২৮ মার্চ ২০২৬, ১৮:৪৯

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক শিক্ষার ভূমিকা

এম এ মতিন  © টিডিসি সম্পাদিত

পরিপ্রেক্ষিত
বর্তমানে জাতিসংঘের উদ্যোগে স্বল্পোন্নত সদস্য দেশগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, খাদ্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে সচেতন, স্বনির্ভর ও টেকসই করার লক্ষ্যে ‘’সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস’ বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সংক্ষেপে (এস ডি জি) ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। এগুলোর বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০১৬ – ২০৩০ সাল। প্রদত্ত ১৭ লক্ষ্যের ৪র্থ লক্ষ্য হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা। বিদ্যমান লেখায় আমরা এস ডি জি’র আলোকে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে মানসম্পন্ন শিক্ষার বর্তমান অবস্থা, সমস্যা, সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবো এবং আমাদের দায়িত্ব ও করণীয় বিষয়াদি সুপারিশ করার চেষ্টা করবো। স্মর্তব্য, এস ডি জি’র পূর্বে প্রায় অনুরূপ বিষয়াবলি নিয়ে বিশ্বের পিছিয়ে পড়া দেশসমূহের অগ্রগতির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২০০০ সালে ৮টি লক্ষ্য নিয়ে (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (এমডিজি) অর্থাৎ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা শুরু করেছিল। এমডিজি’র সময়সীমা ছিল ২০০০-২০১৫। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘মিলেনিয়াম সামিটে’ একত্রিত হয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ঘোষণা’ প্রদান করেন। এ ঘোষণায় তারা পারস্পরিক অংশীদারিত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বের পিছিয়ে পড়া বিরাট জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও আনুষঙ্গিক বঞ্চনা অবসানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পরবর্তী সময়ে ৮টি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য এবং এসব লক্ষ্যের অধীনে ১৮টি সুস্পষ্ট টার্গেট চিহ্নিত করা হয়। সেই সময় ১৯১টি জাতিসংঘ সদস্য এবং কমপক্ষে ২২ টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজি অর্জনে সহায়তা করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।

এমডিজি’র নির্ধারিত আটটি লক্ষ্যমাত্রা ছিল
১। চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল করা
২। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন
৩। লিঙ্গ সমতা উন্নীত করা এবং নারীর ক্ষমতায়ন
৪। শিশু মৃত্যু হ্রাস করা
৫। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন
৬। এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া, এবং অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ
৭। পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা, এবং 
৮। উন্নয়নের জন্য একটি বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বিকাশ

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে বিশ্বের ও বাংলাদেশের অগ্রগতি কতটা সাধিত হয়েছে? 
উপরোল্লিখিত তালিকানুযায়ী এমডিজি’র দ্বিতীয় লক্ষ্য সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আয়োজন। এক্ষেত্রে তিনটি টার্গেট চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো, ২০১৫ সালের মধ্যে শতভাগ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয় টার্গেট হলো, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিশুরা যেন সবাই প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে তা নিশ্চিত করা। তৃতীয়টি হলো, বয়স্ক শিক্ষার হার শতভাগে উন্নীত করা। ১৯৯০-৯১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৬০.৫ শতাংশ হলেও ২০০৭ সালে তা ৯১.১ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে ২০১৫ সালের মধ্যে এ টার্গেটটি অর্জিত হয়েছে বলে বাংলাদেশের সরকারি তরফে দাবি করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় টার্গেট অর্জন সম্পর্কে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিশুরা, যারা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছে, তাদের হার ১৯৯০-৯১ সালে ছিল ৪০.৭, যা ২০০৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫২ শতাংশে। ফলে এ টার্গেটটি অর্জিত হয়নি বলে ধরে নেয়া হয়েছে। বয়স্ক শিক্ষার হার ২০০৭ সালের ৩৭.২ শতাংশ থেকে ২০১৫ সালে মাত্র ৬৯.৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যদিও অনেকের মতে বাস্তবে এ হার আরও অনেক কম। তাই এ টার্গেটটিও অর্জিত হয়নি। এ হলো এম ডি জি’র লক্ষ্য (লক্ষ্য-২) অর্জনে বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অবস্থাও অনুরূপ, কিছু দেশের ক্ষেত্রে এর চেয়েও খারাপ। 

