২৩ অক্টোবর ২০১৯, ২৩:২১

উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে জাবিতে নতুন বিতর্ক

  © সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) চলমান উপাচার্য বিরোধী আন্দোলন জামায়াত-শিবিরের মদদপুষ্ট বলে প্রশাসন দাবি করলেও আন্দোলনকারীরা এটিকে প্রশাসনের নতুনভাবে সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন। প্রশাসন বলছে, জাবিকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য নানান ষড়যন্ত্র করছে আন্দোলনকারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ক্যাম্পাস থেকে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, আন্দোলনকারী বলছে, যৌক্তিক আন্দোলনকে বিতর্কিত করার জন্য নতুন ষড়যন্ত্র ফেঁদেছে প্রশাসন। তাদের আন্দোলনে কোন ধরণের সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নেই বলে দাবি তাদের।

বুধবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ বলেন, ‘গতকাল মশাল মিছিল চলাকালীন সময়ে আমরা সাদ শরীফ নামের যাকে আটক করেছি তার মোবাইল থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রমাণিত হয় চলমান উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনের মদদ দিচ্ছে শিবির। শুধুমাত্র জাবিকে অস্থিতিশীল করে তোলার নয়, বরং পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা তার স্বরূপ উন্মোচিত করেছি।’

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, ‘আন্দোলনকারীগণ কর্তৃক পালিত দিনের বেলার বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম লক্ষ্য করা গেলেও সন্ধ্যা বা রাতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এতে সন্দেহ হলে আমরা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিত তাদেরকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি। তাদের মধ্যে একজন আমার কাছে শিকার করেছে সে শিবির করে। আমরা প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদেরকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করি।’

এ সময় প্রক্টর সংবাদ সম্মেলনে সাদ শরীফের সঙ্গে কথাবর্তার কয়েকটি অডিও ভয়েস ম্যাসেজ সাংবাদিকদের শোনান। চলমান আন্দোলন সম্পর্কিত এসব একমুখী ভয়েস ম্যাসেজে সাদ শরীক ও ‘অচিহ্নিত’ তিনজনের কথোপকথন শুনা যায়।

অন্যদিকে, সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনে অনুষ্ঠিত এক ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এর অন্যতম মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘এই দুর্নীতিবাজ উপাচার্য আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনকে বিতর্কিত করার জন্য নতুন ষড়যন্ত্র ফেঁদেছে। আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, আমাদের আন্দোলনে কোন ধরণের সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নেই।’

এইসময় আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক জামালউদ্দিন রুনু বলেন, ‘আন্দোলনকৃতদের সাথে শিবিরের কোন সম্পৃক্ততা নেই। দুইজন সাবেক শিক্ষার্থীকে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় আটক করে আন্দোলনকারী বলে চালানো হচ্ছে। এছাড়া প্রশাসন কর্তৃক মামলা দায়ের করার পরে সেই মামলা সম্পৃক্ত কোন আলামত রাষ্ট্রীয় তদন্ত ছাড়া প্রচার করে প্রক্টর আইন সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছেন।’

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভিসির অপসারণের দাবিতে সন্ধায় মশাল মিছিল করে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মশাল মিছিল চলকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌরঙ্গী এলাকা থেকে সাবেক শিক্ষার্থী সাদ শরীফ ও নূরুল আমিনকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের পুলিশে সোপর্দ করে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহিন মামলার বাদী হয়ে শুধু সাদ শরীফের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছে। আটককৃতদের মধ্যে অন্যজন ৪২ ব্যাচের শিক্ষার্থী নূরুল আমিনের সাথে শিবির সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে এখনো কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং এখন পর্যন্ত মুক্তিও দেওয়া হয়নি।

বুধাবার দুপুরে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ‘অপপ্রচার’ ও ‘গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ মামলা করা হয় বলে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন আশুলিয়া থানার ইন্সপেক্টর তসলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গতকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুইজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেন। এদের কর্তৃপক্ষ সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪১তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী সাদ শরীফের বিরুদ্ধে মামলা করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে তারা শিবির করে না বলে জানা গেছে, তবে সাদ শরীফ অন্য কোনো নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।’

অন্যদিকে, মঙ্গলবার রাতে পুলিশে হস্তান্তরের সময় সাদ ও নূরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা শিবির করেন না বা কোনো সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত নন। তারা ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসেছিলেন। উপচার্যের অপসারণের দাবির একটি মিছিলের সময় তারা চৌরাঙ্গী এলাকায় দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষক গিয়ে তাদের আটক করে’

প্রশাসনের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ মো. মনজুরুল হক, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, প্রভোস্ট, বিভাগীয় সভাপতিবৃন্দ।

আন্দোলনকারীদের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কামরুল আহসান, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, অধ্যাপক তারেক রেজা, সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সুস্মিতা মরিয়ম, ছাত্র অধিকার পরিষদের শাকিলউজ্জামান, আরিফ, ছাত্রফ্রন্টের মাহাথির মোহাম্মাদসহ প্রমুখ শিক্ষক-শিক্ষার্থী বৃন্দ।