মেট্রোরেল সেবার ৩ মাসে শিক্ষার্থীরা কী পেলেন

মেট্রোরেল সেবার ৩ মাসে শিক্ষার্থীরা কী পেলেন
মেট্রোরেল সেবার ৩ মাসে শিক্ষার্থীরা কী পেলেন  © টিডিসি ফটো

মেট্রোরেল আর স্বপ্ন নয়। সব জীর্ণতার বাঁধ ভেঙে বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেল এখন বাস্তব ও দৃশ্যমান। এর বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষে। এমআরটি লাইন-৬ এর উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বাণিজ্যিক ভাবে শুরু হওয়া এই মেট্রো পরিসেবার সময় সম্প্রতি ৩ মাস পেরিয়েছে। শুরুতে দুই স্টেশনে আপডাউন যাত্রী পরিসেবা প্রদান করলেও পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্টেশন। সবশেষ আজ শুক্রবার (৩১ মার্চ) উত্তরা উত্তর থেকে আগরগাঁও পর্যন্ত সবগুলো (৯টি) স্টেশনই যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় সরকারের বৃহৎ এই প্রকল্প ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি এটি নগরবাসীর জীবনে ফিরিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য ও গতিময়তা। তবে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

তাঁরা বলছেন, ক্লাস করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে এবং পুনরায় বাড়ি ফিরতেই রাজধানীর সড়কপথে মুখোমুখি হতে হতো ভয়াবহ যানজটের। অসহনীয় জ্যামে বসেই চলে যেত অনেকসময়। তবে মেট্রোরেল চালুর ফলে এমন সমস্যার সহজ ও সুন্দর সমাধান হয়েছে। মেট্রোরেলের ৩ মাসের এই পথচলায়  শিক্ষার্থীদের ভাবনা জেনেছেন  দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিবেদক মো. রাকিবুল হাসান তামিম

ঢাকার জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়েছে মেট্রোরেল
স্বাধীনতার ৫১ বছর পর ঢাকাবাসী মেট্রোরেল উপহার পেয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম বড় সাফল্য। মূলত, ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময়-সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎ চালিত, দূরনিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব অত্যাধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তন করাই হলো মেট্রোরেলের উদ্দেশ্য। এই বিষয়গুলোতে মেট্রোরেল ঢাকার মানুষরে সার্বিক জীবনে প্রচন্ডরকম স্বস্তি এনেছে। তবে মেট্রোরেলের সঠিক ব্যবহারে আমাদের আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। উন্নত গণপরিবহন ব্যবহারে আমাদের উন্নত মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে।

মেট্রোরেল রাষ্ট্রীয় সম্পদ এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমার আপনার সকলকে নিতে হবে। আরো বড় কথা হলো মেট্রোরেলে নারী যাত্রীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য প্রতিটি ট্রেনের একটি করে কোচ শুধুমাত্র নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত আছে। এতে প্রতি ট্রেনে প্রতিবার সর্বোচ্চ ৩৯০ জন নারী যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।

নারী যাত্রীরা ইচ্ছা করলে অন্য কোচেও যাতায়াত করতে পারছেন।  মেট্রো স্টেশনগুলোতে মহিলা যাত্রীদের জন্য পৃথক বাথরুমের সংস্থান আছে এবং তাতে শিশুদের ডায়াপার পরিবর্তনের সুবিধার্থে বিশেষ ব্যবস্থাও সংযোজিত আছে। গর্ভবতী মহিলা ও বয়স্ক যাত্রীগণের জন্য মেট্রো ট্রেনের কোচের অভ্যন্তরে আসন সংরক্ষিত আছে। এই বিষয়গুলো শুধু আমাদের জন্য নয় বরং পুরো দেশের মানুষের জন্য মারাত্মক স্বস্তিদায়ক। সবমিলিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়াটি চালুর মাধ্যমে দেশের মানুষজনও  নতুন বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে পেরেছে বলে মনে করছি।

কে.এম.তারেক আজিজ সুমন 
শিক্ষার্থী, পিজিডি-জিবি প্রোগ্রাম 
আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এখন সঠিক সময় ক্লাসে পৌঁছাতে পারছি
বাংলাদেশ এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে মেট্রোরেলের মধ্য দিয়ে। আমি মনে করি মেট্রোরেল ঢাকাবাসীকে একটি প্রশান্তিময় যাত্রা উপহার দিয়েছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এই প্রকল্প জনগনকে যানজটের ভোগান্তি থেকে রক্ষা করবে। উত্তরা বা মিরপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে আসতে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হতো। সকালে কিছুটা ফাঁকা থাকলেও দুপুরে বা বিকেলে কলেজ থেকে বাসায় ফিরতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় জ্যামে বসে থাকাটাই ছিলো নিত্যদিনের রুটিন।

আরও পড়ুন: প্রথম দিনে মেট্রো রেলের ৫০ ট্রিপ, আয় পৌনে তিন লাখ টাকা

আমার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই এমন হয়েছে যে, সকালে জ্যামের কারণে সঠিক সময়ে  ক্লাসে আসতে পারিনি। প্রায়ই  প্রথম ক্লাস করতে পারিনি। সেজন্য বাধ্য হয়েই খুব সকাল সকাল ক্যাম্পাসে এসে বসে থাকতে হত। আবার বাসায় ফেরার সময়ও একই অবস্থা। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর এমন সমস্যার অবসান ঘটেছে। তাছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজধানীর জন্য দ্রুতগতির এমন একটি পরিবহন ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন ছিলো।

