গরীবকে ধর্ষণ করা তত খারাপ নয়, যত খারাপ ধনীকে!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল রয়েছে পুরো ক্যাম্পাস। ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।
বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস স্ট্যাটাস দিয়েছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি লিখেছেন, ‘‘বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী একটি ছিনতাইকারী মাদকাসক্ত লোক দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য শুনলাম এ নিয়ে। তাঁরা ধর্ষক মজনুর কীর্তিকলাপ যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তাতে মনে হলো, মজনু ছাত্রীটিকে ধর্ষণ করে ভীষণ অন্যায় করেছে।
এর আগে সে প্রতিবন্ধী মেয়ে এবং ভিখারিনীদের ধর্ষণ করতো, সেটাকে ততটা অন্যায় বলে মনে করা হচ্ছে না, যতটা অন্যায় সে করেছে ভাবা হচ্ছে ছাত্রীটিকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণেরও তাহলে ক্যাটাগরি আছে! গরীবকে ধর্ষণ করা তত খারাপ নয়, যত খারাপ ধনীকে ধর্ষণ করা! তাই না?
আসলে সব ধর্ষণই একই রকম খারাপ। একটি লোক একই অন্যায় করে যখন সে তার বিদুষী স্ত্রীকে ধর্ষণ করে, অথবা বুদ্ধিসুদ্ধিহীন কোনও প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণ করে, অথবা পতিতালয়ের কোনও নিরক্ষর পতিতাকে ধর্ষণ করে, অথবা রাস্তার সর্বহারা ভিখারিনীকে ধর্ষণ করে।’’
এর আগে তিনি এক নিবন্ধে লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ছাত্রীটির নাম কি? নাম কেন বলা হচ্ছে না? তার চেহারাও কেন দেখানো হচ্ছে না? আমরা কিন্তু ধর্ষকের চেহারা দেখে ফেলেছি, তার নাম যে মজনু তাও জেনে ফেলেছি। ধর্ষণের শিকারকে কেন মুখ লুকোতে হবে? ধর্ষকরা তো দিব্যি নাম ধাম সাকিন জানিয়ে দেয়, ক্যামেরার দিকে তাকাতে তাদের তো লজ্জাবোধ হয় না! তাহলে কি ঘটনা এই যে সমাজের ভয় একজন ধর্ষিতার আছে, কিন্তু একজন ধর্ষকের নেই? কেন নেই? এককালে না হোক, আজকাল তো ধর্ষকদের পুরুষেরাও মেনে নেয় না। তারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে নিজেরা যে ধর্ষক নয়, তা প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, বলতে থাকে সব পুরুষ ধর্ষক নয়, ধর্ষকের জন্য কঠিন কঠিন শাস্তির প্রস্তাব দিতে থাকে, ফাঁসি, পুরুষাঙ্গ কর্তন, কত কী। তাহলে কেন আজও এই একবিংশ শতাব্দীতেও মেয়েরা নিজের পরিচয় লুকোতে বাধ্য হয়?
আমরা জানি কেন লুকোয় পরিচয়। কারণ যতই মানুষ ধর্ষণের বিরুদ্ধে বলুক, যতই ধর্ষককে গালি দিক, মানুষ আজও মেয়েকেই দোষী বলে মনে করে। মেয়েটি কী পোশাক পরেছিল? কোনও ছোট পোশাক? মেয়েটি যদি কোনও ছোট পোশাক না পরে থাকে, তবেও দোষ, কেন হিজাব পরেনি, যদি হিজাব পরে থাকে, তবে দোষ কেন বোরখা পরেনি। মেয়েটি বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছিল, কেন একা যাচ্ছিল, একা গেলে তো এরকম হবেই। কেন কোনও পুরুষ আত্মীয় ছিল না সঙ্গে? কেন সন্ধেয় যাচ্ছিল, দিনের বেলায় তো যেতে পারতো! দোষের শেষ নেই। ধর্ষণকে পুরুষের অধিকার বলে যারা বিশ্বাস করে, তারা পদে পদে মেয়েদের দোষ খুঁজে বেড়াবে বলার জন্য অন্য মেয়েরা তো ধর্ষণের শিকার হয় না, ও হলো কেন, নিশ্চয়ই ও খারাপ। নিশ্চয়ই ধর্ষিতা হতেই সে চেয়েছে!
ধর্ষণের কারণ যে পুরুষের নারীবিদ্বেষ, নারীকে যৌনবস্তু ভাবার মানসিকতা, নারীকে নির্যাতন করাই যায়, নারী তো নিতান্তই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তু- এই বিশ্বাস, তা অনেকে জানে না। অথবা জানলেও না জানার ভান করে। ধর্ষণের শিকার হলে হাজারো মেয়ে সাধারণত মুখ বুজে থাকে। তারা রাষ্ট্র করে না খবর। এই মেয়েটি জানিয়েছে সব্বাইকে। নিঃসন্দেহে সাহসী মেয়ে। কিন্তু সে ততটুকু সাহসী নয়, যতটুকু সাহসী হলে পাছে লোকে কী বলবে তার তোয়াক্কা করে না।
দিল্লির বাসে যে মেয়েটিকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল, মৃত্যুর সঙ্গে যখন সে লড়ছিল, সারা পৃথিবীর সমর্থন সহানুভূতি পেয়েছিল সে, তারপরও নিজের নাম যে জ্যোতি সিং, তা বলেনি। তার নাম দেওয়া হয়েছিল নির্ভয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটির নামও কি তবে ওই জাতীয় কিছু একটা দেওয়া হবে? আর কতদিন এই ভীতু মেয়েদের আমরা নির্ভয়া বা সাহসিনী বলে ডাকবো?