নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ঢেকে যায় ছাত্রলীগের ইতিবাচক কাজ
আগামীকাল শনিবার (৪ জানুয়ারি) ৭১ বছর পেরিয়ে ৭২ বছরে পা দিবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ সালের এইদিনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে যাত্রা এই ছাত্র সংগঠনের। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহুবিধ কারণে নন্দিত ও নিন্দিত হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এ সংগঠটির।
শুরু থেকে দেশ ও জনগণের স্বার্থরক্ষায় প্রত্যেকটি আন্দোলনে এই সংগঠনের ছিল গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তবে সময়ের পরিক্রমায় ছাত্রলীগ একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়। নিজেদের মধ্যে দলাদলি, অন্তর্কোন্দল, হামলা-মারামারিসহ নানা কারণে ছাত্রলীগের সমালোচনাও আছে। এরই ফলে সংগঠনটি অনেক ভাল কাজ করলেও নেতিবাচক কাজের ফলে সেই ইতিবাচক কাজগুলো ঢাকা পড়ে গেছে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগ তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শনিবার বিকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ও পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ আয়োজনে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। এদিকে, জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগও দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবময় স্থান করে নিয়েছে সংগঠনটি। শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে জন্ম নিলেও পাকিস্তান আমলে সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া। দেশ স্বাধীনের পর নাম হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এ সংগঠনের সুচনালগ্নে নাইমউদ্দিন আহম্মেদ ছিলেন আহবায়ক। এছাড়া ১৪ সদস্যের একটি কমিটি ছিল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর আরমানিটোলায় ছাত্রলীগের প্রথম সম্মেলনে দবিরুল ইসলাম সভাপতি ও মোহাম্মদ আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ এ পথ চলায় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে-পরে অধিকার আদয়ের বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্রলীগ ভূমিকা রেখেছে বার বার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় ছাত্রলীগ। ৬৬-এর ছয় দফার পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া দায়িত্ব পালন করেছে ছাত্রলীগ। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে থেকেছে অগ্রভাগে। ১৯৭১ সালেও মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অবদান রেখেছে সংগঠনটি।
নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগ। ছাত্র স্বার্থ রক্ষায়ও এ সংগঠনের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। দাবি আদায়ের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে সংগঠনটির অসংখ্য নেতাকর্মী প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনের নেতাকর্মীরা পরে জাতীয় রাজনীতিতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এখনও দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান জাতীয় রাজনীতির অনেক শীর্ষ নেতার রাজনীতিতে হাতেখড়িও হয়েছে ছাত্রলীগ থেকে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগ্রামে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দিয়েছে তবে ৯০-এর দশকের পরে কাদা লাগতে শুরু করে সংগঠনটির গায়ে। কিছু গ্লানি ছাত্রলীগের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করতে থাকে। যার ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত আছে।
নব্বইয়ের দশকের পরে এসে ছাত্রলীগের নেতাদের ঘাড়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মারামারি-হানাহানি, দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা এমনকি খুনের মামলার অভিযোগও উঠতে থাকে। নব্বইয়ের শেষের দিক থেকে কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে। এ ধরনের ঘটনায় সমালোচনায় ফেলেছে খোদ আওয়ামী লীগকে। ছাত্রলীগ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে-এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।
বিগত ১১ বছর আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়ে পত্রিকায় বারবার খারাপ খবরের শিরোনাম হতে হয়েছে ছাত্রলীগকে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে চাঁদাবাজির অভিযোগ মাথায় নিয়ে সংগঠনটির র্শীষ নেতৃত্বকে (শোভন-রাব্বানী) সরিয়ে দেয়া হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে আসেন আল নাহিয়ান খান জয় এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্বে আসেন লেখক ভট্টাচার্য। তাছাড়া অন্তর্কোন্দল, খুন, হানাহানি লেগেই ছিল এ সংগঠনঠিতে। সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবরে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে খুন করে সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী। এ ঘটনায় দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে। পরে সেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
