের প্রথম সাপের বিষের ডাটাবেজ
দেশের একমাত্র ও প্রথম সাপের বিষের ডাটাবেজ তৈরি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু রেজা। দেশের অভ্যন্তরে পাওয়া সাপগুলোর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নাম, খাদ্যাভ্যাস, প্রকার, প্রকৃতিসহ জীবনবৃত্তান্ত বিস্তারিত স্থান পেয়েছে সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই অধ্যাপক বাংলাদেশে পাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ ও তার প্রত্যেকটির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন ডাটাবেজে। এছাড়া বিষধর সাপগুলোর মধ্যে কোন কোন ধরনের বিষ এবং সেই বিষের গঠন আছে। ২০১৩-১৪ সালের দিকে এই ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেন অধ্যাপক রেজা। প্রতিষ্ঠিত এই ডাটাবেজের নাম স্নেকবিডি.কম।

সেখানে, কালনাগিনী, গোখরা, কালো হলুদ ব্যান্ড লাঠি, মোহনার লাঠি, শঙ্খীনি, ধামান, পাথরসহ প্রায় ৮৯টি সাপের বিষের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। কোন সাপের কামড়ে কী ধরনের ভেনোম ব্যবহার করা যাবে, কত ধরনের ভেনোম আছে তার সবই আছে সেখানে। গত প্রায় এক যুগ ধরে সাপের বিষের উপর গবেষণা করছেন এই গবেষক। নির্দিষ্ট ভেনোম বের করতে কঠিন হয় বলেই এই উদ্যোগ তাঁর। ডেটাবেজে গিয়ে যদি কার্ডিওটক্সিন খুঁজে পেতে খুব সহজ হবে। প্রায় ৩ শতাধিক সাপের ভেনোমের প্রোটিন বিশ্লেষণ করে একটা কাঠামো দেখিয়ে দেওয়া এই ডাটাবেজ জীবতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার জন্য গবেষকদের সহজলভ্য এটি। যা সাপ নিয়ে গবেষকদের গবেষণায় সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস। শুধু বাংলাদেশ নয়, বলতে গেলে পৃথিবীতেই এই ধরনের ডাটাবেজ প্রথম।

৭. গেছো শামুকের ক্যাপ্টিভ প্রজননে রাবি
২০২০ সালের নভেম্বরে ‘প্রকৃতির মুক্ত’ খ্যাত গেছো শামুকের ক্যাপ্টিভ প্রজননে সাফল্য পেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল। বিশ্বের প্রথম গেছো শামুকের ক্যাপ্টিভ প্রজনন করতে সক্ষম হলেন তাঁরা। বছরের মার্চে শামুকটি নিয়ে গবেষণা শুরু হওয়ার ৯ মাসের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার শোভনের হাত ধরে এই গবেষণার সাফল্য আসে।

শামুকটির আদি নিবাস আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য হলেও পাওয়া গেছে রাজশাহী অঞ্চলে। লিগ্যাস প্রজাতির হতে পারে ধারণা করছেন ওই গবেষকদল। ২০১৮ থেকে দেশের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন রাবির এই অধ্যাপক। তাঁর অংশ হিসেবে এই শামুক সংরক্ষণে এগিয়ে এসেছেন তিনি ও তাঁর গবেষকদল। এছাড়া একটি নতুন শামুকের সন্ধ্যান পেয়েছেন তাঁরা। এর আগে হাওয়াইতে ডেভিসসিসকো নামের একজন গবেষক সাধারণ শামুকের কৃত্রিম প্রজননে সফলতা পান।

৮. পদার্থবিদ্যায় রাবি অধ্যাপকের সফলতা
এমএসসির থিসিসের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালে গবেষণার ভুবনে প্রবেশ করেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুন কুমার বসাক। তাঁর সুপারভাইজর ছিলেন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক আহমদ হুসেন। ক্ষেত্র ছিল কণাবিজ্ঞান। এক বছরের মাথায় ফলাফল পেয়েছিলেন। থিসিস পেপারটি ১৯৬৪ সালের ২৭ আগস্ট চীনের চায়না সিম্পোজিয়ামে প্রথম উপস্থাপন করা হয় এবং খুব প্রশংসা লাভ করে। নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। সেখানে প্রোটন, নিউট্রন, হিলিয়াম থ্রি ইত্যাদি কণার আচরণ সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন। 

