২৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:১০

জাবিতে ছিনতাইয়ের দায়ে বহিষ্কৃতরা ‘ছাত্রলীগেরই কর্মী’!

লাল বৃত্তের ভিতর জাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির সাথে আজীবন বহিষ্কৃত দুই ছাত্রলীগকর্মী  © ফাইল ফটো

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছিনতাইয়ের অভিযোগে তিন শিক্ষার্থীকে আজীবন ও দুই শিক্ষার্থীকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর আগেও আজীবন বহিষ্কার হওয়া ওই তিন শিক্ষার্থী ছিনতাই, সাংবাদিক মারধর ও ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে বহিষ্কৃত হন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে আজীবন বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদেরকে ছাত্রলীগকর্মী বলে উল্লেখ করা হয়। তবে শাখা ছাত্রলীগ তাদেরকে নিজেদের কর্মী হিসেবে অস্বীকার করলে এ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সরগরম রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক।

আজীবন বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন- লোকপ্রশাসন বিভাগের ইয়া রাফিউ শিকদার, মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও মো. সোহেল রানা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম ব্যাচ ও শহীদ রফিক-জব্বার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। আর দুই বছরের জন্য বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন- বাংলা বিভাগের আসিফ আহমেদ ও সজিব কাজী।

এদিকে শাখা ছাত্রলীগ বহিষ্কৃতদেরকে নিজেদের কর্মী হিসেবে অস্বীকার করলেও বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে বহিষ্কৃতরা শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে শাখা ছাত্রলীগ আয়োজিত ভর্তিচ্ছুদের সহায়তা কর্মকাণ্ডেও তাদেরকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। এমনকি বিভিন্ন জায়গায় বহিষ্কৃতরা নিজেদেরকে ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও জানা গেছে। হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজীবন বহিষ্কৃত ইয়া রাফিউ শিকদার, মোস্তাফিজুর ও সোহেল শহীদ রফিক-জব্বার হলের ১১৪নং রুমে থাকতেন। মূলত ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে ইচ্ছুক প্রথম বর্ষের যে সকল শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে থাকেন তাদেরকে সেই রুমে থাকতে দেওয়া হয়।

এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর বহিরাগত এক যুগলকে মারধর এবং ছিনতাইয়ের ঘটনায় বাঁধা দেয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত এক সাংবাদিককে মারধর ও ছাত্রীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় আজীবন বহিষ্কৃত হওয়া ওই তিনজনসহ সাতজনকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যদিও ওইদিনই বহিষ্কার আদেশে ভুল আছে উল্লেখ করে তিনজনের নাম বাদ দিয়ে চারজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে মর্মে অফিস আদেশ জারি করা হয়। সপ্তাহ খানেক পর সাময়িক বহিষ্কার হওয়া বাকি চারজনের বহিষ্কারাদেশও স্থগিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের চাপের মুখে বহিষ্কারাদেশ সংশোধন ও স্থগিতের ঘটনা ঘটে। ২ অক্টোবরের প্রথম বহিষ্কার আদেশে যে সাতজনের নাম ছিলো তার মধ্যে শহীদ রফিক-জব্বার হল ইউনিট ছাত্রলীগের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী নেজাম উদ্দিন নিলয়সহ তিন কর্মী শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী বলে পরিচিত। সাধারণ সম্পাদকের চাপের মুখে ওই বহিষ্কারাদেশ পরিবর্তন করে চারজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এরপর শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানার চাপের মুখে বাকি চার শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ স্থগিত করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাখা ছাত্রলীগের এক সহ-সভাপতি বলেন, ‘সাংবাদিক মারধরের ঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের সম্পাদক তার তিন অনুসারীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করান। এটা জানতে পেরে শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি নাহিদ হোসেন বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য সভাপতিকে বলেন। পরে সভাপতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করলে এক সপ্তাহের মাথায় সেই চার শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।’

প্রগতিশীল ছাত্রজোটের এক নেতা বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কল্যাণকর অনেক ভালো কাজ করে ছাত্রলীগ। সে কাজগুলো এ সকল কর্মীরাই করেন। ছাত্রলীগ যেহেতু তার কর্মীদের ভালো কাজের কৃতিত্ব নেয়। তাই কর্মীদের খারাপ কাজের দায়ভারও তাদেরকে গ্রহণ করতে হবে।’

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘প্রথম বর্ষের থাকা অবস্থায় সকল শিক্ষার্থীই ছাত্রলীগের কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে। এ হিসেব করলে প্রত্যেক ছাত্রই ছাত্রলীগকর্মী। ছিনতাইয়ের ঘটনার আগে আমি তাদেরকে চিনতামই না।’
সাংবাদিক মারধরের ঘটনায় প্রশাসনকে চাপ প্রদানের ব্যাপারে তিনি বলেন,‘তড়িঘড়ি করে মূলহোতাকে বাদ দিয়ে বহিষ্কারাদেশ জারি করে প্রশাসন। আমি প্রশাসনকে সুষ্ঠু তদন্ত করে আসল অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাই। তদন্তের জন্য সময়ের দরকার হলে সময় নেওয়ার দাবি জানাই।’

উল্লেখ্য, রবিবার আইবিএ’র সান্ধ্যকালীন কোর্সের শিক্ষার্থী জাহিদুর রহমান অর্ণব ও তার বান্ধবী ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসলে বহিষ্কৃত পাঁচ শিক্ষার্থী তাদেরকে বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে নিয়ে সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ সহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনতাই করেন। ছিনতাইয়ের খবর পেয়ে শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক কে এম সানজীদ ফেরদৌস, উপ-বিজ্ঞান সম্পাদক আকিক হোসেন সিয়াম, উপ-অর্থ সম্পাদক মাজেদুল হক বায়েজিদ ও ছাত্রলীগকর্মী সিহাব উদ্দিন ঘটনাস্থলে যান। তারা অভিযুক্তদের আটক করেন। পরে জাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জুয়েল রানাসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন।