২০২০: ২১ গুণীজনকে হারাল বাংলাদেশ
বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বের জন্যই ঝড়ঝাপটার ছিল ২০২০ সাল। সারা বিশ্ব যখন মহামারি করোনায় পর্যুদস্ত বাংলাদেশও এর বাইরে থাকার সুযোগ নেই। এ বছর বহু গুনী ব্যক্তিবর্গকে হারিয়েছি আমরা। শিক্ষাবিদ, শিল্পী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের অনেকেই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরলোকগত হয়েছেন। সবার নাম হয়তো স্মরণ করা সম্ভব নয়। এখানে ২১ জনের তালিকা দেওয়া হলো-
জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী
বাংলাদেশের প্রকৌশল জগতের অভিজ্ঞজন ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি একাধারে গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী ছিলেন। ১৯৪৩ সালে সিলেটে জন্ম গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর এ দেশে যত বড় বড় ভৌত অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটির সঙ্গেই জামিলুর রেজা চৌধুরী কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন। যুক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে। হাত দেন পদ্মা সেতু নির্মাণের বিশাল প্রকল্পে।
একসময় বুয়েটে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। দায়িত্ব পেয়েছিলেন ১৯৯৬ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও। উপাচার্য ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির। এ ছাড়া বাংলাদেশে আর্থকোয়েক সোসাইটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন অনেক দিন ধরে। এ বছরের ২৮ এপ্রিল ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।
জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
শিক্ষাবিদ, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। তাঁর জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। তিনি ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি ২০১২ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে তার কর্মজীবন শেষ করে অবসর জীবনযাপন করছিলেন।
প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৮৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে ভারত সরকার তাদের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদক প্রদান করে। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এ বছরের ১৪ মে তিনি ৮২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর করোনা পজিটিভ আসে।
নিলুফার মঞ্জুর
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর স্ত্রী ও সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৬ মে মৃত্যুবরণ করেন।
আবদুল মোনেম
দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মোনেম ৩১ মে ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
মোহাম্মদ নাসিম
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায়। বাবা ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার একজন এম মনসুর আলী ও মা মোসাম্মৎ আমেনা মনসুর। সংসদে ষষ্ঠবারের মতো সিরাজগঞ্জের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
এবার মন্ত্রিত্ব না পেলেও দলের সভাপতিমণ্ডলীতে থাকার পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন নাসিম। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জুন মৃত্যুবরণ করেন সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম।
কামাল লোহানী
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক কামাল লোহানী করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০ জুন মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬১ সালে অন্য অনেকের সঙ্গে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে তাঁর ছিল দৃঢ় ভূমিকা। তাঁর পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। মুক্তিযুদ্ধের সময় কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন ঢাকা বেতারের। ১৯৭৩ সালে ‘দৈনিক জনপদ’ নামে একটি নতুন পত্রিকায় যোগ দিয়ে আবার ফিরে আসেন সাংবাদিকতায়। কর্মজীবনে কামাল লোহানী দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও উপদেষ্টা কামাল লোহানী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুবার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে এবং ছায়ানটের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে জন্ম নেন তিনি।
লতিফুর রহমান
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। বছর দুয়েক ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে জানা গেছে। আর বেশিরভাগ সময়ই তিনি চৌদ্দগ্রামের বাড়িতে থাকতেন। ১৯৪৫ সালে ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন লতিফুর রহমান। পরবর্তীতে বাস করতেন পুরান ঢাকা গেন্ডারিয়ায়।
প্রয়াত এই বিজনেস টাইকুনের ট্রান্সকম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য, ওষুধ, সংবাদপত্র, চা শিল্প, বিমা ইত্যাদি। ট্রান্সকম গ্রুপের যাত্রা শুরু চা চাষের মাধ্যমে, যেটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম একটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া লতিফুর রহমান নেসলে বাংলাদেশ, হোলসিম বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান। তিনি লিন্ডে বাংলাদেশ এবং এনজিও ব্র্যাকের গভর্নিং বোর্ডের পরিচালক। বাংলাদেশের বাজারে আন্তর্জাতিক ফাস্টফুড চেইন পিৎজা হাট ও কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন (কেএফসি) প্রচলনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেন লতিফুর রহমান। এ ছাড়াও তিনি দ্য ডেইলি স্টারের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াওয়ার্ল্ড ও প্রথম আলোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মিডিয়াস্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন। লতিফুর রহমানের জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৮ আগস্ট।
