‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একই পদের সব শিক্ষকের বেতন কি সমান হওয়া উচিত?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই পদের সব শিক্ষকের বেতন কি সমান হওয়া উচিত? অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের একই গ্রেডের সকল অধ্যাপকের বেতন কি সমান হওয়া উচিত? প্রথম দর্শনে হ্যাঁ উত্তর ন্যায্যতার পক্ষে যায়। কারণ পদমর্যাদা, যোগ্যতা ও নিয়োগের মানদণ্ড তো সবার জন্য এক। তাহলে কেন নয়? কিন্তু বাস্তব অ্যাকাডেমিক জীবনে আমরা দেখি—সবার অবদান কোথাও কখনো এক নয়।
বুধবার (১ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি আরও বলেন, কেউ নিয়মিত গবেষণা করেন এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা করান, গ্রান্ট আনেন, আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন গড়ে তোলেন। আবার আরেকটা গ্রুপ আছে যারা প্রমোশন পাওয়ার পর ন্যূনতম দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেন। এমনকি এমনও অনেকে আছেন যারা অবসরে চলে যাওয়ার মত জীবন যাপন করেন। তখন প্রশ্নটি আর কেবল ন্যায্যতার থাকে না—থাকে উৎকর্ষ, দায়বদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রাণশক্তির।
তখন সবাইকে সমান বেতন দেওয়া, সমান সম্মান দেওয়া বরং একটা ক্রাইম উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেই সমাজে যোগ্যরা যোগ্য সম্মান ও ইন্সেন্টিভ পায় না সেই সমাজে যোগ্য মানুষ তৈরী হয় না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে বরং গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক কাজ বাদ দিয়ে রাজনীতি আর ধান্দাবাজি করলে সুযোগ ও সম্মান দুটোই বেশি হয়।
কামরুল হাসান মামুন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে দিন দিন মেধাবীদের হারাচ্ছে এর একটি অন্যতম কারণ মেধাবীরা এখানে মূল্যায়িত হচ্ছে না। তাহলে এর সমাধান কী? এই দ্বন্দ্বের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান হচ্ছে: সবার সমান বেসিক বেতন থাকবে। তার উপর যার যার অবদানের ভিত্তিতে ইনসেন্টিভ। এটি কোনো তাত্ত্বিক প্রস্তাব নয়; বিশ্বের গবেষণা-নির্ভর বহু দেশ এই কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, প্রথমেই একটু বলে নেই কেন সমান বেসিক বেতন প্রয়োজন? সমান বেসিক বেতন শিক্ষকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পেশাগত স্থিতি নিশ্চিত করে। প্রথমত এতে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা কমে। এটি একটি বার্তা দেয়—‘আপনি এই প্রতিষ্ঠানের একজন স্বীকৃত সদস্য; আপনার মৌলিক অবদানকে আমরা সম্মান করি।’
তিনি আরও বলেন, এতে সহকর্মিতার পরিবেশ তৈরি হয়, হীনমন্যতা বা অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা কমে। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে সমস্যা তৈরি হয়। কারণ বেতন যদি অবদানের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে, তবে ধীরে ধীরে একটি নীরব বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়: আপনি যত ভালো কাজই করুন আর যত কমই করুন তাতে যদি আপনার প্রাপ্য একই থাকে। এখান থেকেই শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা।
কেন ইনসেন্টিভ প্রয়োজন? গবেষণা, উদ্ভাবন, মেন্টরশিপ—এসব অতিরিক্ত শ্রম, সময় ও মেধা দাবি করে উল্লেখ করে কামরুল হাসান মামুন বলেন, যদি এগুলোর জন্য দৃশ্যমান স্বীকৃতি না থাকে, তবে সেরা মানুষগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েন, নিরুৎসাহিত হন, বা অন্যত্র চলে যান। ইনসেন্টিভ সেই অতিরিক্ত অবদানকে দৃশ্যমান মূল্য দেয়। উদাহরণ হিসাবে চীনের দিকে তাকান। চীনতো একটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোয় গড়ে উঠা একটি দেশ।
‘তারপরও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেস স্যালারি থাকলেও গবেষণা প্রকাশনা, গ্রান্ট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর বড় অঙ্কের পারফরম্যান্স বোনাস থাকে। যার মাধ্যমে বিশাল অংকের বেতন হতে পারে। আবার নির্দিষ্ট সময়ের লক্ষ্য পূরণ না হলে ইনসেন্টিভ কমে যায়। এর ফলে চীনে গবেষণায় বিস্ফোরণমূলক উত্থান ঘটেছে’, যোগ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: জবির ন্যূনতম সম্পদও যদি কারও দখলে থাকে, ফিরিয়ে আনব
কামরুল হাসান মামুন বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা। এখানেও বেসিক বেতন সবার সমান। কিন্তু প্রকাশনা, কারখানা-শিল্প-সহযোগিতার মাধ্যমে গ্রান্ট আনা ইত্যাদির উপর বেতন বৃদ্ধি নির্ভরশীল। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি হয়েছে। জাপানেও ঐতিহ্যগতভাবে সমতা বজায় রেখেও গবেষণা-নেতৃত্ব, প্রকল্প-অনুদান ও আন্তর্জাতিক রেঙ্কিং এর চাপে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন যুক্ত করা হয়েছে।
মর্যাদা অটুট, উৎকর্ষ দৃশ্যমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সমান স্কেল প্লাস আলাদা প্রণোদনা চালু হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্কেলে বেসিক বেতন এক হলেও গবেষণা প্রকল্প, কনসালটেন্সি, শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত ইত্যাদির মাধ্যমে সক্রিয় গবেষকরা অতিরিক্ত সুবিধা পান।
কামরুল হাসান মামুনের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়; এটি জ্ঞান সৃষ্টির কারখানা। উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে বেতন কেবল জীবিকা নয়; এটি একটি দর্শন। সেই দর্শন যদি বলে—‘আপনার অবদান দৃশ্যমান, মূল্যবান, এবং স্বীকৃত’—তবেই প্রতিষ্ঠান প্রাণ পায়।