তারুণ্যের মনস্তত্ত্বে একটি দার্শনিক ও আইনি পর্যালোচনা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র-জনতার জুলাই-আগস্ট বিপ্লব কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তির’ নবায়ন। রাষ্ট্র মেরামতের এই যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে তরুণদের সম্মুখসারিতে অবস্থান অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে, এই নবজাগরণের পথে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত বাধা প্রকট হয়ে উঠছে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘জনতুষ্টিবাদ’ বা পপুলিজম। একটি আবেগনির্ভর সমাজ যখন দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের চেয়ে তাৎক্ষণিক হাততালিকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে পচন ধরতে শুরু করে।
জনতুষ্টিবাদের মূল ভিত্তি হলো কাঠামোগত সমাধানের পরিবর্তে সস্তা ও তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দেওয়া। দার্শনিক জঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জেনারেল উইলের একটি অতি-সরলীকৃত ও বিকৃত রূপ হলো এই জনতুষ্টিবাদ, যেখানে মনে করা হয় জনগণের সাময়িক আবেগ বা ক্ষোভই চূড়ান্ত ন্যায়বিচার। কিন্তু আইনবিজ্ঞানের গভীরতর পাঠ আমাদের শেখায় যে, ন্যায়বিচার কোনো তাৎক্ষণিক আবেগের বিষয় নয়। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে এই জনতুষ্টিবাদ এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। সস্তা জনপ্রিয়তা বা ‘হিরো’ হওয়ার বাসনায় রাজনীতির গুণগত মান এবং নৈতিকতা আজ চরম আপসের সম্মুখীন। নব্বইয়ের দশকের রাজনীতিকদের মাঠে নেমে কৃষকদের সঙ্গে কোলাকুলির যে লোকদেখানো চর্চা ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা আধুনিক ‘ভাইরাল রাজনীতিতে’ রূপান্তরিত হয়েছে, যা মূলত একটি আদর্শিক শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
দার্শনিক টমাস হবস তাঁর বিখ্যাত ‘লেভিয়াথান’ গ্রন্থে সতর্ক করেছিলেন যে, একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো না থাকলে সমাজ ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ ফিরে যায়, যা অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। রাস্তার পিচ তুলে ফেলা বা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাৎক্ষণিক বিচারকের ভূমিকায় অবর্ণ হওয়ার যে চর্চা বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের একাংশের মাঝে দেখা যাচ্ছে, তা মূলত সমাজকে সেই বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত হলো বলপ্রয়োগ এবং আইনি বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ‘বৈধ একচেটিয়া অধিকার’। কোনো রাজনৈতিক কর্মী যখন স্বপ্রণোদিত হয়ে রাজপথে বা অফিসে বিচারকের ভূমিকা পালন করেন, তখন তিনি কেবল বিদ্যমান আইনি কাঠামোরই অবমাননা করেন না, বরং রাষ্ট্রের আইনি বৈধতাকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন। এটি আইনের শাসনের মূলনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার’ পরিপন্থী।
জনতুষ্টির রাজনীতি কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক পতন ডেকে আনে, তার বড় উদাহরণ হলো ভারতের ‘আম আদমি পার্টি’। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও, দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অভাবে এবং জনতুষ্টির মোহে তারা আজ আদর্শিক সংকটে জর্জরিত। আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও এই জনতুষ্টিবাদের নেতিবাচক প্রভাব মাঝে মাঝে ফুটে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্তের সামান্য সমালোচনার মুখেই সরকারের পিছু হটা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনিক যৌক্তিকতা বা সাংবিধানিক দৃঢ়তার চেয়ে হঠকারী জনমত বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল একে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে। ইন্টারনেটের ক্ষোভ দ্বারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ নিয়ন্ত্রিত হলে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশৃঙ্খল কাঠামো নির্মাণ বারবার হোঁচট খেতে বাধ্য।
বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হয়, তবে একমাত্র পথ হলো দার্শনিক মঁতেস্কুর ‘ক্ষমতার পৃথকীকরণ’ নীতির কঠোর বাস্তবায়ন। এই নীতির মূল কথা হলো, যিনি অভিযোগকারী তিনি কখনোই বিচারক হতে পারবেন না। একজন রাজনৈতিক কর্মী বা ছাত্রনেতা যখন নিজেই বিচারকের ভূমিকা নিয়ে তাৎক্ষণিক দণ্ড বা সমাধান দিতে চান, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জবাবদিহিমূলক সক্ষমতা কখনোই তৈরি হয় না। টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কোনো রাষ্ট্রীয় কাজে ত্রুটি দেখা দিলে তা নিরসনের আইনি পন্থা হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো এবং আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে তাদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। সরাসরি নিজেই ‘অ্যাকশন’ নেওয়াতে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের টেকসই কাঠামো দাঁড়ায় না।
আবেগ এবং সাময়িক জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক প্রকার রাজনৈতিক হঠকারিতা। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আবেগ দিয়ে নয়, বরং আইনের শাসন এবং সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে, জনতুষ্টিবাদের রঙিন ফাঁদ মূলত একটি মরীচিকা। আজ আমরা যা করছি, তা যদি স্রেফ প্রচারসর্বস্ব হয় এবং প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। সস্তা জনপ্রিয়তার এই চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদী জনস্বার্থমূলক রাজনীতির চর্চা করতে হবে। কারণ ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি বড়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অফ দ্য ওয়েস্ট অফ ইংল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ছাত্রদল নেতা।