বিশ্বের ১০ কোটিরও বেশি তরুণ পড়ালেখা পারে না
বিশ্বের ১০ কোটিরও বেশি তরুণের সাক্ষর জ্ঞান নেই। অথ্যাৎ পড়ালেখা করতে পারে না। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে আফ্রিকার সাব সাহারান অঞ্চলের দেশগুলোতে। এ সংখ্যা ৪ কোটি ৮০ লাখ। এরপরে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, যার সংখ্যা ৩ কোটি ৯০ লাখ। যদিও ২০০০ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৪ কোটিরও বেশি। তাছাড়া বিশ্বে ২৬ কোটি ৪০ লাখ শিশু-কিশোর শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার মান উন্নয়নে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হবে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সর্বশেষ গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের ২০৫টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর পরিচালিত এ জরিপটি করা হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদনে কোন নির্দ্দিষ্ট দেশকে ফোকাস করা হয়নি। এবারের প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্য হলো ‘শিক্ষায় জবাবদিহীতা: আমাদের দায়বদ্ধতা পূরণ’।
১৫ মে, মঙ্গলবার দেশে এ প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হয়। রাজধানীর বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) সম্মেলন কক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গোলাম মো. হাসিবুল আলম, ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান মিজ বিয়াট্রিস খালদুন এবং বিএনসিইউ-এর সচিব মো. মনজুর হোসেন। ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রোগ্রাম বিশেষজ্ঞ (শিক্ষা) মিজ সুন লেই ’গেøাবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট-২০১৭/৮’ বিষয়ে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা পেশ করেন। ইউনেস্কো ঢাকা অফিস এবং বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন (বিএনসিইউ) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বয়স্ক সাক্ষরতা হার সাড়ে ৮১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৬ শতাংশ হয়েছে। তবে আফ্রিকার সাব সাহারান অঞ্চলে তা ৬৪ শতাংশে থেমে আছে। তাছাড়া এ অঞ্চলের স্বল্প আয়ের দেশে তা ৬০ শতাংশেরও কম। সাক্ষরতা দক্ষতাবিহীন তরুণদের সংখ্যা ২৭ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এখনও ১০ কোটিরও বেশি তরুণ পড়তে পারে না, এর মধ্যে আছে আফ্রিকার সাব সাহারান অঞ্চলের এবং নিম্ন আয়ের দেশের প্রতি ৪ জনের মধ্যে একজনেরও বেশি।
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, সাক্ষরতা বলতে শুধু ‘সই’ করা বুঝায় না। এর সঙ্গে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান জড়িত। এর মধ্যে দিয়ে গর্বিত নাগরিক হিসেবে তৈরি করা যায়। দেশে সাক্ষরতা অর্জনে বড় কোন সমস্যা না থাকলে ছোট-ছোট কিছু সমস্যা থাকতে পারে। এজন্য সরকারকে নির্দ্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি হাতে নেয়ার কথা বলেন তিনি। তাছাড়া, বাংলাদেশের জন্য এ প্রতিবেদনের অধিকাংশ সূচক সার্বিকভাবে ইতিবাচক বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিবেদনে গৃহশিক্ষাকতা এবং কোচিংয়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে, গৃহশিক্ষাকতা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি শিক্ষার সমতাকে ব্যাহত করে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। বাংলাদেশেও প্রতিনিয়ত গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া ও কোচিং করার প্রবণতা বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে গৃহশিক্ষাকতা বেড়ে যাচ্ছে। ক্লাসে শিক্ষকরা পাঠদান অসম্পন্ন রেখে কোচিং বা গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াচ্ছেন। এতে করে শিক্ষার সঠিক লক্ষ্য ব্যহত হচ্ছে। ক্লাসে শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশসহ এটা বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৭ সালে গৃহশিক্ষকতায় বৈশ্বিক বাজারে ২২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ব্যয় দাঁড়াবে বলে আশংঙ্কা করা হচ্ছে।
শিক্ষায় অর্থায়নের বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালে শিক্ষা কর্ম-রূপরেখার প্রস্তাব হলো- শিক্ষার ব্যয় হবে মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপি ২ শতাংশের নিচে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেশের সুশীল সমাজ ও শিক্ষাবিদরা শিক্ষা খাতে জিডিপি ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানালেও সরকার এখনও প্রতি বাজেটে আশানুরূপ বরাদ্দ বাড়াচ্ছে না।
অন্যদিকে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে পালালে জেল ও অর্থ জরিমানা করা হচ্ছে। স্কুল পালানোর শাস্তি হিসেবে ফ্রান্সে দুই বছর, সিঙ্গাপুরে ১ বছর, দক্ষিণ আফ্রিকায় ছয় মাস, বেলজিয়ামে এক মাসের জেল দেয়া হয়। এছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে এ কারণে মোটা অংকের অর্থ জরিমানা গুনতে হয়। অনেক দেশে পারিবারিক শিশু ভাতাও বন্ধ করে দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যাপারে বলা হয়েছে, স্কুলে ভর্তি হওয়া পাশ করার কোন গ্যারান্টি নয়। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের গৃহভিত্তিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রাথমিকস্তরে সমাপনী হার ছিল ৮৩ শতাংশ; নি¤œ মাধ্যমিকে ৬৯ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে তা ৪৫ শতাংশ। তাছাড়া পৃথিবীর অর্ধেক দেশে প্রতি দুইজনের মধ্যে একজন তরুণ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা শেষ করে থাকে।
অনুষ্ঠানে নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এ প্রতিবেদন থেকে আমরা শিক্ষা নেব। যেসব ক্রুটি রয়েছে, তা দূর করার চেষ্টা করব। ভাল দিকগুলো গ্রহন করে আরো এগিয়ে নিয়ে যাব। আমাদের কিছু বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসডিজি’র সাথে সঙ্গতি রেখে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার। আমাদের লক্ষ্য শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শিক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ গুনগত মান। এজন্য শিক্ষকদের নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে, শিক্ষকতাকে ব্রতী হিসেবে নিতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ প্রভূত অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার মান উন্নয়নে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে বাংলাদেশ।