দেশে ফিরে ১৯৯৭ সাল থেকে নিউট্রন স্টার নামে এক ধরনের তাঁরা যেগুলো থেকে আলো বের হয় না, সেগুলোর স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। সূর্য যে আমাদের আলো দিচ্ছে, এটিও একদিন নিউট্রন স্টার হয়ে যাবে। দেশের একমাত্র গবেষক হিসেবে ড. অরুণ কুমার বসাক যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এই প্রজেক্টে গবেষণা করেছেন। 

প্রথম ধাপে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সালের জুলাই এবং পরে ২০০২ সালের আগস্ট থেকে ২০০৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত যে গবেষণাকর্ম চালিয়েছেন, তার ফলাফল নিয়ে ৩৩টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র লিখেছেন। সেগুলো ইংল্যান্ডের ইন্সটিটিউট অব ফিজিকস [আইওপি] ও যুক্তরাষ্ট্রের ফিজিক্যাল সোসাইটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এখন তাঁর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক আলফাজউদ্দিন অ্যাটমিক ফিজিকস ও নিউক্লিয়ার ফিজিকস নিয়ে গবেষণা করছেন।

এছাড়াও এ পর্যন্ত তিনি ৫৫টি এমএসসি, দুটি এমফিল ও ছয়টি পিএইচডি থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক। দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর ১৪০টির বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। অনার্স লেভেলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাঁর লেখা ‘ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান’ বইটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে।

ড. অরুণ কুমার বসাক ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৯০-৯৪ সাল পর্যন্ত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন। ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর নেওয়া এই মানুষটি শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে দেশের একমাত্র প্রফেসর ইমেরিটাস সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁর নামে ২০০৭ সাল থেকে পেনিনসুলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট প্রফেসর বসাক পুরস্কার ও বৃত্তি চালু করেছে। প্রতিবছর এখান থেকে চার মেধাবীকে বৃত্তি ও দুজনকে ক্রেস্ট ও আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের একজন অন্যতম গবেষক। পদার্থ বিজ্ঞানের থিওরি গবেষণায় বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান তাঁর।

৯. পাটের বিকল্প আঁশ উদ্ভাবন
পাটের বিকল্প সোনালি আঁশ উদ্ভাবন করার সাফল্যও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। পাট ছাড়াই বিকল্প উপায়ে সোনালি আঁশ পাওয়ার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম। উদ্ভাবিত এই আঁশ খুবই আরামদায়ক ও শক্ত বা স্থায়িত্বশীল। পাট থেকে পাওয়া আঁশের চেয়েও কিছুটা উজ্জ্বল। ফলে তা দিয়ে তৈরি পোশাকও হবে অনেক বেশি উজ্জ্বল। ঝোপ-ঝাড়ে কিংবা পতিত স্থানে কম খরচে তুলনামূলক পরিচর্যা ছাড়াই জন্মায় এমন এক ধরনের উদ্ভিদ থেকে এই আঁশ পাওয়া যাবে।

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হলে ব্যাপকভাবে টেক্সটাইল এবং রেডিমেড গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশ ফার্মাসি কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক ড. আনওয়ারুল ইসলাম এবং ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নালের চিফ অব ইকোনমিক ডিরেক্টর। তিনি আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সারবিরোধী গবেষণার সঙ্গেও জড়িত।

