০৯ জুলাই ২০১৯, ১৩:৪২

পদ্মা সেতুর জন্য মাথা নয়, মুক্তিপণের জন্যই বাচ্চা চুরি

বৃহত্তর নোয়াখালীতে দিন দিন ছেলে ধরা (আঞ্চলিক ভাষায় পোলা চোর) আতঙ্ক বাড়ছে। গত এক সপ্তাহ যাবত জেলার পাড়া-মহল্লা ও বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে এই আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, ছেলে ধরা চোরেরা ধরা পড়লে এমন ভাব দেখায় যে, এরা পাগল কিংবা বোবা, আসলে এরাই প্রকৃত ছেলে ধরা চোর। অন্যদিকে আইন শৃংখলা বাহিনীর লোকজন বলছে ছেলে ধরা চোরেরা অধিকাংশই মানসিক ভারসাম্যহীন দেখা যায়।

গতকাল ০৮/০৭/২০১৯ইং বিকেল ৫.৩০ মিনিটের সময় নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানাধীন ০৫ নং ছয়ানী ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর গ্রামের রতার বাড়ি জামে মসজিদের পাশে একটি বাচ্চা ছেলেকে একজন অপরিচিতা মহিলা অপহরণ করার সময় স্থানীয় এক যুবক ছেলে সহকারে ওই মহিলাকে হাতেনাতে ধরে পেলেন।

মহিলার পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে তার বাড়ি কক্সবাজার বলে পরিচয় দেয়। এরপর তাকে ইউনিয়ন পরিষদে (বোর্ড অফিস) চেয়ারম্যান হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পরে স্বীকার করে যে এই পর্যন্ত সে নিজে ৩টা বাচ্চা শিশু চুরি করেছে এবং তার মত ছেলে-মেয়ে ধরার জন্য বেশ কয়েকটি গ্রুপ সারাদেশে বিস্তার লাভ করছে। সর্বশেষ রাত ১০টায় মহিলাটিকে বেগমগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

এর আগে লক্ষ্মীপুর গত শনিবার (৬ জুলাই) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ২নং দক্ষিণ হামছাদি ইউনিয়নের পশ্চিম গোপিনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মিথিলা (৬)কে অজ্ঞাত পরিচয়হীন এক যুবক স্কুল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়ে জনতার হাতে ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়। পরবর্তীতে জনতা ও স্কুল ছাত্রীর বাবা মাসুদ আলম মিলে উক্ত (ছেলে ধরা) মেয়ে-ধরাকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

এই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে ২নং ওয়ার্ডে গত শুক্রবার (৫ জুলাই) সকালে এক ছেলে ধরা চোরকে হাতেনাতে ধরলেও স্থানীয়রা পরে তাকে ছেড়ে দেয়।

উপরোক্ত বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মহাদেব পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফ হোসেন বাচ্চু বলেন, ইদানিং কালে ছেলে ধরার হিড়িক লক্ষ্মীপুর জেলায় শুনা যাচ্ছে। যার কারনে অভিভাবকরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছে। এজন্য অনেক অভিভাবকেরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজকর্ম ফেলে বাচ্চাদের সাথে স্কুলে এসে বসে থাকছেন।

এই ব্যাপারে নোয়াখালী বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, এক দল লোক মুক্তিপণ আদায় করার জন্য, ছেলে মেয়েদের নিয়ে যাচ্ছে। এদেরকে ধরতে পারলে প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে প্রশাসনের হস্থক্ষেপ কামনা করছি।

এদিকে, কিছু কুচক্র মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে পদ্মা সেতুর কাজ সম্পূর্ণ করতে বাচ্চাদের অনেক গুলো মাথা লাগবে তাই সরকারের পক্ষ থেকে এমন কাজ করা হচ্ছে।

এ বিষয় সম্পর্কে প্রকল্পের কাজে সংশ্লিষ্ট এক বাংলাদেশি প্রকৌশলী বলেন, “নদীতে পশুর রক্ত ঢেলে ভিত্তি স্থাপন কাজের উদ্বোধন করার রীতি চালু আছে চীনাদের। কারন তাদের বিশ্বাস, বড় কাজের শুরুতে পশু উৎসর্গের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, এড়ানো যায় বড় দুর্ঘটনা। এটা চীনাদের প্রচলিত রীতি ও বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করেন বড় কোন কাজের শুরুতে এই পশু উৎসর্গ করলে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। আর এটি কাজে দুর্ঘটনা রোধ করে সফলতা নিয়ে আসবে। তবে মানুষের রক্ত বা মাথা লাগবে এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং মিথ্যা। পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “এটা চীনাদের নিজস্ব রীতি।”

এই বিষয় নোয়াখালী জেলার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্টেট মোঃ রোকনুজ্জামান খান বলেন, পদ্মা সেতুর জন্য কোন বাচ্চার মাথার প্রয়োজন নেই, বিশ্বে আরও বড় বড় সেতু নির্মাণ করতেও মানুষের মাথার প্রয়োজন হয়নি। তবে আমরা খবর পেয়েছে বাচ্চাদের চুরি করে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে একদল কুচক্রি মহল। এই ব্যাপারে আমরা সর্তক আছি। আর কারো বাচ্চা নিয়ে গেলে সাথে সাথে থানায় অভিযোগ করার কথা বলেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষ আতংকিত হয়ে আছে, এই ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এবং বাচ্চা ছুরির ব্যাপারে আইনের যথাযথ কার্যকর করলে এই ধরনের ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করে সাধারণ জনগণ।