১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:৪১

ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়ে তিন ধরনের চিন্তা, সিদ্ধান্ত আজ

  © লোগো

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে সংগঠনটির ‘বিকল্প নেতৃত্ব’ নিয়ে আলোচনা-গুঞ্জন চলছে সর্বত্র। এ ক্ষেত্রে আগাম সম্মেলন? আহ্বায়ক কমিটি, নাকি ভারপ্রাপ্ত দিয়ে সংগঠন চালানো হবে তা নিয়ে কাজ করছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।  এসব বিষয় নিয়ে আজ শনিবার আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত হতে পারে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একটি সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে গত সোমবার ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। এ সময় ছাত্রলীগের বিষয়ে তাকে কিছু নির্দেশনাও দেন তিনি। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নিজেই ছাত্রলীগের বিষয়গুলো দেখছেন। এর পাশাপাশি দলের চারজনকে ছাত্রলীগের বিষয়টি দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছেন। বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন নেতার বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের মধ্য থেকে যোগ্য দুই নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।

জানা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। বিশেষ করে তাদের নেতীবাচক কর্মকান্ড ও গোয়েন্দ রিপোর্ট নিয়ে আলোচনার মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিতর্কিত ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা দেওয়া ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, সম্মেলনের পরও একাধিক শাখায় কমিটি না দেওয়া, দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা, গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে চলা কিংবা ফোন না ধরা, সংগঠনের একাধিক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েও নির্ধারিত সময়ের অনেক পর উপস্থিত হওয়া অথবা অনুপস্থিত থাকা ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে সমালোচনামুখর হয়ে ওঠে নেতারা। এর পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের মধ্যে থেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ৪-৬ পারসেন্ট চাঁদা দাবি করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম।

প্রধানমন্ত্রীর কঠোর মনোভাবের পর নড়েচড়ে বসেন ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে গণভবনে ঢোকার তাদেও স্থায়ী পাস বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। ওই দিনের পর ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই দফা চেষ্টা করার পরেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। সর্বশেষ মঙ্গলবার তারা গণভবন থেকে ফিরে আসেন।

এদিকে, শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ না পাওয়ায় পর সংগঠনের প্যাডে সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেন শোভন-রাব্বানী। চিঠিটি ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতার একজনের কাছে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের সমাপনী দিনের বিরতির সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদস্থ কার্যালয়ে চিঠিটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে নিজেদেন অবস্থান তুলে ধরেন রাব্বানী।

২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতিতে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে ছাত্রলীগের কমিটি করা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ এক বছর না পেরোতেই তাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতাসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মকান্ডে কথা ওঠে আসে।

এর মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা, অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতা, নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত মূল্যায়ন না করা অন্যতম। এছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপেক্ষা, ফোন রিসিভ না করার অভিযোগও আছে। এর বাইরে রাতজাগা ও দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা, কর্মসূচিতে বিলম্বে যাওয়া, প্রধান অতিথিদের বসিয়ে রাখা, জেলা সম্মেলন করতে না পারা, বিতর্কিতদের দিয়ে কমিটি গঠনের বিষয়ও এ তালিকায় রয়েছে। এসব দেখে এবং শুনে ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এদিকে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুব্ধ মনোভাব জানার পর সংগঠনটির পরবর্তী নেতৃত্বে কারা আসছেন সেই আলোচনা এখন সর্বত্র। বর্তমান কমিটির মেয়াদ যেহেতু আরও ১০ মাস রয়েছে-তাই আগাম সম্মেলন হবে, নাকি সম্মেলন ছাড়াই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে সেই আলোচনাও চলছে। এই বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আপাতত সম্মেলনে না গিয়ে নতুন নেতৃত্বের কথাই ভাবা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের মধ্যে থেকে ভারপ্রাপ্ত অথবা ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত করা হতে পারে। দলের হাইকমান্ড তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার উপর।