ভুতুড়ে শাটল ট্রেন!
কাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভর্তি পরীক্ষা শুরু। এলাকা থেকে কয়েকজন পরীক্ষার্থী আসার ব্যাপারে অনেক আগেই যোগাযোগ করেছিলো। তারা ইতোমধ্যে এসে পড়েছে। কিন্তু এ বছর সব পরীক্ষা ক্যাম্পাসে হওয়াতে ওদেরকে ক্যাম্পাসেই থাকতে বলেছিলাম। পরামর্শনুযায়ী তারা ক্যাম্পাসেই উঠেছিলো। ভাবলাম কি ব্যবস্থা হলো না হলো, খোঁজখবর নেওয়া দরকার। তাই ওদেরকে দেখে আসার জন্য ক্যাম্পাসে যাবো ভাবছি। তাছাড়া ক্যাম্পাসে নিজেরও টুকটাক কিছু কাজ ছিলো সেটাও সেরে নেয়া যাবে। যাইহোক যেই ভাবনা সেই কাজ। বিকাল তিনটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ষোলশহর স্টেশনে এসে শাটল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমি, হাফিজ আর রহমান। যথাসময়ে ৩টা ১০ মিনিটে ট্রেন এসে হাজির হলো স্টেশনে। আশেপাশে অনেক পরীক্ষার্থী দেখে ভাবলাম সীট নাও পেতে পারি। কাজেই যত দ্রুত ওঠা যায় তাতেই মঙ্গল। শেষে অনেক ঝাক্কিঝামেলা পার করে সীট পেলাম। তবে একটু পরেই বুঝতে পারলাম যতটা ঝামেলা হবে ভেবেছিলাম তার অর্ধেকও নেই। যাই হোক, ট্রেন ছেড়েছে। ট্রেনের গতিতে ট্রেন চলছিলো। চল্লিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে ভার্সিটিতে এসে পৌঁছালাম। শতশত শিক্ষার্থীর আগমণে কিছুক্ষণের জন্য আবারও ভরে উঠলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন চত্বর। সবাই সবার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে যেতে লাগলো। অনেকে আবার বন্ধুবান্ধবকে খুঁজে নিচ্ছিলো। কেউবা আবার দীর্ঘ অপেক্ষার পর ট্রেন আসার সাথে সাথেই মোবাইল হাতে সরব ছিলো। এভাবে ধীরে ধীরে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশন চত্বর ফাঁকা হয়ে গেলো। আমরাও যার যার কাজে চলে যেতে লাগলাম। তবে যাওয়ার আগে সবার একটাই কথা ‘শহরে যদি যাস ফোন দিস, আমিও যাবো। আর রাতের ট্রেনে গেলে তো দেখা হবেই’। হ্যাঁ, সবার মত আমিও একই কথা বলে বিদায় নিলাম। যদিও আজকে ক্যাম্পাসেই থেকে যেতে ইচ্ছে করছিলো আমার। কারণ, কাল সকালে আবার আসতে হতে পারে। যাইহোক, কিছু কাজ ছিলো, সেগুলো শেষ করে ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করলাম সৈকত আর ইমামের সাথে। ঘুরোঘুরির একপর্যায়ে সৈকত ওর রুমে যেতে বললো, ভাবলাম যাওয়া যাক। সৈকত এ এফ রহমান হলে থাকে। ওর রুমে আগে কখনো যাওয়া হয়নি। তাই আজকেই প্রথম যাচ্ছি। গিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থী আছে ওর রুমে। যদিও রুমে দুটো চৌকি আছে মাত্র। ভাবছিলাম ৪/৫ জন মানুষ কিভাবে থাকবে এখানে? সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় মাথায় আসলো। আরে! হলের সব রুমেই তো একই অবস্থা। হ্যাঁ, পরীক্ষা চলাকালীন এই কয়েকদিন হলের সবাই এভাবেই কষ্ট করে থাকবে। এসব হাবিজাবি ভাবছিলাম, হঠাৎ একজন সিনিয়র ভাই এসে সৈকতকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ছোট ভাই তোমার রুমে কি থাকতে পারমু?’ বুঝতে কষ্ট হলো না আমার, যে পরীক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে উনি হয়তো নিজের থাকার জায়গাটাই খুইয়েছেন। মনের অজান্তেই অনেকবেশি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম বড় ভাইদের প্রতি। এবার নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম, না আজকে ক্যাম্পাসে থাকাটা ঠিক হবে না। আমি থাকা মানেই নিশ্চিত আরেকজন কষ্ট করবে। তাই বন্ধু হাফিজকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, শহরে যাবি নাকি? হাফিজ বললো ‘স্টেশনেই আছি, চলে আয়। একা একা বসে থাকার চেয়ে বরং গল্প করি’। স্টেশনের দিকে রওনা হলাম । ফোনে কথা বলে খুঁজে বের করলাম ওকে। গল্প করতে করতে ট্রেনের অপেক্ষা করছিলাম দুজনে । গল্পের সুবাদে আধঘণ্টা সময় বেশ তাড়াতাড়িই পার হয়ে গেলো। হঠাৎ চিরচেনা শাটলের হর্নে শিক্ষার্থীদের ছোটাছুটি লক্ষ্য করলাম। আমরাও উঠে দাঁড়ালাম। এমন সময় বন্ধু রহমানের সঙ্গে দেখা। রহমানও শহরে যাবে। ঠিক আছে একসাথেই যাই তাহলে। এরপর আবারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যত দ্রুত ওঠা যায় ট্রেনে। কিন্তু রাতের সর্বশেষ ট্রেন হওয়ায় শহরে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই কম। তার উপর ক্যাম্পাসে পরীক্ষা হওয়ায় সবাই এখন ক্যাম্পাসেই থাকবে। তাই আর তাড়াহুড়ো না করে ধীরে সুস্থে উঠে জানালার পাশেই বসলাম। হাফিজকে বললাম জানালার পাশে বসতে। ও বললো, ‘গলা ব্যথা’। যেহেতু মোটামুটি ঠাণ্ডা পড়ছিলো, জানালার পাশে না বসাই ওর জন্য ভালো। ঠিক আছে তাহলে, যেভাবে ভালো হয়। এই বলে নিজের মত করে বসে পড়লাম সবাই। কিছুক্ষণ পর আবারও শাটলের ভয়ংকর হর্নটা বেজে উঠলো। বুঝলাম ট্রেনটা চেড়ে যাবে এখন। একটু পরেই ট্রেনটা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটতে লাগলো। সবাই গল্প করছিলো বন্ধু বান্ধবের সাথে। পুরো ট্রেনের ভিতরে কারো হাসির আওয়াজ, কারো গানের আওয়াজ, আবার কারো গুনগুন কথার আওয়াজ। আমরাও অনেক গল্প করছিলাম। একপর্যায়ে ধীরে ধীরে সবার কথা কমে যাচ্ছিলো। হয়তো সবার কথা ফুরিয়ে এসেছে। তাই সবাই চুপ হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ হয়তো চোখটা বন্ধ করে একটু শান্তির ভ্রমণে বেরিয়েছে এখন। হ্যাঁ, ইতোমধ্যে ট্রেনের বগিগুলো নিশ্চুপ হয়ে গেছে। এখন শুধু ট্রেনের ঝিকঝিক ঝিকঝিক শব্দটাই শোনা যাচ্ছে। ট্রেনের ভিতরে অনেক বেশি অন্ধকার হয়ে আছে। কোনো বাতিও জ্বলছে না। মোবাইলের আলো গুলো অনেকটা নিভে গেছে। অন্ধকার ট্রেনটা ছুটে চলছিলো আরো ভয়ংকর অন্ধকারের দিকে। বারবার মনে হচ্ছিলো, এই বুঝি এলোমেলো গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের ভিতর ঢুকে যাবে ট্রেনটা। না না আবার কেটে পড়েছে গাছের লতাপাতা ঘেঁষেই। একটু একটু ভয়ও হচ্ছিলো নিজের ভিতর। কিছুক্ষণের জন্য আমিও চোখটা বন্ধ করে কিছু একটা ভাবলাম। আর তাতেই কোনো এক ভুতুড়ে শাটল ট্রেনের গন্ধ পেলাম। ভয়ংকর এক গন্ধ!