স্বাধীনতার ঘোষণা: রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব কেবল একটি ভূখণ্ডগত বিচ্ছেদের ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে একটি জাতির রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ, সশস্ত্র প্রতিরোধ, রাষ্ট্রগঠন, বৈধতা-সংকট এবং পরবর্তী প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে তাই কেবল একটি সামরিক বিজয় হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না; বরং এটি ছিল একটি nation-in-arms, একটি liberation struggle এবং শেষপর্যন্ত একটি state formation process। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি একদিকে ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সামরিক কমান্ডার, অন্যদিকে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পুনর্গঠন, জাতীয় পরিচয়ের পুনর্বিন্যাস, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তনের অন্যতম রূপকার। প্রকৃতপক্ষে, সমকালীন ইতিহাসের বিচারে তিনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ছিলেন অনন্য ও মহান, যার দূরদর্শী নেতৃত্বে আধুনিক বাংলাদেশের মজবুত ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় কোনো রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন মুখ্য হয়ে ওঠে: কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কোন বৈধতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং কী ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো নির্মিত হচ্ছে। এই তিনটি প্রশ্নের প্রতিটিতেই জিয়াউর রহমানের প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। বিশেষত ঐতিহাসিক বয়ানে তিনি এমন এক নেতা, যিনি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিপর্যস্ত অবস্থায় সামরিক প্রতিরোধকে জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেন এবং পরে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে একটি স্বতন্ত্র মতাদর্শিক রূপরেখা প্রদান করেন। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর রাজনৈতিক শৃঙ্খলা-বিষয়ক আলোচনায় বলেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর। এই তাত্ত্বিক আলোকে জিয়াউর রহমানকে কেবল ব্যক্তিনির্ভর বীরত্বের প্রতীক হিসেবে নয়, বরং সংকটের ভেতর থেকে authority formation, political order এবং state consolidation-এর এক কার্যকর এজেন্ট হিসেবে দেখা যায়। তাঁর ভূমিকা ছিল সেই অর্থে দ্বিমাত্রিক—যুদ্ধকালে mobilizational leadership, আর যুদ্ধোত্তর সময়ে institutional leadership।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের উৎপত্তি বুঝতে হলে পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর দীর্ঘদিনের বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক শোষণ এবং গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট অস্বীকারের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় স্পষ্ট ছিল, কিন্তু সেই রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সময়ক্ষেপণ, চক্রান্ত এবং শেষে সামরিক অভিযান বেছে নেয়। এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় crisis of legitimacy বলা যায়। যখন একটি রাষ্ট্র তারই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকারকে অস্বীকার করে, তখন সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ছিল মূলত একটি repressive state apparatus-এর নগ্ন প্রকাশ। এটি ছিল শুধু সামরিক অভিযান নয়; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত state terror, যা গণহত্যা, ভয়প্রদর্শন, সাংস্কৃতিক ধ্বংস এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার কৌশল নিয়ে পরিচালিত হয়। এই ধরনের সহিংসতা সাধারণত উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র-সংকটে দেখা যায়, যেখানে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শত্রুতে পরিণত করে।
এই পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্টি হয় এক ধরনের political vacuum । কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি অংশ গ্রেপ্তার, অন্য অংশ ছত্রভঙ্গ বা আত্মগোপনে; সাধারণ মানুষ হতভম্ব; বাঙালি সামরিক ও আধাসামরিক সদস্যরা অনিশ্চয়তায়। এই শূন্যতার মুহূর্তেই আবির্ভূত হন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান, যিনি পরিস্থিতিকে নিছক সামরিক বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ না রেখে সেটিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা নেন। এখানেই তাঁর ভূমিকা হয়ে ওঠে emergent leadership-এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। উইনস্টন চার্চিলের একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক: “In war, resolution.” যুদ্ধের সূচনালগ্নে যে দৃঢ়তা, তা-ই জাতির মনোবল গঠন করে। জিয়াউর রহমানের প্রাথমিক ভূমিকা এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি শুধু অস্ত্র হাতে নেননি, বরং মানসিকভাবে একটি পরাজিতপ্রায় জাতিকে প্রতিরোধের ভাষা দিয়েছেন।