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা
দেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈষম্যমূলক ও সর্বজনীন করা যায়নি। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি দেখা গেছে, যার দরুন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে এবং হচ্ছে। এমনকি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশে প্রায় ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আবার এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে অন্তত পাঁচ ধরনের পাঠ্যক্রম চালু আছে। প্রাথমিকে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের বিষয়টি কেবল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-তেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, বাস্তবায়ন হয়নি। এতে দিন দিন অভিভাবকরা সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার জন্য বেছে নিচ্ছেন বেসরকারিভাবে স্থাপিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা অবৈতনিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্যক্রমের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবৈতনিকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ বলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ৪৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। অভিভাবকদের অভিযোগ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অবৈতনিক ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার কথা বললেও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় সরকারি বিদ্যালয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অভিভাবকরা। শিক্ষাবিদদেরও মত, প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বজনীন ও বিনা ব্যয়ে পড়াশোনার শতভাগ সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সুতরাং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত না হলে শিক্ষা খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা কখনই পূরণ হবে না।

প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করতে হলে সরকারকে নির্দিষ্ট সমস্যা ধরে সমাধানের পথে এগোতে হবে। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় একটি অন্যতম সমস্যা শিক্ষক সংকট। শিক্ষার মান নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে এটি বিশেষভাবে দায়ী। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৩০। এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান (এপিএসসি) ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫। যেখানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫১৩। সে হিসেবে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ এর উপরে। এ হিসাবে সব শিক্ষার্থীর জন্য অবৈতনিক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক সংখ্যা এখনকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কতজন, সে অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন।

এছাড়া আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষক সুপ্রশিক্ষিত নন। শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষকের মান বাড়াতে হলে মেধাবী ও যুগোপযোগী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু আধুনিক সময়ের উচ্চশিক্ষিত মানুষ এ পেশায় আসতে নারাজ। এর কারণ যেমন অন্য পেশায় জড়িত অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা, তেমনই সামাজিক অবস্থান বিচারে এ পেশাকে খাটো করে দেখা।

তাছাড়া সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বেশ পুরানো ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৭ হাজার প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৯ হাজার ৬৫৬টির ভবন নতুন ও ভালো অবস্থায় আছে। বাকিগুলোর মধ্যে ১৮ হাজার ২৭১টি পুরোনো, ১৬ হাজার ৯৯৮টি মেরামতযোগ্য, ১১ হাজার ৬১৩টি জীর্ণ, ৫ হাজার ২৫২টি ঝুঁকিপূর্ণ, ৩ হাজার ৩০৭টি পরিত্যক্ত এবং ১ হাজার ৩৪৮টি ব্যবহার অনুপযোগী।

নতুন ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাশাপাশি খেলার মাঠ দখল করছে প্রভাবশালীরা। অথচ শিশুর মননশীলতার বিকাশে ও যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আবার নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবও রয়েছে। ফলে সরকারি বিদ্যালয় অনেকাংশে হয়ে গেছে সমাজের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া ধর্মীয় কারণে মাদ্রাসামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে চলমান সময়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন পিতা-মাতারা। কিন্তু সেখানে ভিন্ন কারিকুলাম ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার মান সমতায় পৌঁছাচ্ছে না।