এন্ড্রু কিশোর
দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর ৬ জুলাই নিজের শহর রাজশাহীতে একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ৬৫ বছর বয়সী এই কণ্ঠশিল্পী দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে আসছিলেন।
বাংলা গানের এই কণ্ঠশিল্পী ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ নামে পরিচিত। এন্ড্রু কিশোরের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘জীবনের গল্প/ আছে বাকি অল্প’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘তুমি যেখানে/ আমি সেখানে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’, ‘তুমি আমার জীবন/ আমি তোমার জীবন’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’, ‘তুমি আমার কত চেনা’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’,‘এইখানে দুইজনে নির্জনে’সহ অনেক গান।
সাহারা খাতুন
দেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাহারা খাতুন। ১০ জুলাই থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সাহারা খাতুনের জন্ম ১৯৪৩ সনের ১ মার্চ ঢাকায়। এলএলবি পাস করে সাহারা খাতুন ১৯৮১ সালে আইন পেশায় নিজেকে যুক্ত করেন।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের জুনিয়র হিসেবে তার কাজ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ২০০১ সালের ভোটের পর বিএনপির শাসনামলে মামলা পরিচালনায় সাহারার ভূমিকার কথা এখনও স্মরণ করেন।
এ ছাড়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সাহারার সাহসী ভূমিকায় থাকতেন সাহারা। মাঠের কর্মী সাহারাকে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৫ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ। সেবার হারের পর পরবর্তী দুটি নির্বাচনে আর তাকে প্রার্থী করা হয়নি। তবে জরুরি অবস্থা জারির পর দলের দুঃসময়ে আনুগত্যর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হারানো আসন পুনরুদ্ধার করেন সাহারা খাতুন।
সাইদা খানম
দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী একুশে পদকপ্রাপ্ত সাইদা খানম ৮২ বছর বয়সে ১৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায় হলেও জন্ম পাবনায়, ১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সাইদা খানম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও লাইব্রেরি সায়েন্সে মাস্টার্স করেন। বেগম পত্রিকার মাধ্যমে সাইদা খানম ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
তাঁর ছবি ছাপা হয় অবজারভার, মর্নিং নিউজ, ইত্তেফাক, সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। আলোকচিত্রী হিসেবে দেশেও দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেন তিনি। অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের ছবিও তোলেন সাইদা খানম। সত্যজিতের তিনটি ছবিতে আলোকচিত্রী হিসেবেও কাজ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানম ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত নারীদের ছবি তোলেন।
ক্যামেরার ক্লিকের পাশাপাশি বইও লিখেছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে ‘ধূলোমাটি’, ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’, ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’, ‘আলোকচিত্রী সাইদা খানম-এর উপন্যাসত্রয়ী’।
মৃণাল হক
ভাস্কর মৃণাল হক গত ২২ আগস্ট ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সুপরিচিতি এ ভাস্কর নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করেন মতিঝিলের ‘বলাকা’ ভাস্কর্যটি। ২০০৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নির্মিত গোল্ডেন জুবিলি টাওয়ার তাঁরই শিল্পকর্ম।
এ ছাড়া সারা দেশে তিনি অনেক ভাস্কর্যের কাজ করেছেন। রাজধানীতে হোটেল শেরাটনের সামনে ‘রাজসিক’, পরীবাগ মোড়ে ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’, ইস্কাটনে ‘কোতোয়াল’, সাতরাস্তায় ‘ময়ূর’, মতিঝিলের ‘বক’, এয়ারপোর্ট গোল চত্বরের ভাস্কর্য, নৌ সদর দপ্তরের সামনে ‘অতলান্তিকে বসতি’, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের ভাস্কর্য, বঙ্গবাজারে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন ভাস্কর্যের নির্মাতা তিনি।
শাহ আহমদ শফী
চট্টগ্রামের আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর (বড় মাদ্রাসা) মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ১০৩ বছর বয়সে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। ইসলামী শিক্ষালাভের উদ্দেশে ১০ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায়।
সেখান থেকে হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯৪১ সালে চলে যান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায়। সেখানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ-এর প্রেসিডেন্ট আল্লামা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানির কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষালাভ এবং তাঁর খেলাফতপ্রাপ্ত হন।
ভারত থেকে দেশে ফিরে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে দারুল উলুম হাটহাজারীতে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৬ সালে এই মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আহমদ শফী। এরপর থেকে টানা ৩৪ বছর তিনি ওই পদে ছিলেন। ২০০৮ সালে আল্লামা আহমদ শফী কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
মাহবুবে আলম
করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর ৭১ বছর বয়সে মারা যান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি দেশের ১৫তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন মাহবুবে আলম। মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থনে দাফন করা হয় জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবীকে।
মনসুরুল করিম
গত ৫ অক্টোবর ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মনসুর উল করিম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে দীর্ঘ ৪০ বছর অধ্যাপনা করেন। সত্তরের দশকের শুরু থেকে তিনি দেশের চিত্রশিল্পে অসামান্য অবদান রেখেছেন।
রশীদ হায়দার
১৩ অক্টোবর ৭৯ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক রশীদ হায়দার। তিনি বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন।
১৯৬৪ সালে পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডের মুখপত্র ‘পরিক্রম’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন রশীদ হায়দার। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে চাকরি শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেন। পরে তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হন।
রফিক উল হক
দেশের প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক উল হক গত ২৪ অক্টোবর ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক উল হক। এ সময়ে তিনি কোনও সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনও কোনও রাজনৈতিক দল করেননি। তবে নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা সবসময় তাকে পাশে পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের সম্মান সবসময়ই অর্জন করেছেন তিনি। ব্যারিস্টার রফিক উল হক তার জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়।
আলী যাকের
১৯৭২ সালের আরণ্যক নাট্যদলের ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সাল থেকে কাজ করছেন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় নিয়ে। মঞ্চের পাশাপাশি টিভি নাটকেও সমাদৃত হন এই তারকা। স্ত্রী সারা যাকেরকে নিয়ে গড়ে তোলেন দেশের বৃহৎ বিজ্ঞাপনী সংস্থা। গত ২৭ নভেম্বর ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বিশিষ্ট এই অভিনেতা।
শাহাদাত হোসেন খান
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৮ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন প্রখ্যাত সরোদশিল্পী শাহাদাত হোসেন খান। ১৯৫৮ সালে উপমহাদেশের অন্যতম এক সংগীত পরিবারে জন্ম নেন শাহাদাত হোসেন খান। তাঁদের পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায়। তিনি বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ছোট ভাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর নাতি। তাঁর বাবা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান একজন প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী ও সেতার বাদক। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন সরোদশিল্পী শাহাদাত হোসেন খান।
নূর হোসাইন কাসেমী
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৩ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। তিনি একাধারে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব, আল হাইআতুল উলয়ার সহসভাপতি, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি এবং জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা ও জামিয়া সোবহানিয়া মাহমুদ নগরের শায়খুল হাদিস ও মহাপরিচালক ছিলেন। হেফাজত আন্দোলন, খতমে নবুয়ত আন্দোলনসহ প্রভৃতি আন্দোলনে তিনি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি প্রায় ৪৫টি মাদ্রাসা পরিচালনার কাজে যুক্ত ছিলেন।
এম এ হাসেম
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৪ ডিসেম্বর মারা যান দেশের বিশিষ্ট শিল্পগ্রুপ পারটেক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এম এ হাসেম। ১৯৫৯ সালে তামাকপণ্যের কেনাবেচার মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ১৯৭০-এর কিছু আগে তিনি চট্টগ্রামে মেসার্স হাসেম করপোরেশন গড়ে তোলেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের পাশাপাশি সিমেন্ট, ইস্পাত আমদানি শুরু করেন।
এরপর দেশেই বিভিন্ন কারখানা গড়ে তোলেন। এভাবেই গড়ে ওঠে পারটেক্স গ্রুপ। গ্রুপটির জনপ্রিয় পণ্যগুলোর মধ্যে ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক, মাম পানি ও কোমল পানীয় ব্র্যান্ড আরসি অন্যতম। এম এ হাসেম বিভিন্ন ব্যবসার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাদেরও একজন। ব্যাংক দুটির চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া নোয়াখালী থেকে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যও ছিলেন এম এ হাসেম।
আব্দুল কাদের
অগ্ন্যাশয় ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ শনিবার সকালে (২৬ ডিসেম্বর) মৃত্যুবরণ করেন জনপ্রিয় অভিনেতা আব্দুল কাদের। হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিক নাটকে ‘বদি’ চরিত্রে অভিনয় করে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পান কাদের। বাকের ভাই আর বদি, এই দুই চরিত্র নব্বই দশকে বিপুল দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল।
সেই থেকে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন আব্দুল কাদের। হুমায়ূন আহমেদের ‘নক্ষত্রের রাত’ নাটকে দুলাভাই চরিত্রেও দারুণ প্রশংসিত হন আব্দুল কাদের। বহু একক ও ধারাবাহিক নাটকের পাশাপাশি তাঁকে নিয়মিত দেখা গেছে বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-তে। ১৯৫১ সালে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থায় এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরির পর আন্তর্জাতিক কোম্পানি বাটায় চাকরি করেছেন ৩৫ বছর।