স্বাধীনতার ঘোষণার প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মীমাংসিত বিষয়। একটি বিষয় স্পষ্ট: যুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে জনমানসে প্রতিরোধের ভাষা, লক্ষ্য এবং প্রতীক নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে বলা হয় symbolic legitimation of struggle। অর্থাৎ, সশস্ত্র লড়াইকে একটি বৈধ, নৈতিক ও জনগণ-সমর্থিত সংগ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা সেই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কাজটিই করেছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। এই ঘোষণা ছিল সংকটমুহূর্তে command communication এবং mass mobilization-এর এক অসাধারণ উদাহরণ। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কোনো জাতি তখনই সংগঠিত হতে পারে, যখন একটি স্পষ্ট বার্তা তাকে জানিয়ে দেয়—সংগ্রাম শুরু হয়েছে, নেতৃত্ব আছে, লক্ষ্য নির্ধারিত, এবং আত্মসমর্পণ নয়, প্রতিরোধই একমাত্র পথ। জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে এই অর্থে performative political act বলা যায়; কারণ এটি শুধু তথ্য দেয়নি, বাস্তবতা নির্মাণও করেছে। একটি জাতিকে যুদ্ধরত জাতিতে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে প্রতীকী ঘোষণার শক্তি অপরিসীম। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতিকে “imagined community” বলেছেন।
তাঁর ধারণা অনুসারে, জাতির সদস্যরা একে অপরকে না চিনলেও তারা একটি সামষ্টিক কল্পনার ভেতর নিজেদের যুক্ত বলে ভাবতে শেখে। ১৯৭১-এর মার্চের শেষ সপ্তাহে সেই কল্পিত জাতিসত্তাকে দৃশ্যমান ও সক্রিয় করে তুলতে স্বাধীনতার ঘোষণার মতো প্রতীকী ভাষণের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে সকলে psychological turning point বলে মনে করেন। এই প্রসঙ্গে ফরাসি চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনাঁর “A nation is a daily plebiscite” উক্তিটি নতুন অর্থ পায়। কারণ যুদ্ধের মুহূর্তে জাতির প্রতিটি সদস্য দৈনন্দিনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—সে কি অধীনতার পক্ষে, না স্বাধীনতার পক্ষে। জিয়ার ঘোষণায় সেই প্রতিদিনের রাজনৈতিক সম্মতি একটি সশস্ত্র প্রতিজ্ঞায় পরিণত হয়।
জিয়াউর রহমানের যুদ্ধকালীন ভূমিকার একটি মুখ্য দিক হলো সামরিক বিদ্রোহকে কৌশলগত প্রতিরোধে রূপান্তর। তিনি যে শুধু বিদ্রোহ করেছিলেন তা নয়; তিনি পরিস্থিতিকে সামরিকভাবে পাঠ করেছিলেন, বাহিনীকে পুনর্গঠিত করেছিলেন এবং প্রতিরোধের অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। এর ফলে তিনি নিছক এক বিদ্রোহী অফিসার থেকে field commander-এ উত্তীর্ণ হন। রাষ্ট্র ও যুদ্ধতত্ত্বে ক্লজভিৎজ বলেছিলেন, যুদ্ধ হলো রাজনীতির অন্য উপায়ে সম্প্রসারণ। জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এই সূত্রে বিচার করলে বোঝা যায়, তাঁর সামরিক কৌশল ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বৃহত্তর জাতীয় মুক্তির রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তা পরিচালিত হয়েছিল। তাঁর যুদ্ধনেতৃত্বে ছিল strategic adaptation, operational flexibility এবং combat morale management । চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা অন্তত আংশিকভাবে ব্যাহত করেন। পরে সেক্টরভিত্তিক রণকৌশল, সীমান্ত অতিক্রম করে পুনর্গঠন এবং নিয়মিত বাহিনী গঠনে তাঁর ভূমিকা প্রমাণ করে যে তিনি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের নায়ক ছিলেন না; তিনি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধকৌশলেরও অংশ ছিলেন। সামরিক ইতিহাসের ভাষায় এটি transition from spontaneous rebellion to organized military resistance । সান জু বলেছিলেন, “Strategy without tactics is the slowest route to victory; tactics without strategy is the noise before defeat.” জিয়াউর রহমানের যুদ্ধপর্বের মূল্যায়নে এই উক্তিটি যথার্থ। কারণ তিনি কেবল শত্রুকে আঘাত করেননি, বরং যুদ্ধকে সংগঠিত করেছেন—এই সংগঠনের ভেতরেই তাঁর স্বতন্ত্রতা।
মুক্তিযুদ্ধের সামরিক পর্বে জিয়াউর রহমানের নাম সবচেয়ে আলোচিত হয় জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একাধারে গেরিলা যুদ্ধ, সীমিত প্রচলিত যুদ্ধ এবং সীমান্ত-সমর্থিত আঞ্চলিক সামরিক অভিযানের সমন্বয়। এই প্রেক্ষাপটে জেড ফোর্সকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামরিক কৌশলের ভাষায় hybrid warfare formation বলা যায়। এখানে ছিল নিয়মিত ব্রিগেডের শৃঙ্খলা, আবার গেরিলা-ধরনের গতিশীলতা; ছিল আক্রমণাত্মক রণনীতি, আবার ভূ-প্রকৃতিনির্ভর অভিযোজনও। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন এই ফোর্স পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর শুধু সামরিক চাপ সৃষ্টি করেনি; বরং মুক্তিবাহিনীর ভেতরে conventional capability-এর ধারণাও প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল আরও বড়। কারণ একটি মুক্তিযুদ্ধ যদি কেবল ছিটেফোঁটা হামলায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আন্তর্জাতিক মহলে তা সহজে organized struggle for statehood হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। কিন্তু নিয়মিত বাহিনী, সেক্টর কমান্ড, ব্রিগেড রচনা—এই উপাদানগুলো সংগ্রামটিকে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে শক্তিশালী করে। এখানে ম্যাক্স ওয়েবারের রাষ্ট্র-সংজ্ঞা স্মরণযোগ্য। ওয়েবার রাষ্ট্রকে বলেছিলেন সেই প্রতিষ্ঠান, যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার দাবি করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জেড ফোর্সের মতো গঠন সেই দাবির পূর্বাভাস দেয়। অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির নৈতিক ও সাংগঠনিক ভ্রূণ-রূপ সেখানে উপস্থিত ছিল। ছাতক, কানাইঘাট, সিলেট ও অন্যান্য এলাকায় তাঁদের অভিযান পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে। এটি ছিল attrition strategy-র সঙ্গে territorial disruption-এর সমন্বয়। যুদ্ধের এমন পর্যায়ে শত্রুর যোগাযোগ, রসদ, চলাচল এবং মনস্তত্ত্ব—সবই আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমান এই বৃহত্তর কৌশলগত চিত্রটি বুঝতেন বলেই তাঁর ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