এসব সমস্যার বিপরীতে জায়গা করে নিয়েছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়গুলো। প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে সরকারি বিদ্যালয়গুলো। শিক্ষার মান থেকে শুরু করে অভিভাবকদের আস্থা সব প্রশ্নেই বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আছে। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষা সর্বজনীন নয়। কেননা এটি বেশ ব্যয়বহুল। এজন্যে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বাজেট থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রমে আনতে হবে পরিবর্তন। বরাদ্দ ও বিনিয়োগের হার বাড়াতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে বেতন স্কেল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষা ব্যবস্থার আরো অবনতি হবে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন মূল্যায়ন থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, এমডিজি’র লক্ষ্যের অধীনে চিহ্নিত টার্গেটগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছেলেমেয়েদের ভর্তির হারে সমতা অর্জন, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, দুরারোগ্য ব্যাধি রোধ, ইত্যাদি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জিত হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেছনে পড়ে আছে। যেমন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের টার্গেটগুলো পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। এছাড়া ক্ষুধা-দারিদ্র্যের সংজ্ঞা নিয়েই গুরুতর সমস্যা রয়েছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের সমস্যা দূরীভূত করতে হলে অবশ্যই উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। ক্ষুধার্ত ও দরিদ্রদের তাদের ভাগ্য গড়ার কারিগরে পরিণত করতে হবে। নীতিনির্ধারণকে করতে হবে দারিদ্র্যবান্ধব। একইসঙ্গে দরিদ্রদের দিতে হবে জাতীয় সম্পদে তাদের ন্যায্য অধিকার। এছাড়াও প্রয়োজন হবে দুর্নীতি রোধ ও বিনিয়োগ উৎসাহের লক্ষ্যে যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি। বাধ্যতামূলক সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার এই প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি’র মেয়াদ শেষ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন করা ও নতুন করে বৈশ্বিক লক্ষ্য প্রণয়ন করা এবং সেগুলো বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করে জাতিসংঘ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসমূহ। সেই লক্ষ্যে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের সকল দেশের অংশগ্রহণে পরবর্তী ১৫ বছর (২০১৬–২০৩০ সাল) পর্যন্ত ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস’ সংক্ষেপে ‘এসডিজি’ অর্থাৎ ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ‘ নামে ১৭টি বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বলা যায় যে, এমডিজি বা সহস্রাব্দ লক্ষ্যসমূহই জাতিসংঘ ঘোষিত প্রথম বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য, যা ২০০০ সালে গৃহীত হয়েছিল। এর পূর্বে জাতিসংঘ এ ধরনের বৈশ্বিক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করে নাই। আবার এটাও বলা যায় যে, এম ডি জি কৌশল গ্রহণের সময় কেউই একথা চিন্তা করে নাই যে, এই কৌশলের মাধ্যমেই বৈশ্বিক সমস্যাসমূহ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এখন বলা যায়, এমডি জি বাস্তবায়নকালে বা গত ১৫ বছরে এম ডি জি’এ অনেক বিষয়ে বৈশ্বিক অগ্রগতি তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে। যে কারণে ২০১৫ সাল পরবর্তী সময়ে এমডিজি’র বিকল্প হিসেবে নতুন করে বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয় নিয়ে বৈশ্বিকভাবের গুরুত্ব বেড়ে যায়। বাংলাদেশের কাছেও এমডিজি-পরবর্তী বৈশ্বিক উন্নয়ন কৌশল  যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ বিগত ১৫ বছরে দারিদ্র্য নিরসন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এমডিজি’র মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্জন সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে । দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অর্জন ও সাফ্ল্যের স্বিকৃতস্বরূপ বাংলাদেশ জাতিসংঘ এমডিজি পুরস্কার লাভ করেছে যদিও যদিও সর্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। 

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) 
এসডিজি’র ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে চতুর্থটি হলো শিক্ষাবিষয়ক। 

