হল বন্ধ রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা, থাকবে কোথায় শিক্ষার্থীরা
করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ আছে। এরপর বিশ্ববিদ্যালগুলোতে অনলাইনে ক্লাস চললেও অনুষ্ঠিত হয়নি কোনো পরীক্ষা। সম্প্রতি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে আবাসিক হলগুলোও বন্ধ রেখে বিভিন্ন বর্ষে চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়ার অনুমতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এতে স্নাতক শেষ বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পাবে বলেও জানায় ইউসিজি।
গত রবিবার (১৩ ডিসেম্বর) ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ সভাপতিত্বে এক ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসময় সব ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা সংযুক্ত ছিলেন। তবে এমন সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের অনেকে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন— আবাসিক হল বন্ধ থাকলে থাকব কোথায়?
দূর-দূরান্ত থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা এসব শিক্ষার্থীদের মতে, ক্যাম্পাসের আশপাশে তেমন আত্মীয়-স্বজন নেই। মহামারি কারণে অন্য বন্ধুর বাসায় অবস্থান করাও সম্ভব নয়। তাই থাকতে হবে আবাসিক হোটেলে। সেই সামর্থ্য নেই অনেকের পরিবারের। এজন্য পরীক্ষা নিতে হলে হলগুলো সীমিত পরিসরে হলেও খুলে দিতে হবে কিংবা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করতে হবে।
আবাসিক হল বন্ধ রেখে আগামী ২৬ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষ বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের পরীক্ষাগুলো নেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ ছাত্র সংগঠনের নেতারা আপত্তি জানিয়েছেন। এমনকি এ সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে ১১ ডিসেম্বর ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা।
মানববন্ধন অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থাকার একমাত্র জায়গা হচ্ছে আবাসিক হলগুলো। পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হলগুলো খুলে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী কনক ফারজানা করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে আছেন। তিনি বলেন, আবাসিক হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক।
তার মতে, হল বন্ধ থাকলে করোনার এই সময়ে ঢাকায় গিয়ে আমরা কোথায় থাকব? ঢাকায় যাঁদের আত্মীয়স্বজনের বাসা আছে, তাঁরাও করোনার সময়ে থাকার জায়গা পাবেন কি না সন্দেহ৷ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা তো আছেই। ঢাকায় বাসা ভাড়া করার জন্য অগ্রিম টাকা লাগে। করোনার সময়ে অনেক পরিবারের টিকে থাকাই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে বাসা ভাড়া করার মতো সামর্থ্য কয়জনের আছে? তা ছাড়া হুট করে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে; শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগের পরীক্ষার প্রস্তুতিও তেমন নেই।
আবাসিক হল বন্ধ রেখেই আগামী ১৭ জানুয়ারি থেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বিভিন্ন বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (১৭ ডিসেম্বর) সকালে এক জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) বিভিন্ন বিভাগের স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরের পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) পরীক্ষা নেওয়া সংক্রান্ত যাচাই বাছাই কমিটির সভার সুপারিশ অনুযায়ী, আগামী ২৭ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
আগামী ২৩ ডিসেম্বর থেকে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) অনার্স চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। আগামী ২৭ জানুয়ারির মধ্যে সব পরীক্ষা শেষ করা হবে। মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রশাসনিক ভবনে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১তম একাডেমিক কাউন্সিল সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী ২০ ডিসেম্বর থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৭ ডিসেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস্ কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
আবাসিক হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেয়ার প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ইউজিসি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেটা ইউজিসির। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ২৬ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। তবে বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিভাগ তাদের সুবিধা অনুযায়ী সব পরীক্ষা নেবে।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবাসিক হলগুলো খুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে রেজিস্ট্রার বরাবর একটি আবেনপত্র দিয়েছে দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) শাখা ছাত্রলীগ। রবিবার (১৩ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর এ চিঠি দেয় সংগঠনটি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সেশনজট নিরসনে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের প্রেক্ষিতে দ্রুত সময়ে পরীক্ষা নেওয়া জরুরি এবং পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সুস্পষ্ট মতামত জানিয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য হলে থাকার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা ও ব্যবহারিক ক্লাস-মূল্যায়ন বিষয়ে ইউজিসির ৭টি সুপারিশ:
১) বিশ্ব মহামারী কোভিড-১৯ সংকটের কারণে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে তা থেকে উত্তরণের জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিসমূহের সুপারিশের প্রেক্ষিতে একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
২) বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসাসহ অন্যান্য শাখার অসমাপ্ত ব্যবহারিক ক্লাস এবং তার মূল্যায়ন স্বাস্থ্য বিধি মেনে পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করতে হবে।
৩) সেমিস্টার পরীক্ষা, ব্যবহারিক ক্লাস ও মূল্যায়ন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সর্বশেষ সেমিস্টারের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পাবে।
৪) করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ সরকারের নির্দেশনায় বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসমূহ বন্ধ রাখতে হবে।
৫) শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে পরীক্ষা ও ব্যবহারিক ক্লাস পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থীদেরকে পরীক্ষা ও ব্যবহারিক ক্লাস শুরুর সর্বোচ্চ জন্য ১ ঘণ্টা আগে ক্যাম্পাসে প্রবেশ এবং শেষ হওয়ার ১ ঘণ্টার মধ্যে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে হবে।
৬) কোভিড-১৯ সংকটের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে চলমান শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
৭) বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধকল্পে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন ও অনুসরণ করতে হবে।
গত রবিবার (১৩ ডিসেম্বর) ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ সভাপতিত্বে এক ভার্চুয়াল সভায় এসব সুপারিশ করা হয়।