এর আগেও ২০১০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ হারায় মেধাবী ছাত্র আবু বকর। ছাত্রলীগের মধ্যে অন্তর্কলহে বিরোধীপক্ষের হামলায় ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের মারা যান। বিএনপির-নেতৃত্বাধীন ১৮-দলের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময়ে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর হাতে ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন দর্জি দোকানের কর্মী বিশ্বজিৎ দাস।
সংগঠনটির নেতাকর্মীদের এমন কর্মকান্ডে ক্ষোভ ও হতাশা খোদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরাই। গত বুধবার সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজক ওরিয়েন্টেশন কোর্সে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দুর্নামের একটা ধারা ছাত্রলীগের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ছাত্রলীগকে আবার সুনামের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে, এটা আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগের যে বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই জরুরি সেটা হচ্ছে আচরণগত। আমাদের মনে রাখতে হবে- যত ভালোই উন্নয়ন হোক, আচরণ খারাপ হলে ভালো উন্নয়ন ম্লান হয়ে যাবে। একটা খারাপ আচরণ ১০টা ভালো উন্নয়ন-অর্জন ঢেকে দিতে পারে। আমাদের নেত্রীর (শেখ হাসিনা) কোনো একটা অর্জন সমগ্র জাতি প্রশংসার চোখে দেখছে, সারা বাংলায় আলোচনা হচ্ছে- ঠিক তখনই এমন একটা কাণ্ড, একটা আচরণ বাস্তবে দেখতে পাই, যাতে নেত্রীর সোনালি অর্জন নষ্ট ও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমরা তখন খুব কষ্ট পাই। আমরা মর্মাহত হই। আমরা যারা ছাত্রলীগ করেছি, আমাদের মন বিষাদে ভরে যায়। এটা আমরা আশা করি না।
সংগঠনের সার্বিক বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। এই সংগঠনের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সব সংগঠনেই ভালো-খারাপ দুটোই থাকে; এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের অনেক ইতিবাচক কাজ রয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমে খুব একটা আসেনা। তিনি আরও বলেন, সংগঠনে কোন অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেয়া হয়না। তবে কিছু অতিউৎসাহী আছে যাদের কারণে মূলত আমাদের পুরো সংগঠনের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত দ্বন্দের ব্যাপারে এসব অতি উৎসাহীদের দায়ভার আমরা নিবো না।
গত বছর ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ভিন্নধর্মী উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন সবাই। ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে ‘জয় বাংলা বাইক সার্ভিস’ দৃষ্টি কেড়েছে সবার। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বাইকে করে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়ায় খুশির কমতি ছিল না শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বহির্গমন রাস্তা-নীলক্ষেত মোড়, শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর, পলাশী মোড়ে ‘জয় বাংলা বাইক সার্ভিস’ সক্রিয় রাখা হয়। এছাড়া ভর্তিচ্ছুদের সহায়তার জন্য ক্যাম্পাসে মোট ২১ টি তথ্য প্রদান ও শিক্ষার্থী সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করে ঢাবি ছাত্রলীগ। যা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
শুধু ঢাবি নয় ঢাবির বাইরে ব্যতিক্রমধর্মী অনেক উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে সংগঠনটি। গত বছরের ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) “জি এম এ জি ওসমানী হল” এর দেওয়ালে বুটেক্স ছাত্রলীগের উদ্যোগে উদ্বোধন করা হয়েছিল “মানবতার দেওয়াল ”। যেখানে সমাজের পিছিয়ে মানুষদের সহযোগিতায় যে কেউ যেকোন ধরনের জামা-কাপড় ঝুলিয়ে রেখে যেত। এখানে জমা দেয়া কাপড় সমাজে অসহায় দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ছাত্রলীগের এমন উদ্যোগ মন ছুঁয়েছিল সবার।
ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিনদিনের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শুরু হবে ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা। এর আগে সকল সাংগঠনিক ইউনিটে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে কাটা হবে কেক। বিকালে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান ও পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ আয়োজনে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া ৬ জানুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা সংলগ্ন বটতলায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি এবং ৭ জানুয়ারি সকাল ১০টায় শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও এইদিন বিকাল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ চত্ত্বরে দুস্থদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।
এদিকে, জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সংগঠনের দপ্তর সম্পদক ইমান আহমেদ ইমন বলেন, ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমাবেশ ও র্যালি করা হবে। এতে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত থাকবেন।