এসডিজি-৪ - গুণগত শিক্ষা অর্জন। লক্ষ্য ৪ এর মোট ১০টি দিক ও বিভাগ রয়েছে; এগুলো নিম্নরূপ:
৪.১ ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা;
৪.২ ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা বিধান করা;
৪.৩ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগসহ সাশ্রয়ী ও মানসম্মত কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চ শিক্ষায় সকল নারী ও পুরুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা;
৪.৪ চাকরি ও শোভন কর্মে সুযোগ লাভ এবং উদ্যোক্তা হবার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দক্ষতাসম্পন্ন যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো;
৪.৫ অরক্ষিত জনগোষ্ঠীসহ অসমর্থ (প্রতিবন্ধী) জনগোষ্ঠী, নৃ-জনগোষ্ঠী ও অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো;
৪.৬ নারী ও পুরুষ সহ যুবসমাজের সবাই এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতা ও গণন-দক্ষতা অর্জনে সফলকাম হয় তা নিশ্চিত করা;
৪.৭ অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি, টেকসই উন্নয়ন ও টেকসই জীবনধারার জন্য শিক্ষা, মানবাধিকার, নারী পুরুষ সমতা, শান্তি ও অহিংসামূলক সংস্কৃতির বিকাশ, বৈশ্বিক নাগরিকত্ব এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নে সংস্কৃতির অবদান সম্পর্কিত উপলব্ধি অর্জনের মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থী যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তা নিশ্চিত করা;
৪.৮  শিশু, অসামর্থ্য (প্রতিবন্ধিতা) ও জেন্ডার বিষয়ে সংবেদনশীল শিক্ষা সুবিধার নির্মাণ ও মানোন্নয়ন এবং সকলের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ প্রদান করা;
৪.৯ উন্নত দেশ ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কারিগরি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচিসহ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ, উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রদেয় বৃত্তির সংখ্যা বৈশ্বিকভাবে ২০২০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো; এবং
৪.১০ শিক্ষক প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা। সূত্রঃ জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন

বলা যায় এ লক্ষ্যগুলো এমডিজি’র চেয়ে উচ্চতর এবং বিশ্বের পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে এসডিজির লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত প্রয়াস। পনেরো বছর মেয়াদি এই লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনের জন্যে ইতোমধ্যে ১০ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এরই মধ্যে কোভিড-১৯ জনিত কারণে এর মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে। যাই হোক, এ আলোচনায় আমরা এস ডি জি’র লক্ষ্যমাত্রা ৪ এর দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা মূল্যায়নের চেষ্টা করবো। প্রথমেই জানা দরকার, লক্ষ্য ৪ এর ১০টি উপসংঘ রয়েছে যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ১০টি উপসংঘের মধ্যে অন্তত ৪টি উপসংঘ প্রাথমিক ও শিশুশিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত।

এগুলোর মর্মার্থ পুনরায় নিম্নে উল্লেখ করা হল:
৪.১। ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা;
৪.২। ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা বিধান করা;
৪.৫। অরক্ষিত জনগোষ্ঠীসহ অসমর্থ (প্রতিবন্ধী) জনগোষ্ঠী, নৃ-জনগোষ্ঠী ও অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো;
৪.৮।  শিশু, অসামর্থ্য (প্রতিবন্ধিতা) ও জেন্ডার বিষয়ে সংবেদনশীল শিক্ষা সুবিধার নির্মাণ ও মানোন্নয়ন এবং এবং সকলের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ প্রদান করা;

উপরে এসডিজি-৪ এর ৪টি অনুষঙ্গে অর্থাৎ প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের যে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে সে পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞদের মত হলো যে, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট নিম্নোক্ত প্রতিটি উপাদান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে এস ডি জি’র লক্ষ্যমাত্রা ৪ এ উল্লিখিত প্রাথমিক শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যাবলি কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে:
- মানসম্মত শিক্ষকের পর্যাপ্ততা; 
- যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন; 
- মানসম্মত বই ও শিখন সামগ্রী ব্যবহার; 
-  শিখন-শেখানো পদ্ধতির ও কৌশলের কার্যকর ব্যবহার; 
-  নিরাপদ ও সহযোগিতামূলক শিখন পরিবেশ; 
-  উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা; 
-  প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তার ও কর্মচারীর সুসম্পর্ক; 
-  শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ; 
- শিক্ষকদের জীবন জীবিকা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি; 
-  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুবিধা;
- শিশু-কিশোরদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার সুবিধা;
- শিশু, অসামর্থ্য (প্রতিবন্ধিতা) ও জেন্ডার বিষয়ে সংবেদনশীল শিক্ষা সুবিধার নির্মাণ; 
- অসমর্থ (প্রতিবন্ধী) শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ; এবং
- সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো।
- বহু ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে ১/২ ধরনের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা (বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু আছে)।
- এক রকমের পাঠ্যক্রম চালু করা (বর্তমানে ৫ রকমের পাঠ্যক্রম চালু আছে। 