আপাতত উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হওয়ায় কিছুটা রক্ষা হয়েছে। তবে প্রত্যাশা  করছি যেন খুব দ্রুতই সম্পূর্ণ রুটে নিয়মিত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হয়। কেননা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে  অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া। তাই মেট্রোরেলের হাত ধরেই নগরজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য এবং গতিময়তা ফিরিয়ে আনতে হবে।

রৌদ্র রহমান পিয়াল 
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

মিরপুরের যানজটে বিরক্ত হয়ে পরিবার ছেড়ে আজিমপুরে মেসে উঠেছিলাম
মসজিদ আর রিকশার শহর থেকে কবে যে আমাদের রাজধানী যানজটের শহর হয়ে দাঁড়িয়েছে তা বলতে পারবো না। রাজধানী কেন্দ্রিক বিশাল জনসংখ্যা যারা দেশীয় অর্থনীতির গতিকে ত্বরান্বিত করতে তৎপর সেই তাঁদেরই দিন রাত যানজটে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ১৫ মিনিটের রাস্তায় যেখানে এক ঘণ্টা সময় ব্যয় হয় সেখানে কর্মঘণ্টার কি পরিমান অপচয় হয় তা সহজেই অনুমেয়। ফলে সড়কে বের হলেই অতিরিক্ত সময় ব্যয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে ঢাকার জনসাধারণ। সেই সাথে বিপুল পরিমাণ জ্বালানির অপচয় যা দিন শেষে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতিতে এক বিরাট বাঁধা।

আমি নিজেও মিরপুর থেকে প্রতিনিয়ত কলেজে ক্লাস করতে আসা-যাওয়ার পথে যানজটে বিরক্ত হয়ে পরিবার ছেড়ে আজিমপুরের মেসে উঠেছি। এমআরটি লাইন-৬ বা বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেলে ঘণ্টায় ৬০ হাজার এবং দিনে ৫ লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করতে পারছেন।

রেল কতৃপক্ষ বলছে, ৬টি কোচ সম্বলিত প্রতিটি একমুখী মেট্রো ট্রেন প্রতিবারে ৩৮ মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১৬টি স্টেশনে থেমে সর্বোচ্চ ২,৩০৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। এরফলে মেট্রোরেলে অল্প সময়ে অধিক সংখ্যায় যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ছোট ছোট যানবাহনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েচে। জীবাশ্ম ও তরল জ্বালানীর ব্যবহারও বহুলাংশে কমে গিয়েছে। ঢাকা মহানগরীর যাতায়াত ব্যবস্থায় ভিন্ন মাত্রা ও গতি যুক্ত হয়েছে মেট্রোরেলের হাত ধরে। সবমিলিয়ে বলা যায় আমাদের জন্য ভালোকিছু বয়ে এনেছে মেট্রোরেল। 

মিজানুর রহমান
শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
ঢাকা কলেজ

কমছে ভোগান্তি, বেঁচে যাচ্ছে কর্মঘণ্টা
মেট্রোরেল রাজধানী ঢাকার জন্য আশীর্বাদ। কেননা ঢাকা এখন যানজটের নগরী। প্রতিনিয়ত জ্যামের কারণে এখানে অনেক সময় নষ্ট হয়। যানজটে নাকাল হয়ে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারাটা নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর উত্তরা ও মিরপুরের মানুষের ভোগান্তি কমেছে। এখন পর্যন্ত যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি।

তবে এই মুহূর্তে আশা দেখাচ্ছে  মেট্রোরেল। এরমাধ্যমে যানজট নিরসনে হচ্ছে। সবমিলিয়ে বলা যায় মেট্রোরেল এযাবতকালের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে অন্যতম কেননা এরমধ্য দিয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন ট্রেন ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীদের সময় এবং অর্থ উভয় সাশ্রয়ও করেছে৷ তবে পুরো ঢাকা জুড়ে মেট্রোরেল সচল হলে রাজধানী আবার  তার গতি ফিরে পাবে, যে গতিতে  বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দায় দেশীয় অর্থনীতে যে  টানাপোড়ন চলছে তা কাটিয়ে  আবার ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ এটাই প্রত্যাশা।

সাইমা নাহার দিনা 
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশ মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করছে, এটা গর্বের
সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাজধানীর মানুষ গত কয়েক বছর ধরে যে স্বপ্ন লালন করে আসছিলো তার বাস্তবরূপের বানিজ্যিক যাত্রার তিনমাস পার হচ্ছে। ঢাকার মানুষজনকে এই শুভক্ষণের জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। মেট্রোরেল চালু হওয়ার ফলে এটি বাংলাদেশের জন্য অন্যন্য একটি উদাহরণ তৈরি হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। সবচেয়ে বড় হলো মেট্রোরেল চালু হলে বহু মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই দূর হবে।

একদিকে যেমন ঢাকার যানজট রোধ পাবে ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষের সময়ও বাঁচবে। তাছাড়া মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ চালিত বিধায় কোনো ধরণের জীবাশ্ম ও তরল জ্বালানী ব্যবহৃত হচ্ছেনা। ফলে বায়ু দূষণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মেট্রোরেল অল্প সময়ে অধিক সংখ্যায় যাত্রী পরিবহন করবে বিধায় ছোট ছোট যানবাহনের ব্যবহার বহুল সংখ্যায় হ্রাস পেয়ে জীবাশ্ম ও তরল জ্বালানীর ব্যবহার হ্রাস পাবে। সার্বিকভাবে পরিবেশ দূষণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বরং পরিবেশ উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। সেজন্য বাংলাদেশে মেট্রোরেলের বিষয়টি ভাবতেই গর্ববোধ করছি। 

আজিজ মাহমুদ 
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ
ঢাকা কলেজ


সর্বশেষ সংবাদ