জাবিতে শৃঙ্খলাবিধির নামে স্বাধীন মত প্রকাশে বাঁধা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবিধি সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশকে বির্তকিত ও নিবর্তনমূলক ভাবে হালনাগাদ করা হয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত চিন্তা চর্চাকারী সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সংশোধিত নতুন অধ্যাদেশে যুক্ত হওয়া নতুন দুটি ধারা নিয়ে প্রধানত বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
নতুন করে যুক্ত হওয়া এ ধারা দুটি হলো- অধ্যাদেশের ৫ এর (ঞ) উপধারায় বলা হয়েছে, কোন ছাত্র/ছাত্রী অসত্য এবং তথ্য বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কোন সংবাদ বা প্রতিবেদন স্থানীয়/জাতীয়/আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ/প্রচার করা বা উক্ত কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না। এছাড়া ৫ এর (থ) উপধারায় বলা হয়েছে, কোন ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর উদ্দেশ্যে টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টানেটের মাধ্যমে কোন অশ্লীল বার্তা বা অসৌজন্যমূলক বার্তা প্রেরণ অথবা উত্যক্ত করবে না।
অধ্যাদেশ মতে, ধারা দুটির ব্যতয় ঘটলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখে ‘অসদাচরণ’ বলে গণ্য হবে। এজন্য লঘু শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, সতর্কীকরণ এবং গুরুতর শাস্তি হিসেবে আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কার ও পাঁচ হাজার টাকার উর্দ্ধে যেকোন পরিমাণ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেই ধারাদুটি যুক্ত করা হয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন যে ধারা দুটিতে উল্লেখিত ‘অসত্য, তথ্য বিকৃত’ এবং অশ্লীল বা অসৌজন্যমূলক বার্তা প্রেরণ অথবা উত্যক্ত করার’ সংজ্ঞা নির্ধারন করবেন কে? এছাড়া এই ধারা দুটির মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাঁধার মুখে পড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যম কর্মীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসূত্র জানায়, ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত এক রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শৃঙ্খলা বিধিকে ‘দুর্বল ও সেকেলে’ উল্লেখ করে তা হালনাগাদের পরামর্শ দেয়। শৃঙ্খলা বিধির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করতে ওই বছরের ১৬ মে তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেনকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটির হালনাগাদ করা শৃঙ্খলা বিধি গত ০৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাদেশ হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে।
এ বিষয়ে জাবি সিনেট সদস্য ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশের ধারা ৫(ঞ) এবং (থ) উপধারা দুটি বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা) এবং অনুচ্ছেদ ৪০ (পেশা বৃত্তির স্বাধীনতা) এর পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত চিন্তার বিকাশ এবং লালন-পালনের যথাযথ স্থান। এই উপধারা দুটি ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ভীতি ও শঙ্কার তৈরি করবে, যা শুভকর নয়। এছাড়া ক্যাম্পাসে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ কর্মীদের কাজের ক্ষেত্র সংকোচিত করবে এবং সাংবাদিক বৃন্দ নিগ্রহের স্বীকার হতে পারেন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি প্লাবন তারিক বলেন, ‘সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে বিধি দুটি যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি, দূর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা সবসময় সো”চার। সাংবাদিকদের কন্ঠ রোধ করতেই এই উদ্যোগ। অবিলম্বে এটি বাতিল করতে হবে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি শাখার দপ্তর সম্পাদক হাসান জামিল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি শিক্ষার্থীর স্বার্থ বিরোধী ও নিবর্তন মূলক ধারা বাতিলের আহবান জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোন আইন তৈরি করা হলে শিক্ষার্থীদের সাথে করে নিয়ে কঠোর ভাবে প্রতিহত করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যায়ন বিভাগের সাবেক সভাপতি সহকারী অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার মন্ডল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যুক্ত করা নতুন দুটি ধারা ক্ষেত্রে যেখানে রাষ্ট্রের বিধিমালা রয়েছে সেখানে আবার নতুন করে আইন তৈরী করার প্রয়োজন হয় না। এটা কারা করেছে জানিনা তবে কোন ভাবেই ঠিক হয়নি। তাছাড়া ধারা দুটির কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই ফলে যে যার মত করে ব্যবহার করবে। এমন ধারা তৈরি করার পূর্বে অবশ্যই এর সাথে সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তিদের সাথে বসা উচিৎ ছিল। তাহলে আর এমন বিতর্কের সৃষ্টি হতো না।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সাথে যোগাগের চেষ্টা করা হলে তিনি অসুস্থ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আমির হোসেন বলেন, ‘নতুন বর্ষের প্রবেশিকা অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে তাড়াহুড়া করে শৃঙ্খলা বিধি পাশ করার কারনে আলোচনা করার সুযোগ হয়নি। তবে যদি এ বিষয়ে কারো কোন বক্তব্য থাকে তবে অবশ্যই আলোচনা করা হবে। এছাড়া ধারা দুইটায় অশ্লীল বা অসৌজন্যমূলক বার্তা অথবা উত্যক্ত করা বলতে কি বুঝানো হয়েছে সেটার ব্যাখ্যা নেই। ফলে আমরা অথবা যেকেউ চাইলে তাদের মত করে ব্যবহার করতে পারে।’