এসডিজি প্রদত্ত প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সকল উপাদান নিশ্চিত করার কথা উপরে বলা হয়েছে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতীয়মান হয় না। গুণগত ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের এ সকল উপাদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই কার্যকর প্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি 
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ভঙ্গুর অবস্থা দূরীকরণ এবং ছাত্রবান্ধব পরিবেশ, খেলার মাঠ তৈরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বেতন বৃদ্ধি, ইত্যাদি কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ অপরিহার্য। ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন অনুযায়ী একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত বাৎসরিক মোট বাজেটের ২০% এবং জিডিপি’র ৬%। যাই হোক, সে হিসাবে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের চলতি অর্থ বছরের বরাদ্দ জিডিপি’র ১.৮১% এবং মোট বাজেটের ১৩.৭০% এর মতো যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বাজেট বরাদ্দ কম থাকার কারণে আমাদের শিক্ষকদের বেতনও কম। কম বেতনে যা দিয়ে একজন শিক্ষক স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালাতে পারেন না তিনি টিউশনি বা অন্য পার্শ্ব আয়ের কথা চিন্তা না করে একনিষ্ঠভাবে কীভাবে শিক্ষাদানে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন। সুতরাং মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ আসলে শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদার কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। কারণ শিক্ষকতা অন্যান্য পেশার রোল মডেল। একজন শিক্ষক, সমাজ ও জাতি গড়ার কারিগর। সুস্থ দেশ গড়ার জন্য চাই একজন যোগ্য শিক্ষক। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রশাসন, যোগ্য শিক্ষকমণ্ডলী ও কারিকুলামের ওপর নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব। শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্তসহ মানসম্মত পাঠদানের অভিনবত্ব সৃষ্টির মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে শিক্ষার গুণগত মান। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছা, ইচ্ছাশক্তি ও আন্তরিকতাই যথেষ্ট। একজন শিক্ষকের জীবনাদর্শ হবে দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা স্বরূপ। শিক্ষকদের স্বশাসিত হতে হবে। তাড়িত হতে হবে বিবেক দ্বারা। শিক্ষার্থীদের আত্মোপলব্ধির প্রয়োজনে চমৎকার উদ্ভাবনী ক্ষমতা থাকবে শিক্ষকদের। সুতরাং শিক্ষকদের বেতন ও সম্মান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিকে ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত হচ্ছে ১:৫০। মাধ্যমিকে তার চেয়ে সামান্য কম এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১:২৩। মানসম্মত ও গুণগত শিক্ষা প্রদান করতে হলে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক সংখ্যা বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের হতে হবে যোগ্য, দক্ষ এবং শিক্ষা প্রদানে নিবেদিত। উপযুক্ত সর্বাধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্যে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে। এস ডি জি’র লক্ষ্যমাত্রায় বয়াল হয়েছে প্রাথমিকের পূর্ব থেকেই শিশুদের যত্ন নিতে হবে। এতে আরও বেশিসংখ্যক শিক্ষকের প্রয়োজন।

পাঠক্রম পর্যালোচনা 
বিশ্বে সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে নিয়মিতভাবে প্রদত্ত পাঠক্রম মূল্যায়ন ও পরিবর্তনের জন্যে একটি স্থায়ী কমিশন থাকা প্রয়োজন। এই কমিশন প্রতিনিয়ত শিক্ষাক্রম যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করবে। এই কমিশন সরকারের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী) –এর অধীনে কাজ করলে ভালো হয় বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন। বিভিন্ন রকম পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে ১/২ রকমের পাঠ্যক্রম চালু করা দরকার।

