আর্থিক স্বচ্ছলতাই বাড়াতে পারে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান
শিক্ষকতা মহান পেশা। শিক্ষকদের সবাই ভালবাসে, সম্মান করে। একজন প্রকৃত শিক্ষকই সমাজ ও দেশের মধ্যে বয়ে চলা সমস্ত অন্ধকারের কালো ছাঁয়া দূর করে দিতে পারে। তাই এটাকে বাণিজ্যিক রুপ দেওয়া উচিৎ নয়। শিক্ষাকে বাণিজ্যিক আকার দান করলে শিক্ষার যে মর্যাদা আছে তা ভুলুণ্ঠিত হবে। সমাজ ও দেশ অন্ধকারে ডুবে যাবে। তবে প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করলে ব্যাপারটা আবার ভিন্ন পর্যায়ে চলে যাবে।
২০১৪ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা সংক্রান্ত এক বিশেষ অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন একজন উচ্চ মানের শিক্ষক যার শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল যাতে শিক্ষার্থীরা শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠে। তিনি বিশ্বের সকল নেতৃবৃন্ধের প্রতি বলেছিলেন যে অস্ত্র নয় শিক্ষার বিনিয়োগ করুন। তাহলে প্রতিটি দেশ উন্নতির স্বর্ণশিখরে দ্রুত পৌঁছাতে পারবে।
তিনি আরো বলেছিলেন আপনারা জানেন শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ অর্থবহ ফলাফল বয়ে আনে। আপনার সন্তানকে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোন বিকল্প নেই। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রদানে নিয়োজিত থাকেন একজন প্রশিক্ষন প্রাপ্ত অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী। তাদের কাছেই আপনার সন্তান যথাযথ প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। সেই লক্ষেই বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এখন প্রয়োজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনার ভুমিকা নিশ্চিত করা। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত ও উপযুক্ত স্থান দখল করতে পারেনা। ব্যক্তি, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য সর্বপ্রথম যে বিষয়টা প্রয়োজন তা হলো শিক্ষা। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতির উন্নতি সম্ভব না।
আর এই শিক্ষা অর্জনের মূল ভিত্তি তৈরীর স্থান হলো প্রাথমিক শিক্ষা। যা প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো থেকেই হাতে খড়ি হয়ে থাকে। আমরা শিক্ষিত সমাজের সবাই উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে থাকি অভিন্ন সিলেবাস আর কারিকুলামের মাধ্যমে। কিন্তু জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রে গিয়েই এই মানুষ গুলো তাদের অর্জিত জ্ঞানগুলোকে ব্যতিক্রম ভাবে উপস্থাপন করে। জীবনের এই ব্যতিক্রমতাটা তৈরী করতে মূখ্য ভুমিকা পালন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আচার আচর ন,কথাবার্তা কাজ ও শিক্ষা দেয়ার ব্যতিক্রমতার ফলাফল ও ভবিষ্যৎ জীবনে ব্যতিক্রমতা তৈরী করে। সুতরাং একটি জাতিকে কিভাবে তৈরী করতে চায় তা নির্ভর করে প্রাথমিক শিক্ষার উপর।
তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান মর্যাদা বাড়াতে সমাজের সকল পর্যায় থেকে কাজ করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বেতন বৈষম্যটা অনেক বেশী যা অন্যান্য ক্ষেত্রে তেমন বৈষম্য দেখা যায় না। এই ধরনের বৈষম্য শিক্ষকদের পাঠ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তারা শিক্ষকতাটাকে উপভোগ করতে পারছে না। তাদের মনে বিভিন্ন ধরনের ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত কোন পর্যায়ের প্রতিনিধিরাই তাদের পেশা নিয়ে সন্তুষ্ট না। যার ফলে এই প্রভাবটা গিয়ে পড়ছে আমাদের কোমলমতি শিশুদের উপর যা আমাদের দেশের জন্য খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে।
সহকারি শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার, সহকারি জেলা শিক্ষা অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিসার সহ যারা এই মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মরত আছে আমার জনামতে কেউ তাদের চাকুরিতে সন্তুষ্ট না। কারণ এই পদে থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ের থেকে কম বেতন পেয়ে থাকে। আরো যে বিষয়টা কষ্ট দেয় এই মন্ত্রণালয়ের অধীন কোন অফিসার কিংবা শিক্ষকদের নিয়মিত কোন পদোন্নতি নেই। এমন অনেকেই আছে যারা যে পদে যোগদান করে সেই পদে থেকেই অবসর গ্রহণ করে থাকে যা চাকুরিতে অসন্তুষ্টির একটা বড় কারণ বলে আমি মনে করি। আমার ব্যক্তিগত অভিমত যে সহকারি শিক্ষকদের পদ কে ভিত্তি পদ ধরে সকল পদে বেতন বৈষম্য দূর করার সাথে সাথে শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিত করতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে । আশা করি সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারিদের বেতন এর যে বৈষম্য দূর করতে পারলে অনেক মেধাবি ও সৃজনশীল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি এই পেশায় আসতে আগ্রহী হবে তাদের সেবা দেওয়ার মন মানসিকতা নিয়ে।
বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে বেতন পায় তা দিয়ে তাদের সংসার চালিয়ে ছেলেমেয়েদের জন্য ভবিষ্যতের সম্পদ গড়া অসম্ভব। ক্রমে ক্রমে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। যার কারলে সংসার চালাতে গিয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়ছে সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর জন্য যা আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে আমার মনে হয়। যদিও সবাই এই মন মানসিকতার না যে এটা দিয়ে সংসার চালাতে হবেই। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা যে এই আর্থিক সমস্যা থেকে ক্রমে ক্রমে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়।
তাই পরিশেষে বলা প্রয়োজন যে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত ও বাস্তব সম্মত মান বৃদ্ধিকল্পে দ্রুততর সাথে সকল বৈষম্য দূর করতে যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তা গ্রহণ করা এবং শিক্ষকদের সাথে সাথে সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারিদের প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে তাদের পেশাগত উন্নয়ন ঘটানো। সকল পর্যায় থেকে শিক্ষক কর্মকর্তা, কর্মচারিদের পেশাগত উন্নয়ন ঘটাতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং এর সাথে সাথে সমাজ ও দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন দেখা দিবে। সমাজ থেকে সকল অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, জুলুম দূর হবে। দেশ ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
“প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে
চলবো শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি একসাথে”
লেখক: প্রধান শিক্ষক (৩৬ তম বিসিএস নন-ক্যাডার)
১০১ নং পূর্ব তেঁতুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
ঝিনাইদহ সদর, ঝিনাইদহ