১৬ ডিসেম্বর ২০২২, ২২:১৪

টানা অনশন-আন্দোলনে কলকাতা মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীরা

  © সংগৃহীত

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে টানা ৯ দিন ধরে টানা অনশন-আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের একদল পড়ুয়া। এই সমস্যার সমাধানে আজ শুক্রবার কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্দোলনরতদের একটি বৈঠক ডাকা হয়েছিল। কিন্তু দু’পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের জেরে ভেস্তে যায় সেই বৈঠক। 

বৈঠকের মাঝপথেই মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ স্বাস্থ্য ভবনের উদ্দেশে বেরিয়ে যান। অপরদিকে আজ অনশনে বসা এক পড়ুয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন। কৌশিক বড়ুয়া নামের ওই পড়ুয়া বর্তমানে চিকিৎসাধীন। আগেও ঋতম মুখোপাধ্যায় নামের এক পড়ুয়া অনশনে বসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এখনও তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

২০১৬ সালের পর থেকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। মেডিকেল কর্তৃপক্ষ আগে জানিয়েছিলেন, ২২ ডিসেম্বরের যে নির্বাচন তার নিয়মকানুন নিয়ে বিস্তারিত ভাবে জানানো হবে। কিন্তু তা-ও হয়নি। পরে এ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন পড়ুয়ারা। মেডিকেলের প্রশাসনিক ব্লকে ঘেরাও করা হয় অধ্যক্ষসহ কয়েকজন বিভাগীয় প্রধানকে। বিক্ষোভের জেরে রোগীরা বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।

শুক্রবার পড়ুয়াদের অনশন ৯ম দিনে পড়ল। ছাত্র সংসদে নির্বাচনের দাবিতে, আন্দোলনরত পড়়ুয়াদের পাশাপাশি গত বৃহস্পতিবার প্রতীকী অনশনে বসেন তাদের অভিভাবকরাও। কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, পানীয় জল, হোস্টেলসহ ছাত্রদের নানা খুঁটিনাটি প্রয়োজন পূরণের জন্য নির্বাচিত ছাত্র সংসদ থাকা প্রয়োজন।

গত বুধবার পড়ুয়াদের পক্ষ থেকে একটি সাংবাদিক বৈঠক করা হয়েছিল। সেখানে ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়ার জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করা হয়। সরকার মেডিকেল কলেজকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই নানা অজুহাতে নির্বাচনে পিছিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন পড়ুয়ারা। এর পাশাপাশি বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের তরফে শনিবার একটি নাগরিক কনভেনশনেরও ডাক দেওয়া হয়েছে।

কী দাবিতে পড়ুয়াদের আন্দোলন?
বিক্ষোভকারীদের দাবি, শেষবার ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৬ সালে। এর পরে আর ছাত্র নির্বাচন হয়নি। তবে আগামী ২২ ডিসেম্বর প্রথমে ছাত্র সংসদের নির্বাচনের দিন ঘোষণা হয়েছিল। তার আগে নির্বাচন সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে যোগ দেন পড়ুয়ারা। কিন্তু তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় এখন ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তা অন্যান্য পড়ুয়াদেরও জানিয়ে দিতে বলা হয়।

কবে থেকে শুরু হয়েছে আন্দোলন?
মেডিকেলের পড়ুয়াদের আন্দোলন শুরু হয়েছে গত ৫ ডিসেম্বর সোমবার থেকে। কোনও কারণ ছাড়ায় নির্বাচন না করার কথা জানানোর পরেই উত্তপ্ত হতে শুরু করে পরিস্থিতি। ওইদিন সন্ধ্যা থেকে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল বিশ্বাসের ঘরের সামনে বসে বিক্ষোভ-ঘেরাও শুরু করেন আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা। ঘেরাওয়ে আটকে পড়েন কলকাতা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, বিভাগীয় প্রধানসহ ২১ জন কর্মকর্তা। ফলে ব্যাপক সমস্যায় পড়েন রোগীরা। সেন্ট্রাল ল্যাব খুললেও রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয় রোগীর পরিজনদের।অবশেষে বুধবার মধ্যরাতে প্রায় ৩৪ ঘণ্টা পর ঘেরাওমুক্ত হন আধিকারিকরা। এদিকে, চিকিৎসা পরিষেবা ব্যহত নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট একটি মামলাও দায়ের হয়। বর্তমানে মামলাটি চলছে।

অনশন শুরু পড়ুয়াদের
বুধবার রাতে আধিকারিকদের ঘেরা মুক্ত করে দেওয়ার পর পড়ুয়ারা বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কর্তৃপক্ষ কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় ৫ জন ছাত্র মিলে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। পরের দিন স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করে অনশন তুলে নেওয়ার আবেদন জানান। তবে পড়ুয়ারা নিজেদের দাবিতেই অনড় থাকেন। এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের অনুরোধ কাজ হয়নি।

এদিকে, গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ভবনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। পড়ুয়াদের আশা ছিল, সেই বৈঠকে হয়তো সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসবে। কিন্তু, শেষমেশ বৈঠক হয়নি। ফলে জট অব্যাহত থাকে মেডিকেলে। এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়াতে প্রতীকী অনশন করেন অভিভাবকরা। পাশাপাশি নির্বাচনের দাবিতে মিছিল করেন পড়ুয়ারা। যোগ দেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী, আলিয়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা।

কী বক্তব্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য ভবনের?
স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে কলকাতা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের পক্ষে। কলকাতা মেডিকেলের অধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল বিশ্বাস জানান, ছাত্রদের দাবি নিয়ে তিনি স্বাস্থ্য ভবনকে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, সবকিছু কলেজ কাউন্সিলের হাতে নেই। সিদ্ধান্ত উপরমহল থেকে আসবে। আশা রাখছি, সুরাহা হবে। তার দাবি, নির্বাচন হবে না, এমনটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলেননি। যদিও পড়ুয়াদের দাবি, নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে হবে। ফলে কবে তা ঘোষণা হবে? তাই নিয়ে থাকছে প্রশ্ন।