অরক্ষিত জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যে উপযুক্ত সুবিধা প্রদান নিশ্চিত করা
এ কথা সত্য যে আমাদের বর্তমানকার বিদ্যালয়সমূহে প্রতিবন্ধী শিশুদের কোনরূপ সুবিধা বিদ্যমান নেই। কিন্তু এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণকল্পে এ সকল সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। এজন্যে অতিরিক্ত বাজেট ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।

শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্কোন্নয়ন
পাঠদানের বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্কন্নোয়ন ও সমন্বয় দরকার। শিক্ষার মান উন্নয়নে অভিভাবকদের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অভিভাবক অন্তত সপ্তাহে একদিন শিক্ষকদের সম্মানের সাঙ্গে ছাত্রদের বিষয়ে জানতে চাইবেন। শুধু নিজের সন্তানকে সন্তান মনে করলে হবে না। বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি সন্তানকে সমান চোখে দেখা উচিত। নিজের সন্তানকে তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি পাশের অন্যের সন্তানকেও জানতে হবে। নিজের সন্তানকে শুধু সন্তান মনে করে আমরা একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে গিয়েছি। কেন আমার সন্তান রোল ১ করল না। কেন অমুকের সন্তানের রোল ১ হলো। এতে শিক্ষকরা কিছুটা বিড়ম্বনার শিকার হন। তবে এ ক্ষেত্রে যদি শিক্ষকদের কোনো ত্রুটি বা হাত থাকে তাহলে এ লজ্জাজনক কাজ থেকে সরে আসাই ভালো।

ঝরে পড়া রোধ করা এবং বয়স্ক শিক্ষার হার বৃদ্ধি
প্রাথমিকে ভর্তির পর দেখা যায় যে অর্ধেকের মতো ছাত্রছাত্রী ৫ম শ্রেণির কোঠায় পৌঁছাতে পারে না আর বয়স্ক শিক্ষার হার ৭০% দাবি করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম বলে বিশেষজ্ঞ মনে করেন। ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ দরিদ্রতা বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। স্কুলে বই পুস্তকের সাথে একবেলা খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করতে পারলে ঝরে পড়া অনেকাংশে কমবে বলে বিশ্বাস। বয়স্ক শিক্ষা বৃদ্ধির জন্যে মসজিদভিত্তিক নৈশকালীন শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা কার্যকর ফলাফল আনতে সাহায্য করবে বলে শিক্ষা ও সমাজবিদদের ধারণা। 

নৈতিক ও সহশিক্ষা জোরদারকরণ
শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মূল্যবোধ শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, বিনয় ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার দীক্ষা অবশ্যই আমাদের শিক্ষকদের দিতে হবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষক কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তিনি সমাজেরও শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নির্ভরতা কমিয়ে মানসিক চাপমুক্ত করতে সহায়তা করা শিক্ষকের একান্ত দায়িত্ব। পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। পরীক্ষা নির্ভরতা কমিয়ে, মেধা যাচাই করে প্রাথমিক স্তরেই ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম, পরোপকারিতা ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো উচিত। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরীক্ষার ক্ষেত্রে বারবার নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে বা নিয়ম চালু হলে তাতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীর ভূমিকার ব্যাপারে; লেখাপড়ার বিষয়ে কোনো সমস্যা দেখা গেলে তা অবশ্যই শিক্ষকদের জানাতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থী বন্ধুদের প্রতি কখনো খারাপ আচরণ করা যাবে না। তারা যাতে ভালো হয় সেদিকে সাহায্য করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যাতে সুবিধামতো পড়াতে পারেন সে বিষয়ে শিক্ষককে সহযোগিতা করতে হবে। প্রতিদিনের পড়া প্রতি দিন ক্লাসে শেষ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য সবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন একটি পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয় পাবে, তেমনি তারা কর্মঠ, উদ্যমী ও স্বাবলম্বী হবে এবং পরিচ্ছন্ন থাকার জ্ঞান লাভ করবে। আমাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিক্ষকদের ছাত্র শাসনের ব্যাপারে বিশেষ নিয়মে আবদ্ধ করা যাবে না। সেজন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের কোমলমতি মন নিয়ে ভালোবাসা দিয়ে যত্নসহকারে পড়াতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের শিক্ষকদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে প্রশাসনিক দিক থেকে তৃণমূল পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজালে আমাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব। খেলাধুলা, আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ইত্যাদি সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। সহশিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগও থাকা চাই অবারিত। ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞান বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাঠ্য বই এর বাইরের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেজন্যে গ্রন্থাগার ক্লাশ ও গ্রন্থাগার থেকে পুস্তক ধার করার নিয়ম চালু করতে হবে।

শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ
আজকের শিশুদের কেউবা হবে আগামী দিনের প্রকৃত মানুষ, আর প্রকৃত মানুষ হতে পারলেই তারা হতে পারবে শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী। কেউ হবে শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি ও সাংবাদিক। এগুলো তৈরি হবে শিক্ষাঙ্গণেই। তাই শিক্ষাঙ্গণের শ্রেণিকক্ষই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই বর্তমান সমাজের প্রয়োজন মতো চাহিদা ও ভবিষ্যৎ সমাজের সম্ভাব্য চিত্রকে সামনে রেখে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা তথা শিক্ষাঙ্গণে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টিতে সচেষ্ট হতে হবে। উত্তম শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ। আর এই পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততাই গড়ে দিতে পারে গুণগত শিক্ষার মজবুত ভিত। শিক্ষাকে গুণগত মানের দিক থেকে উন্নত করতে পারলেই জাতীয় জীবনে এগিয়ে চলা সহজ হবে। বিভিন্ন রকম প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গায় ১/২ রকমের প্রতিষ্ঠান করার কথা চিন্তা করা। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার বৈষম্য হ্রাস হবে। 

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা
এসডিজি’র শিক্ষাবিষয়ক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার বয়স বা সীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু বলা না থাকলেও অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর ৫ম শ্রেণির স্থলে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত হওয়া প্রয়োজন। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনে ১৯৭২ সনে এই সুপারিশ করা হয়েছিল। মনিরুজ্জামান কমিটি (১৯৯২) ও আব্দুল বারী কমিটিও (২০০২) অভিন্ন সুপারিশ করেছিল। কিন্তু শিক্ষা আইন ২০২৬, এ প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত করার যুক্তি হচ্ছে–এই বয়সে ছাত্রছাত্রীরা শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতার প্রাথমিক ধাপ মেটাতে সক্ষম হয়। আমাদের দেশের ৪র্থ শ্রেণির চাকরির যোগ্যতাও ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত চাওয়া হয়। আর ৮ম পর্যন্ত এই প্রাথমিকের পর শুরু হবে বাছাই পর্ব। শুধু মেধাবীরাই ৯ম শ্রেণিতে যাবে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। বাকিরা টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ে যাবে। বিদেশগামী শ্রমিকেরা হবে ৮ম শ্রেণি পাশ ও ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রাপ্ত দক্ষ শ্রমিক।  

মাদ্রাসা শিক্ষা

এসডিজির লক্ষ্যমাত্রায় মাদ্রাসা শিক্ষার উল্লেখ না থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে 
মাদ্রাসা শিক্ষা দেশের একটি বাস্তব ও ঐতিহাসিক অংশ। বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে আলিয়া ধারার সঙ্গে মূলধারার সমন্বয়ের ইঙ্গিত থাকলেও মানোন্নয়ন ও সনদের সামঞ্জস্যের প্রশ্নে আরও সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। কওমি ধারার ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি ও দক্ষতা সংযোগের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা জরুরি। সমন্বিত কাঠামো ছাড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথ সীমিত হতে পারে। দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফোরকানিয়া/হেফজ মাদ্রাসাগুলোকে সর্বজনীন শিক্ষার অধীনে আনা যায় কিনা তাও নূতন সরকার বিবেচনা করে দেখতে পারেন। মনে রাখতে হবে তারাও আমাদের উন্নয়ন অংশীদার। 

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইল: amatin@aub.ac.bd