একাত্তরে রৌমারী মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে কেবল সামরিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করলে তার পূর্ণ গুরুত্ব ধরা পড়ে না। এটি ছিল স্বাধীনতার আগেই এক ধরনের proto-state space নির্মাণ, যেখানে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ধারণা পরীক্ষিত হয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কোনো মুক্তাঞ্চল যদি শুধু সামরিক ঘাঁটি হয়ে থাকে, তবে তার গুরুত্ব সীমিত; কিন্তু যদি সেখানে প্রশাসন, জননিরাপত্তা, যোগাযোগ, বেসামরিক সমন্বয় এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা রাষ্ট্রগঠনের পূর্বাভাস বহন করে। জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে রৌমারীতে যে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তাকে civil-military governance model বলা যেতে পারে। যুদ্ধের সময় জনগণের আস্থা অর্জন, স্থানীয় শৃঙ্খলা রক্ষা, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং প্রতিরোধকে টেকসই করা—এসবই রাষ্ট্রগঠনের অপরিহার্য উপাদান। এই অর্থে রৌমারী ছিল এক ধরনের laboratory of sovereignty । থমাস হবস তাঁর Leviathan-এ বলেছিলেন, নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে মানুষ শৃঙ্খলা ও সুরক্ষার জন্য কর্তৃত্ব কামনা করে। যুদ্ধকালে মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা সেই মানবিক ও রাজনৈতিক চাহিদার প্রতিফলন। জনগণ দেখে, প্রতিরোধ শুধু ধ্বংসের ভাষা নয়; এটি নির্মাণের ভাষাও। জিয়াউর রহমানকে তাই শুধু গেরিলা বা ব্রিগেড-কমান্ডার নয়, বরং এক প্রাথমিক state-maker in wartime হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক সংকটে পড়ে: অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দলীয় মেরুকরণ, সামরিক-রাজনৈতিক অবিশ্বাস এবং শাসনব্যবস্থার অনিশ্চয়তা। এ ধরনের অবস্থাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই post-war fragility বা post-conflict legitimacy crisis বলে থাকেন। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকে: প্রথমত, কীভাবে রাজনৈতিক বৈধতা টিকিয়ে রাখা হবে; দ্বিতীয়ত, কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা হবে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। তাঁর উত্থান ছিল নিছক ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল—এমন ব্যাখ্যা রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু তা অসম্পূর্ণ। বরং এটি ছিল একটি অস্থির রাষ্ট্রের ভেতরে শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব এবং বিকল্প রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার অনুসন্ধানের অংশ। এই অবস্থাকে authoritarian breakdown followed by controlled political reconstruction বলা যেতে পারে। এই পর্যায়ে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল একটি স্বতন্ত্র মতাদর্শিক পরিসর তৈরি করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, যুদ্ধের স্মৃতি যতই গৌরবময় হোক, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধুমাত্র আবেগ নয়, একটি কার্যকর রাজনৈতিক দর্শনও প্রয়োজন। সেখান থেকেই আসে “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”—যা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কেন্দ্রীয় ধারণা। এই আদর্শিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই পরিচালিত হয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একই পথের পরিব্রাজক।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তির একক কৃতিত্বের ফসল নয়; এটি অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার এক মহাকাব্য। তবে সেই বহুস্বর ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের পাতায় জিয়াউর রহমানের নাম একটি শক্তিশালী ও অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে চিরস্থায়ী। বিশেষ করে যারা স্বাধীনতার ঘোষণার মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব, যুদ্ধের সংগঠিত কাঠামো এবং আধুনিক রাষ্ট্রনির্মাণের বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন খোঁজেন, তাদের কাছে তিনি কেবল একটি নাম নন—বরং তিনি এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, এক জীবন্ত রাজনৈতিক স্মৃতি এবং জাতীয় অস্তিত্বের এক অপরিহার্য প্রশ্ন। এককথায়, সমকালীন বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান ছিলেন এক দূরদর্শী পথপ্রদর্শক, যাঁর রাষ্ট্রদর্শন আজও এ দেশের রাজনৈতিক ন্যারেটিভসে প্রাসঙ্গিক।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়