১৪ এপ্রিল ২০২০, ১৭:৪১

করোনার থাবায় ফাঁকা ক্যাম্পাসগুলোতে নেই বৈশাখের ছোঁয়া

বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা নতুন মাত্রা যোগ করে। এদিন ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীদের বেশ আনাগোনা থাকে। এবার করোনার থাবায় ক্যাম্পাসে সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। আজ চারুকলার সামনে তোলা ছবিটি।  © টিডিসি ফটো

আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনধারার জ্বলন্ত প্রদীপ বাংলা নববর্ষ। সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দিতে বৈশাখের অবদান অনস্বীকার্য। শুধু তাই নয়, বাংলা নববর্ষ বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব, বাঙ্গালীর নিজস্ব উৎসব। এই দিনটিতে বাংলার মানুষ মেতে উঠে বর্ণিল উৎসব আর উচ্ছ্বাসে। বৈশাখের রং-তুলিতে ফুটে উঠে বাঙলার চিরচেনা রূপবৈচিত্র্য। 

গ্রাম-শহরে হালখাতা আর বৈশাখী সাজ প্রত্যেকের মনের ভিতরে একে দেয় তুলির আলপনা। বিভিন্ন হাঁটে-বাজারে বসে বৈশাখী মেলা। বাংলার প্রাচীন আর ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন শিল্পের সৌখিন মেলা যেন সবাইকে শিহরিত করে দেয়। বিভিন্ন বাহারি রকমের খাবার, খেলনা সবার হৃদয় ছুয়ে দেয় মুহুর্তেই। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন, সংস্কৃতির মুখর সময় সবাইকে নিয়ে যায় কোন এক স্বপ্নপূরীর দেশে। সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ সবার জীবনে হয়ে উঠে এক অপূর্ব রঙধনু। শহুরে মানুষের বাহারি সাজ, আর পান্তা ইলিশ খাওয়ার ধুম প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলে নকশিকাঁথার মাঠের মতো। 

তবে বৈশাখের অপরূপ সব সৌন্দর্য, বর্ণিল রংয়ের রঙধনু, আবির ছড়ানো রংয়ের মেলার এক জাদুকরী ছোঁয়া মনে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই বেশি। বৈশাখ শুরুর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটগুলোর সময় কাটে নির্ঘুম ব্যস্ততায়, থাকে না দম ফেলার ফুসরত। এসব ইনস্টিটিটের শিক্ষার্থীরা রাতদিন এক করে প্রস্তুতি নেয় মঙ্গল শোভাযাত্রার। আর দেয়ালে দেয়ালে চিত্রাঙ্কান করে সাজিয়ে নেয় বৈশাখী সাজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য নিজেকে শেষবারের ঝালিয়ে তোলে। তারপর বছরের প্রথম দিনে তাদের বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রায় সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব ধরণের মানুষ একসাথে মিশে যায় প্রাণের উচ্ছ্বাসে, প্রাণের বন্ধনে। শোভাযাত্রার জন্য তৈরী করা বাহারি ডিজাইের, রঙের-ঢঙ্গের নকশা করা সবকিছু যেন জীবন্ত করে তোলে সকলের জীর্ণতাকে। বিভিন্ন দেয়ালে চিত্রাঙ্কনে ফুটে উঠে হাজার বছরের বাংলার চিরচেনা রূপ। সাংস্কৃতিক উৎসব হারিয়ে নিয়ে যায় কোন এক অজানা দেশে। 

কিন্তু মহামারী করোনাভাইরাসের থাবায় নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে বৈশাখের আমেজ। বাংলার ৫০০ বছরের পুরোনো উৎসব প্রথমবারের মতো থমকে দিয়েছে গোটা বাংলাদেশকে। খাঁ খাঁ শূন্যতা বিরাজ করছে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কোলাহলপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নববর্ষের মতো রঙ্গিন উৎসবেও নেই প্রানের ছোঁয়া। নিস্তব্ধতা, নিরবতা, শব্দহীন, নির্জীব দাঁড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নেই কোলাহল, প্রাণের বন্ধন, আনন্দ, উচ্ছ্বাস, ব্যস্ততা। নেই জীবনের রং, ছুটে চলা, প্রাণে প্রাণে মেতে উঠা, স্বপ্নীল রংয়ের ছোঁয়া। এমন পানসে জীবন আর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ক্যাম্পাসের বর্ণীল সময়কে স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তুলেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আল-আমিন শেখ বলেন, বাঙালির জীবনে আজ নতুন বছরের প্রথম দিন।প্রতিবছর এই দিনটিকে ঘিরে অনেক প্রস্তুতি থাকে। অথচ এবার বন্ধী জীবন কাটাতে হচ্ছে। এটা সহ্য করার মতো নয়। করোনা মহামারীর কারণে বৈশ্বিক এই দুর্যোগের সময় আমাদের জীবন অবরুদ্ধ। ঘরে বসেই দেশের মানুষ মোকাবেলা করছে এই মহামারী। তাই এই বৈশাখটা সবাই ঘরে বসে নিজেদের মতো করে কাটানো ছাড়া কিছু করার নেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী প্রমা আক্তার বলেন, পহেলা বৈশাখ আসার কিছুদিন আগে থেকেই গাণের ব্যাপক চর্চা শুরু হতো। কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সময় কাটলেও আলাদা একটা আনন্দ মনের ভিতরে কাজ করতো। দিনের শুরুটা পান্তা-ইলিশ খেয়ে সবার সাথে মজা করার মধ্য দিয়ে কাটতো। শাড়ি পড়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে খুব ভালো লাগতো। তারপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেকে অদৃশ্য খুঁশির দেশে হারিয়ে ফেলতাম। আজকে খুব কঠিন দিন পার করছি। সেই সোনালী সময়ের কথা মনে করতেই খুব কষ্ট লাগছে। যেহেতু দুর্দিন চলছে এখন তাই নিজেকে সামলে নিচ্ছি, সামনে আবারো সুদিন আসবে সেই অপেক্ষায় রইলাম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুনযির এম সা’দ বলেন, অন্যান্য জাতীয় উৎসবের মতোই চবির বর্ণিল একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ। হাজারো প্রস্তুতি, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহের নানা দৌড়ঝাঁপ ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু এ বছর কিছুই হচ্ছে না। চারদিক ফাঁকা। নেই জারুল তলা কিংবা রব হলের মাঠে বাউল সঙ্গীত কিংবা বলি খেলা বা বাউচি খেলা। নেই ব্যান্ডের আকাশ প্রকম্পিত উল্লাস কিংবা মঙ্গলশোভা যাত্রা। তবে এবার আমরা চাই যেন এই ত্যাগের মাধ্যমেই ভালো থাকুক সবাই।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এম ডি নুরুল মোস্তফা বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের বাঙ্গালীদের জন্য বিশেষ একটি দিন। এই নববর্ষ প্রতিবারেই নতুন রূপে ফিরে আসে উৎসবে ও মনে । কিন্তু বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনার কারণে এবারের নববর্ষে নেই কোন উৎসব আর আমেজ। সবাই মিলে নববর্ষের প্রস্তুতি, সকালে সকালে ক্যাম্পাসে ছুটে চলা, বিভাগ এবং ক্লাবগুলোর মজার মজার খাবারের স্টল, বৈশাখী মেলা, গান আর নাটকের আসর, নানা রকম খেলা কিংবা প্রতিযোগিতা ইত্যাদি কুবি ক্যাম্পাসের বৈশাখীর সজীব আমেজ আজকে অনেক মিস করতেছি। সেই আনন্দক্ষণের স্মৃতিকথা মনে করেই কাটাতে হচ্ছে এবারের নববর্ষ। আমরা আবারো মিলবো প্রাণের উচ্ছ্বাসে তার জন্য আমাদের মহামারী ঠেকতাে হবে ঘরে বসে অপেক্ষা করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান কুতুবী বলেন, করোনার কালো থাবায় পহেলা বৈশাখের বর্ণিল সেই দিন আজ বিবর্ণ। পুরো মানবজাতি আজ ঘরবন্দী, চারদিকে মৃত্যুর হাতছানি, বাড়ছে লাশের মিছিল। বুকের ভিতর এক শূন্যতা বিরাজ করছে, খুব মিস করছি প্রিয় ক্যাম্পাস এবং ক্যাম্পাসের মানুষগুলোকে। তবুও মহামারী ঠেকাতে এইবারের পহেলা বৈশাখ নাই বা পালন করি। চলুন সবাই ঘরে থাকি, নিরাপদ থাকি, দেশটাকে নিরাপদ রাখি।

সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী শারমিন কবিতা বলেন, এবারের নববর্ষ বাংলার খোলা প্রান্তের নয়। আমাদরে ক্যাম্পাসকে আমরা যারা বৈশাখী সাজে সজ্জিত করতাম, তাদের বৈশাখ দুই তিনদিন আগে থেকে শুরু হয়ে যেত। আজ পহেলা বৈশাখ চলে যাচ্ছে অথচ চারুকলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আমার মতো এমন একজনকে হাত-পা গুটিয়ে জড় পদার্থের মতো বসে থাকতে হচ্ছে। বাকিদের তাহলে কি অবস্থা হতে পারে বলার বাহিরে। বাংলায় আবার সুদিন ফিরবে, তার জন্য আমাদের ধৈর্য ধরে থাকতে হবে।

বৈশাখ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেদনার্ত, কষ্টার্ত অনুভূতি থাকলেও সবাই সুদিনের স্বপ্নে বিভোর। সবার একটাই ভাবনা যতই খারাপ লাগা থাকুক, এই মহামারী দূর করে আবারো নতুন করে মেতে উঠবে প্রাণের ক্যাম্পাসে। প্রাণের উচ্ছ্বাসে আবারো তারা প্রানে প্রাণে মিলবে একসাথে। ক্যাম্পাস পাবে তার পূর্ণ যৌবন। ততদিন পর্যন্ত সবাইকে ঘরে থাকতে, নিরাপদে থাকতে জোর দিয়েছেন সবাই। ভয় নয়, সচেতনতাই হোক করোনায় জয়। দুঃখ নয়, অপেক্ষায় হোক সর্বময়।