০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৭:৩১

অভিষেক মণ্ডলের এমন কুকীর্তি নতুন কিছু নয়

বারবার অপরাধ করেও পার পেয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক অভিষেক মন্ডল। যার বিরুদ্ধে বিগত তিন বছরে সাংবাদিক মারধর, দোকানপাট ভাঙচুর, নিজ দলের নারী নেতৃকে লাঞ্ছনা, আবাসিক শিক্ষার্থীকে মারধর করে হল থেকে বিতাড়িত করা, চাঁদাবাজিসহ রয়েছে নানা রকমের বিশৃঙ্খলার অভিযোগ। এতকিছুর পরেও তিনি বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ছাত্রসংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতা। যদিও বা তার বৈধ ছাত্রত্ব নেই। এবং অবৈধ ভাবে হলে অবস্থান করে। 

আজ শনিবার আবারো মারধর করেছে তিনি। মারধরের শিকার ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ এর অন্যতম কর্মী ও সংগঠক এবং জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম সাইমুম। ফলে প্রশাসনের সাথে আন্দোলনকারীদের যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল তা আবারো বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং পূর্ব ঘোষিত আলোচনা ভেস্তে গিয়েছে। অভিষেকের বিরুদ্ধে আগেও একাধিকবার বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিক মারধর: ২০১৬ সালের ২৩শে নভেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চাঁদাবাজির ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে যায় দৈনিক কালবেলা পত্রিকার ক্যাম্পাস প্রতিনিধি মো. মূসা এবং সময়নিউজ.কম এর ক্যাম্পাস প্রতিনিধি সাগর কর্মকার। এসময় চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এক যুবককে প্রক্টরিয়াল বডির কার্যালয়ে নিয়ে আসার পথে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অবস্থানরত শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ রাসেলের অনুসারী অভিষেক মন্ডলসহ বেশ কয়েনজন চাঁদাবাজকে বেধড়ক মারধর করতে থাকে। মারধরের এই দৃশ্য ধারণ করার সময় সাংবাদিক মুহাম্মদ মূসার উপর চড়াও হয় অভিষেক মন্ডল সহ তার সঙ্গীসাথীরা।

আবাসিক ছাত্রকে মারধর ও হল থেকে বিতাড়িত করা: ২০১৮ সালের ২৯ এপ্রিল ঠিক আজকের মত শহীদ রফিক জাব্বার হল সংলগ্ন খাবারের দোকানে জিয়াউল হক নামের কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক কর্মীকে মারধর ও পরবর্তীতে তাকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এসময় তার মোবাইল ও ছিনিয়ে নেয়। মারধরের শিকার জিয়াউল হক নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪২ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।

অস্ত্রের মুখে চাঁদাবাজি, দোকান ভাঙ্গচুর এবং মারধর: ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ইসমাইল ইবনে ওয়ালি তন্ময় (রসায়ন ৩৯) ও শাহাদাত হোসেন ( ইংরেজি ৪১ ) এর মালিকানাধীন ‘রিভারল্যান্ড ব্রডব্যান্ড সার্ভিস’ এর অফিসে গিয়ে চাঁদা দাবি করেন অস্ত্রধারী অভিষেক মন্ডলসহ ছাত্রলীগের তিন নেতা। দোকানি চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাদের কে মারধর করে ও অফিস ভাংচুর করে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় অন্য তিনজন অভিযুক্তরা হলেন শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তারেক হাসান, গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক নীলাদ্রী শেখর মজুমদার ও মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ কর্মী রবিউল ইসলাম। তারা সবাই শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের অনুসারী।

ছাত্রলীগ নেত্রীকে শারীরিক লাঞ্ছনা : ২০১৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি বিকেল পাঁচটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শাখা ছাত্রলীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম তন্বী তার স্বামী রাজিবের ( বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক) সাথে ফুল কিনছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল, অভিষেক মন্ডলসহ বেশ কয়েকজন গাড়ির ড্রাইভারকে মারধর করে। পরবর্তীতে তারা রাজিবকে লাঞ্ছিত করে। সে সময় তাদেরকে বাধা দিতে গেলে চঞ্চল ও মন্ডলরা তন্বীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সেখানে উপস্থিত থাকা ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেহেদী ইকবাল পুরো ঘটনাটি দেখেছেন। যার সত্যতা স্বীকার করে মেহেদী ইকবাল বলেন, ‘ঝামেলা দেখে আমি থামাতে আসি। ঝামেলার সময় তন্বির গায়ে তারা হাত তুলেছে।’ পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের মাধ্যমে উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ওই নেত্রী।

অভিযুক্ত হিসেবে তিনি দায়ী করেন- ছাত্রলীগ সম্পাদক এস এম আবু সুফিয়ান চঞ্চল, সাংগঠনিক সম্পাদক অভিষেক মন্ডল, গ্রন্থণা ও প্রকাশনা সম্পাদক নিলাদ্রী শেখর মজুমদার, ছাত্রলীগ কর্মী নেজাম উদ্দীন নিলয় ও সাজুকে।

আজকের ঘটনা: শনিবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০ টার দিকে সাইমুম ইসলাম শহীদ রফিক জব্বার হলের সামনে খাবারে দোকানে নাস্তা করতে যান। এ সময় পাশের সিটে বসা ছিলেন অভিষেক মন্ডল। নাস্তারত অবস্থায় সাইমুমের মুঠোফোন একটি কল আসে। সে কলটি রিসিভ করে কথা বলতে থাকলে অভিষেক মন্ডল ধমক দিয়ে তাকে আস্তে কথা বলতে বলেন ও সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। পরে সাইমুম স্থান ত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কলার ধরে দোকানের বাহিরে বের করে লাকড়ি দিয়ে মারধর করে অভিষেক মন্ডল।

'দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর' এর অন্যতম কর্মী ও সংগঠক এবং জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম সাইমুম। ছাত্রলীগ নেতা কর্তৃক আহত নুরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ তম ব্যাচের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ও আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের আবাসিক ছাত্র। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর এক আবেদনপত্রে শারীরিক লাঞ্চনার ঘটনায় দোষীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি চেয়ে বিচার দাবি করেন।