১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৮:৪১

ফ্রান্সে যে মুসলিম বিদ্বেষের জেরে স্কুলে হিজাব পরা নিষিদ্ধ হয়েছিল

  © সংগৃহীত

ফ্রান্সের সরকার ২০০৪ সালে সব সরকারি স্কুলে হিজাব এবং অন্যান্য ধর্মীয় পরিচয় বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে বহু মুসলিম মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বহু মুসলিম কিশোরীর শিক্ষাজীবনে নেমে আসে অন্ধকার। নানাভাবে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে মুসলিম নারীদের দৈনন্দিন জীবন।

ফরাসি সংসদে এই পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল সেসময় ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থী দল। তাদের যুক্তি ছিল স্কুলের ভেতর ধর্মকে আনা যাবে না। সংসদ স্কুল ছাত্রীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দেওয়ার পর মুসলিম ছাত্রীরা বলেছিল তাদের কাছে পড়ার বই আর হিজাব দুটোই তাদের পরিচয়ের অংশ। অনেক কিশোরী বলেছিল হিজাব তাদের শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাদের ব্যক্তিসত্ত্বার অংশ। স্কুলে ঢোকার পর তাকে সেটা খুলতে বাধ্য করা তার ব্যক্তিসত্ত্বার অপমান।

ফ্রান্সে ধর্মনিরপেক্ষতা

ফ্রান্সে গির্জা ও রাষ্ট্রকে পৃথক রাখার যে আইন ফরাসি ভাষায় 'লে-ল্যসিটে (laïcité)' নামে পরিচিত, সেটি প্রজাতন্ত্রটির ধর্মনিরপেক্ষতার মূল স্তম্ভ। দেশটির জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি। যে নীতির মূল ভিত্তি হল বিভিন্ন আচরণ ও ধর্মের স্বাধীনতা এবং বিশ্বাস যাই হোক না কেন আইনের সামনে সমতা।

পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক মুসলিমের বাস ফ্রান্সে। ফলে দেশটির ৫০ লাখ মুসলিম নাগরিককে ফ্রান্স তার সমাজের অংশ করে নিতে কতটা সক্ষম সেটাই ছিল দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ নীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ফ্রান্সে ১৯৮০র দশকের শেষ দিক থেকে মুসলিম নারীদের হিজাব পরা দেশটিতে একটা বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। কয়েকজন শিক্ষক শুরু করেছিলেন এই বিতর্ক।

ফ্রান্সের কাউন্সিল অফ স্টেট অর্থাৎ যে প্রশাসনিক পরিষদ আইনি বিষয়ে সরকারের উপদেষ্টার কাজ করে, তাদের মত ছিল স্কুলে মেয়েদের হিজাব পরা ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির পরিপন্থী।

বিদ্বেষের প্রকাশ

ফ্রান্সে ১৯৯০এর শেষ নাগাদ মুসলিমদের প্রতি মনোভাবে পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। মুসলিমদের পোশাক পরিচ্ছদ বা যা দিয়ে বাইরে থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে চিহ্ণিত করা যায়, তার প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ পেতে থাকে।

মুসলিম মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ

আফ্রিকার দেশ সেনেগাল থেকে ফ্রান্সে আসা মুসলিম নারী এনডেলা পে ৩০ বছরের এক মুসলিম মা- দুই কন্যাসন্তানের জননী। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, "আমি তাদের কথা ভাবছিলাম। মেয়েরা তখন বড় হচ্ছে, স্কুলে গেলে তারা হিজাব পরতে পারবে না! তাদের মনে কীধরনের প্রতিক্রিয়া হবে? আমি জানি না তারা বড় হয়ে কীভাবে জীবন গড়তে চাইবে? কিন্তু মা হিসাবে আমি চাইতাম তারা কী পরে স্কুলে যাবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তাদের থাকুক। হিজাব পরার কারণে কোন মেয়ের স্কুলে যাবার অধিকার রাষ্ট্র কেড়ে নিতে পারে না।

এনডেলা পে বলেন, "আমার মনে আছে- যখন আমরা বাজারে যাচ্ছি, আমার বড় মেয়ে একদিন বলল সে আমার মত হিজাব পরবে। শুনে ওর বাবা বলল - না না তোমাকে পরতে হবে না। আমার স্বামীর মনে হয়েছিল- মেয়েকে হিজাব পরালে লোকে বলবে- দেখ বাবা জোর করে মেয়েকে হিজাব পরিয়েছে।"

আন্দোলন ও প্রতিবাদ

এনডেলা তার মুসলিম বান্ধবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এই নিষেধাজ্ঞা যাতে তুলে নেওয়া হয় তার জন্য আন্দোলনের পথে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এই আইনের ওপর ভোটগ্রহণ ঠেকানোর জন্য করণীয় কী সে বিষয়ে বান্ধবীদের পরামর্শ চাইলেন। আমার একজন বান্ধবী বললেন এই আইন বন্ধ করার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে সে রাতেই একটা বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। আমি চাইলে তাতে যোগ দিতে পারি। ঐ বৈঠকেই এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আমরা একটা জোট গড়ে তুললাম। গোষ্ঠীর নাম আমরা দিলাম সি-ই-পি-টি - যার অর্থ সবার জন্য স্কুল।"

তাদের দলে ছিলেন শিক্ষিকা, নারীবাদী, এমনকি কিছু স্কুল ছাত্রীও, যারা হিজাব পরতো। শুধু মুসলিমরাই নন, অনেক অমুসলিম শিক্ষিকা, সুপরিচিত অমুসলিম নারী আন্দোলনকারী প্রথম থেকেই আন্দোলনে যোগ দিলেন।

এনডেলা বলেন, আমি বলব জোটে মুসলিমদের থেকে অমুসলিমদের সংখ্যাই বেশি ছিল।

আন্দোলনে অংশ নেয়া বিক্ষোভকারীরা অনেকে বললেন তারা এই আইনের সাথে একমত নন, কেউ বললেন তারা ক্ষুব্ধ কারণ এটা বিভেদের আইন। কেউ মত দিলেন এটা শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি নয়, এই আইন পুরো ফরাসি সমাজের জন্য বিপদজনক।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বললেন এই আইন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে ফরাসি সমাজের অংশ করে নেওয়ার বদলে তাদের দূরে ঠেলে দেবে, তারা নিজেদের একটা বলয় গড়ে তুলবে এবং তৈরি হবে আরও বেশি বিভেদ।

আইন পাস

ফ্রান্সে বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ সত্ত্বেও ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফরাসি এমপিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে এই আইন পাস হয়ে যায়। যেদিন সংসদে এই আইন আনা হয়, তখনও এনডেলা ও তার সহযোগী প্রতিবাদকারীরা সংসদ ভবনের বাইরে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছিলেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা