প্রাথমিকে শতভাগ পদোন্নতির সুযোগ না থাকা অসম্মানজনক
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির সুযোগ না থাকাকে অবহেলা ও অসম্মানজনক বলে মনে করছেন সহকারী শিক্ষকরা। মঙ্গলবার প্রকাশিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে একথা বলেন বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ।
দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘নিয়োগ বিধিতে নারী-পুরুষ উভয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি নির্ধারণ অবশ্যই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু যেখানে সহকারী শিক্ষকদের দাবি ছিল শতভাগ পদোন্নতিসহ ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, সেখানে প্রধান শিক্ষক পদে ৬৫ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান সহকারী শিক্ষকদের প্রতি চরম অবহেলা ও অসম্মানজনক সিদ্ধান্ত।’
তিনি বলেন, ‘এর কারণ শতভাগ পদোন্নতির সুযোগ না থাকলে মেধাবীরা কখনো সহকারী শিক্ষকের পদে আসতে চাইবে না। তাছাড়া সরাসরি নিয়োগের অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে আবেদনের সুযোগ থাকলেও প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সুযোগ রাখা হয়নি। এতে সহকারী শিক্ষকরা চরম হতাশ।’
এই শিক্ষক নেতা বলেন, ‘মেধাবীদের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগে আকৃষ্ট করতে এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শতাভাগ পদোন্নতির কোন বিকল্প নেই। তাই আমাদের দাবি শতভাগ পদোন্নতিসহ সহকারী শিক্ষকদের জন্য একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো।’
তিনি বলেন, ‘সহকারী শিক্ষকদের শতভাগ পদোন্নতিসহ ১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণের ন্যায্য দাবি দ্রত বাস্তবায়ন না হলে আমরা অবশ্যই কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।’
আরো পড়ুন: ১১তম গ্রেড নিয়ে এখনো অন্ধকারে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কমপক্ষে সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতির বিবেচনায় আসবেন। এমন বিধান রেখে মঙ্গলবার নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯ জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রধান শিক্ষকের ৬৫ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ৩৫ শতাংশ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। তবে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতিযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে তা পূরণ করা যাবে। সহকারী শিক্ষক হিসেবে কমপক্ষে সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং নিয়মানুযায়ী প্রশিক্ষণ থাকলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতির বিবেচনায় আসবেন।
আর সহকারী শিক্ষকদের শতভাগ পদ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১৪তম গ্রেডে বেতন পান।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আগের মতোই সরাসরি এবং পদোন্নতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন বিধিমালায় সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের নিয়োগ যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি বা সমমানের সিজিপিএসহ স্নাতক বা স্নাতক (সম্মান) বা সমমানের ডিগ্রি।
এতদিন সব প্রধান শিক্ষক ও পুরুষ সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগে এই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল। এবার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হতে নারী প্রার্থীদেরও শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক (অনার্স) হতে হবে। আগে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য ২৫ থেকে ৩৫ বছর এবং সহকারী শিক্ষক পদের জন্য ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত আবেদন করা যেত। এখন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদে আবেদনের বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ থেকে ৩০ বছর।
বিধিামালায় বলা হয়েছে, সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদের ৬০ শতাংশ মহিলা প্রার্থী, ২০ শতাংশ পোষ্য প্রার্থী এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ পুরুষ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ করা হবে। নির্ধারিত কোটার শিক্ষকদের মধ্যে প্রত্যেক ক্যাটাগরিতে (মহিলা ৬০ শতাংশ, পোষ্য ২০ শতাংশ ও অবশিষ্ট পুরুষ শতাংশ) অবশ্যই ২০ শতাংশ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তবে বিজ্ঞান ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের দিয়ে ওই ২০ শতাংশ কোটা পূরণ না হলে মেধার ভিত্তিতে তা পূরণ করা যাবে বলেও বিধিমালায় বলা হয়েছে।
২০১৪ সালের ৯ মার্চ প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকের পদ তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করে সরকার। তখন থেকে প্রধান শিক্ষকের ৩৫ শতাংশ পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয় সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন মঙ্গলবার বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগে এখন নারী-পুরুষ সবার যোগ্যতাই স্নাতক করা হয়েছে। আগে এইচএসসি পাস যোগ্যতা (নারী সহকারী শিক্ষকদের নিয়োগ যোগ্যতা) চাওয়া হত, তখন স্কেল ছিল একটা, এখন যেহেতু নূন্যতম যোগ্যতা স্নাতক। সুতরাং অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে স্নাতকের যে স্কেল আছে তার থেকে কম হওয়া উচিৎ না, আমরা সেভাবেই অর্থ বিভাগের সাথে প্রাথমিক আলোচনা করেছি এবং সেভাবেই প্রস্তাব তৈরি করছি।’
আরো পড়ুন: কী আছে প্রাথমিকের বিধিমালায়?
২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা করেছিল সরকার। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কেউকে কোনো পদে এডহক ভিত্তিতে আগেই নিয়োগ দেওয়া হলে এবং ওই পদে তিনি অব্যাহতভাবে নিযুক্ত থাকলে তার জন্য প্রযোজ্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা শিথিল করা যাবে।
এছাড়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য বাছাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও চূড়ান্ত নিয়োগের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং যথাযথ এজেন্সির তদন্তে চাকরিতে নিযুক্তির অনুপযুক্ত নন এমন প্রত্যয়ন পেতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিক না হলে এবং বাংলাদেশের নাগরিক নয় এমন ব্যক্তিকে বিয়ে করলে বা বিয়ে করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে তিনি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের যোগ্য হবেন না।