৩ বছর ফি দিয়েও মিললো না স্মার্ট আইডি কার্ড
তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের স্মার্ট আইডি কার্ড বিতরণ। তবে এই কার্ড ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ কোটি ১৬ লাখ ৭ হাজার টাকা আদায় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ২০২০ সালে এই কার্ড প্রদান করা হলেও পরবর্তীতে বন্ধ রয়েছে এই উদ্যোগ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও পরিচয়জনিত সমস্যা দূর করতে এ কার্ড দেওয়ার উদ্যোগটি ছিল অপরিকল্পিত। এ কারণে বন্ধ রয়েছে এই স্মার্ট আইডি কার্ড বিতরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, এই ইস্যুটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। খুব দ্রুতই সমাধান করে শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছি।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের স্মার্ট কার্ড প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক। প্রথমবারের মত ২০১৭ সালে স্বল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীদের কার্ড বিতরণ শুরু হয়। এই কার্ডে শিক্ষার্থীদের নাম, নিবন্ধন নম্বর, আইডি কোড, ছবি, বিভাগ ও হলের নামসহ সব ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। কার্ড ব্যবহার করে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার নম্বরপত্র ও সনদপত্র তোলা, গ্রন্থাগার, বিভাগ, ইনস্টিটিটিউট, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস, হল অফিস এবং নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন কাজ করার সুযোগ পাবেন বলে জানানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে দীর্ঘ চার বছর পর ২০২০ সালে ২০১৫-১৬, ১৬-১৭, ১৭-১৮, ১৮-১৯ এবং ১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থীদের স্মার্ট কার্ড প্রদান শুরু করে, যা ২০২২ সালে শেষ হয়। এদিকে, ২০২০ সাল থেকে ৩ বছর কেটে গেলেও আগত নতুন শিক্ষার্থীদের স্মার্ট কার্ড দেওয়া হয়নি। ফলে ক্যাম্পাসে ২০২০-২১, ২১-২২ এবং সম্প্রতি ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থীরা ভর্তি সম্পন্ন করে ক্লাস শুরু করলেও তাদের কেউই হাতে পাননি স্মার্ট কার্ড।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবন সূত্রে জানা যায় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৭ হাজার ১২৫ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৪২ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ৬ হাজার ১১০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার এবং সর্বশেষ ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ৬ হাজার ১১০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা আদায় করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রতিটি শিক্ষার্থী থেকে ৬০০ টাকা করে স্মার্ট কার্ড বাবদ নেওয়া হলেও তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে না স্মার্ট কার্ড।
এসব শিক্ষার্থীকে স্মার্ট কার্ডের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো জায়গায় নিজেদের পরিচিতি প্রকাশে ব্যবহার করতে হচ্ছে হল কার্ড বা লাইব্রেরি কার্ড। এতে নানা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে তাদের। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী।
ক্ষোভ প্রকাশ করে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী হেলালুর রহমান বলেন, একটা শিক্ষার্থীর পরিচয়পত্র শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্বের পরিচয়ই বহন করে না বরং এটা একজন শিক্ষার্থীর গর্ব ও অহংকারেরও বিষয়। প্রথম বর্ষে ভর্তির সময়ে স্মার্ট কার্ডের ফি নেয়া হলেও তৃতীয় বর্ষে এসেও শিক্ষার্থী হিসেবে সেই কার্ডের দেখা না পাওয়া আদতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য একটি চরম লজ্জাজনক বিষয়। যদি ফি নেয়া না হতো তাহলে না হয় বাজেটের অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছুটা হলেও দায় এড়াতে পারত, কিন্তু যেখানে ভর্তির সময় প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্মার্ট কার্ড বাবদ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি নেয়া হয়েছে সেখানে আর কোন গায়েবি কারণে এই কার্ড বিতরণের কাজ এখনো আলোর মুখ দেখছে না? একটা শিক্ষার্থী স্নাতকের অর্ধেক শেষ করেও সে তার আইডি কার্ড না পাওয়ার ঘটনা কি এই প্রশাসনের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য যথেষ্ট নয়?
আরেক শিক্ষার্থী নাফিসা ইসলাম সাকাফি বলেন, যেখানে প্রাইভেট বা অন্যান্য পাবলিকের শিক্ষার্থীরা ভর্তির ৬ মাসেই তাদের আইডি কার্ড পেয়ে যায় সেখানে আমাদের কাছে ভর্তির সময় ৬০০ টাকা করে নিলেও আমরা তৃতীয় বর্ষে উঠেও আইডি কার্ড হাতে পাইনি। আমরা একনো হল কার্ড বা লাইব্রেরি কার্ড ব্যবহার করে আইডেন্টিটি প্রকাশ করছি। কিছুদিন পর আমাদের শিক্ষাজীবন শেষ হলে কি প্রশাসন আমাদের হাতে স্মার্ট কার্ড তুলে দিবে?
আরো পড়ুন: ‘উনো’ কার্ড খেলতে গিয়ে দোকান কর্মচারীদের হামলার শিকার ঢাবি শিক্ষার্থীরা, আহত ৮
ঢাবির অনলাইন ভর্তি কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই সকল কার্যক্রম শুরু করেছি। মূলত অনুমোদন, টেন্ডার নিতেই অনেক সময় পার হয়েছে তাই আমরা নতুন করে স্মার্ট কার্ড দিতে পারিনি। এতদিন আমাদের কাছে প্রিন্টার, কার্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিলো না।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি আমাদের কাছে প্রিন্টার আসলেও কার্ড আগামী মাসের ২০ তারিখ চীন থেকে আমাদের হাতে পৌছাবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২০-২১ ও ২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থীদের আমরা অক্টোবরের মধ্যেই স্মার্ট কার্ড প্রদান করতে পারবো। ২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থীদের কিছুদিন দেরি হবে। তবে তারাও চলতি বছরের শেষ দিকে স্মার্ট কার্ড পেয়ে যাবে বলে মনে করি।
সার্বিক বিষয়ে ঢাবি ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীরা তৃতীয় বর্ষে এসেও আইডি কার্ড পাচ্ছে না তাই তাদের ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক। এই স্মার্ট কার্ড প্রজেক্টটি অপরিকল্পিতভাবে শুরু করা হয়েছিলো যার ফলে এটি নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি আসার পরে ইস্যুটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করেছি এবং কাজটি কয়েক বছর এগিয়ে নিয়ে এসেছি। আমরা খুব দ্রুতই সকল কাজ শেষ করে শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। তবে আমরা পরিকল্পনা করেছি একজন শিক্ষার্থীর ভর্তির পরে ক্লাস শুরুর সাথে সাথেই একটি আইডি কার্ড দেওয়া হবে। পরবর্তীতে কিছুটা সময় নিয়ে তাদের স্মার্ট কার্ড প্রদান করা হবে।