১০. আর্সেনিক দূষণ ও স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে গবেষণা
গত ১ যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ‘পরিবেশ স্বাস্থ্য বিজ্ঞান’ গবেষণাগারে আর্সেনিক বিষক্রিয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে রোগ সৃষ্টিতে আর্সেনিকের প্রভাব ও দেশে আর্সেনিকের ভয়াবহতাসহ নানা তথ্য। ২০০৭ সালের শেষের দিকে বিভাগের তরুণ গবেষক অধ্যাপক ড. খালেদ হোসেনের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে গবেষণাগারটি। 

গবেষণাগারের গবেষক ও গবেষণা সমন্বয়কারী চিকিৎসকরা সাধ্যমতো জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও প্রয়োজনে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গবেষকদল চেষ্টা করেন, আর্সেনিক আক্রান্তদের সাধ্যমতো সেবা দিতে। এ গবেষণাগারের অনেক গবেষণা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন অধ্যাপক খালেদ হোসেন।

১১. সুস্থ মানুষের লালায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী শক্তিশালী জিন
প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ১০ লাখ মানুষ ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট’ জীবাণুঘটিত সংক্রমণের কারণে মৃত্যুবরণ করছেন। দিন দিন বাড়তে থাকা এই সংখ্যা কমতে পারে বলে সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা সুস্থ্য মানুষের মুখের লালায় এমন একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন, যা যক্ষ্মা চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘ডি-সাইক্লোসেরিন’ নামের একটি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে নষ্ট করে দিতে পারে। 

‘ডি-অ্যালানিন-ডি-অ্যালানিন লাইগেজ’ নামক এই জিনটি প্রথমবারের মতো ইন্টেগ্রন জিন ক্যাসেট নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র ভ্রাম্যমাণ জেনেটিক উপাদানের মধ্যে শনাক্ত হয়। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দুটি আলাদা আলাদা নমুনা সেটের প্রায় সব সুস্থ্য স্বেচ্ছাসেবকের লালায় এই ভ্রাম্যমাণ জিনের সন্ধান পেয়েছেন লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ, কিংস কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। এ গবেষণা সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা নেইচার রিসার্চ কর্তৃক প্রকাশিত ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে মাইক্রোবিয়াল ডিজিজেস বিভাগে প্রায় সাড়ে ৫ বছর আগে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ড. অ্যাডাম রবার্টস ও প্রফেসর পিটার মুলানীর তত্ত্বাবধানে এ গবেষণাটির মূল কাজ সম্পন্ন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুর রহমান। তাঁর পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে এ গবেষণাটি প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়।

শুধু গবেষণায় সাফল্য দেশের গণ্ডিতে নয়। ভালো গবেষণার কারণে স্কলারশিপ নিয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থী। সম্প্রতি এই সংখ্যাটা প্রতি নিয়তই বাড়ছে। শুধু একটি ল্যাব থেকেই ৫৪ জন গবেষক উন্নত গবেষণার জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। যা প্রশংসার দাবি রাখে। উত্তরাঞ্চলের বিদ্যাপীঠ হলেও প্রতিনিধিত্ব করছে পুরো দেশকে। এ ধারা অব্যাহত রেখে বাংলাদেশকে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা সকলের।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় আরো এগিয়ে যেতে গতবছরের তুলনায় এ বছর গবেষণায় ৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গবেষণায় আরো উন্নতির লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বিদেশিরা আসছেন; তাঁদের নিয়েও আমরা কাজ করছি। গত তিন বছরে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এমওইউ করেছি। আমি আশাবাদী গবেষণায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য চলাকালে লোডশেডিং, জিএমকে স্ট্যান্ড র…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বনঘেঁষে মুরগির খামার, খোলা গাড়িতে বিষ্ঠা পরিবহন—চর্মরোগে আক…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয় দলে নেইমারের খেলা নিয়ে যা বললেন আনচেলত্তি
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডিআইইউতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা-হুমকির দায় স্বীকার, অভিযুক্ত…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বস্তি মিলল যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিদেশি শিক্ষার্থী-সাংবাদিকদ…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৪ বছরেও ফেরেনি শিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ, অপেক্ষায় বৃদ্ধ মা-ব…
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9