০১ নভেম্বর ২০২৩, ১৮:৪৮

রাতের আঁধারে কাটা হলো অর্ধশত গাছ, গুঁড়িতে কাফন জড়িয়ে প্রতিবাদ

গাছের গুঁড়িতে কাফন জড়িয়ে প্রতিবাদ শিক্ষার্থীদের  © টিডিসি ফটো

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) নতুন ভবন নির্মাণের জন্য রাতের আঁধারে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় অর্ধশত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। তবে গাছ কাটার বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

জানা যায়, আজ বুধবার রাতের শেষভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) পাশে সুন্দরবন নামক স্থানে গাছগুলো কাটা হয়েছে। পরে গাছগুলোর ডালপালা ফেলে রেখে প্রধান অংশ ট্রাকে তুলে অন্যত্রে নেওয়া হয়েছে। গাছগুলো কোথায় নিয়ে গেছে, তা জানা যায়নি। তবে ট্রাকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হল গেট দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে বের হয়। এছাড়া সেসময় ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দু’জন শিক্ষক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলেও জানা গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ কাটা হলে সেসব গাছ বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট কার্যালয়কে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। তবে গাছ কাটার পর কয়েকঘণ্টা পার হলেও কাটা গাছগুলো এস্টেট কার্যালয়কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। 

এ বিষয়ে এস্টেট কার্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্টার আবদুর রহমান বলেন, নিরাপত্তা শাখার এক কর্মকর্তার মাধ্যমে জেনেছি সেখানে গাছ কাটা হয়েছে। গাছ কাটার বিষয়টি আমাদের জানানো হয়নি। এছাড়া কাটা গাছগুলো আমাদের এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। গাছগুলো কোথায় আছে, তা জানি না।

এদিকে গাছ কাটার বিষয়টি জানাজানি হলে আজ বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তখন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের নামফলক ভেঙে সেখানে বৃক্ষরোপণ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর দেড়টার দিকে যেখানে গাছ কাটা হয়েছে সেখানে নতুন কয়েকটি গাছ লাগিয়ে দেন আরেকদল শিক্ষার্থী। এরপর কাটা গাছের গুঁড়িতে কাফন পরিয়ে সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।

নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন জাহাঙ্গীরনগরে চাইনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে ভবন নির্মাণ করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী অমর্ত্য রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। তার প্রেক্ষিতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কাজও শুরু হয়েছে। অথচ সেটার অপেক্ষা না করে রাতের আঁধারে গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন নামক স্থানে ইলেক্ট্রিক মেশিন দিয়ে অর্ধশতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। গাছের ছোট ছোট ডালপালা পড়ে আছে তবে গাছগুলোর প্রধান অংশ সেখানে নেই। গাছের গুড়িগুলোতে লাল রং করে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের নামফলক ভেঙে সেখানে ‘গাছ কাটলে খবর আছে’ লিখে দিয়েছেন তারা।

গাছসহ ট্রাকটি ক্যাম্পাসের বাইরে বের হওয়ার বিষয়ে মীর মশাররফ হোসেন হল গেটের দায়িত্বরত আনসার সদস্য মো. সাবিয়ার রহমান বলেন, সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে গাছসহ ট্রাকটি বের হয়ে যায়। ট্রাকের সঙ্গে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহকারী অধ্যাপক এস এম এ মওদুদ আহমেদ ও পলাশ সাহা ছিলেন।

তবে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সহকারী অধ্যাপক এস এম এ মওদুদ আহমেদ বলেন, আমরা সকালে ব্যক্তিগত কাজে ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হই। ঘটনাচক্রে যখন মীর মশাররফ হোসেন হলের গেট দিয়ে বের হতে যাই, তখন গাছের ট্রাকটিও গেট দিয়ে বের হচ্ছিল। তবে গাছ কাটা এবং সেগুলো বাইরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত নই।

ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পরিচালক অধ্যাপক কে এম জাহিদুল ইসলাম বলেন, ওই স্থানে ভবন নির্মাণের জন্য সাবেক উপাচার্য জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় টেন্ডার হয়েছে। যারা কাজ পেয়েছেন তাঁরা গাছগুলো কেটেছে। গাছগুলো এস্টেট অফিসকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। গাছগুলো ক্যাম্পাসেই থাকার কথা। কোথায় রাখা আছে, তা জানি না। তবে জেনে আপনাকে জানানোর চেষ্টা করব।

তবে গাছ কাটার বিষয়টি জানেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ.স.ম ফিরোজ-উল-হাসান। তিনি বলেন, রাতের আঁধারে গাছ কাটার বিষয়টি আমরা জানি না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, গাছ কাটার বিষয়ে কিছু জানি না। এমনকি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকেও কিছু জানানো হয়নি।