জাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ফলাফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে দুই শিক্ষক!
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনায় দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করেন বলে অভিযোগ তুলে বিভাগের একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। পছন্দের শিক্ষার্থীরা সর্বাধিক নম্বর পান তাদের কোর্সে। তবে একটি কোর্সের খাতা পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা হয়। এতে ওই কোর্সে শিক্ষার্থীরা তাদের মান অনুযায়ী প্রকৃত নম্বর পান। এতে ওই কোর্সটির কারণে শিক্ষার্থীদের গড় সিজিপিএ পিছিয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে।
অভিযুক্ত শিক্ষকরা হলেন-সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মঈনুল হাসনাত রানা ও সহকারি অধ্যাপক আলী আকবর। তারা দু’জন আগে থেকেই নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে কাকে কত নম্বর দেওয়া হবে তা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। ২০১৫-১৬ সেশনের ৪১ ব্যাচের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা ফলাফল বিপর্যয়ের অভিযোগ তুলে। অনুসন্ধানে এসব বিষয় উঠে আসে।
উল্লেখ্য, অভিযুক্ত শিক্ষকরা নিজের পছন্দের শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নম্বব দিতেন। সেই সাথে নিজেকে প্রশ্নমুক্ত রাখতে সবাইকে একটু বেশি নম্বর দিতেন। কিন্তু এবারে তাদের মধ্যে একজন শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাহিরে যাওয়ায় সেই কোর্সটিতে সবাই তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছেন। এছাড়া অভিযুক্ত আরেক শিক্ষকের ২০টি খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে গেছে। ফলে ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। আসলে আগে থেকেই সেই বিভাগে নিজের পছন্দের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক বানানেরা জন্য রেজাল্ট ভালো করার চেষ্টা করতেন অভিযুক্ত সেই দুই শিক্ষক।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খাতার মান অনুযায়ী শিক্ষার্থীকে নম্বর প্রদান করলে ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনাটি ঘটে না। নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ব্যক্তি পরিচয়ে নম্বর প্রদান না করে খাতার মান অনুযায়ী নম্বর প্রদান করা উচিৎ। কিন্তু বিভাগে ব্যক্তি পরিচয়ে নম্বর প্রদান করা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিনত হয়েছে। তাদের কারণে খাতা মূল্যায়নে ভাল শিক্ষকরা বরাবরই বিতর্কিত হচ্ছেন। ওই দুই শিক্ষক ও তাদের অনুগত শিক্ষার্থীদের ভয়ে শিক্ষার্থীরা অন্য কোন শিক্ষকের কাছে যেতে পারেন না। অন্য শিক্ষকের কাছে গেলে তাদেরকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নম্বর কম প্রদান করা হয়। তারা আরো জানান, দুই একজন শিক্ষকের কারণে বিভাগের অন্য ভাল শিক্ষকদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটি তদন্ত কমিটি করা উচিত।
জানা যায়, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তিনটি বাধ্যতামূলক কোর্স ও ২টি ঐচ্ছিক কোর্স থাকে। তবে যারা থিসিস গ্রুপের শিক্ষার্থী তারা কেবল একটি ঐচ্ছিক কোর্স নিয়ে কোন শিক্ষকের অধীনে থিসিস সম্পূর্ন করে জমা দেন। নন-থিসিসের শিক্ষার্থীরা ৫টি কোর্স সস্পূর্ণ করতে হয়। বাধ্যতামূলক কোর্সের শিক্ষকরা হলেন, অধ্যাপক মো. আবদল্লাহ হেল কাফি, সহযোগী অধ্যাপক তাসমিয়া পারসূব ও সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মঈনুল হাসনাত রানা।
তবে ঐচ্ছিক কোর্সের শিক্ষকরা হলেন- অধ্যাপক মো. খালিদ কুদ্দুস, অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, সহকারী অধ্যাপক আলী আকবর ও মীর মাসুদুল আলম চয়ন। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক খালিদ কুদ্দুস ও আলী আকবরের কোর্স নিয়ে থাকেন। এছাড়া মীর মাসুদুল আলমের কোর্স পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করায় তার কোর্সটি সংখ্যায় খুব কম শিক্ষার্থী নেন। অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ পুঙ্খানুপুঙ্খ খাতা মূল্যায়নের কারণে তার কোর্স কোন শিক্ষার্থী নেন না বলে জানা যায়।
তাসমিয়া পারসূবের কোর্সটি বাধ্যতামূলক হওয়ায় অনিচ্ছা সত্বেও শিক্ষার্থীরা নিয়ে থাকেন। কারণ ওই কোর্সটির পরীক্ষার খাতা তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন, খাতার মান অনুযায়ী নম্বর প্রদান ও ব্যক্তিগত আক্রমন হতে বিরত থাকেন। যার কারণে শিক্ষার্থীরা অন্যান্য কোর্সের চেয়ে কম নম্বর পান। তবে অধ্যাপক মো. আব্দুল্লাহ হেল কাফী ও অধ্যাপক মো. খালিদ কুদ্দুস কোন শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে নম্বর প্রদান করেন না। তবে তারা সকল শিক্ষার্থীকে পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়নে প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে বেশি নম্বর প্রদান করেন। যাতে শিক্ষার্থীরা ফলাফল ভাল করতে পারে। সহকারী অধ্যাপক মীর মাসুদুল আলম চয়ন তার কোর্সের খাতা পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করেন। তিনি কোন শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগত আক্রমন করে নম্বর প্রদান করে না। তবে মঈনুল হাসনাত রানা ও আলী আকবর তাদের কোর্সে পছন্দের শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ নম্বর প্রদান করে। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে বেশি নম্বর প্রদান করে। তবে তাদের কোর্সগুলো দ্বিতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হলে নম্বরের বিস্তর ব্যবধান হয়।
২০১৪-১৫ সেশনের ৪০ ব্যাচের স্নাতকোত্তর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলী আকবরের কোর্সে তার পছন্দের ছাত্রী তাসনোভা রহমান নোভা ও শরীফুন্নাহার পপিকে লিখিত পরীক্ষায় ৮০ নম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর ৬৫ করে দেওয়া হয়। অন্য সকলের নম্বর ৬০ এর নিচে। স্বজনপ্রীতি ও অতিরিক্ত নম্বর প্রদানের কারণে তার কোর্সের ২০টি খাতা তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়। শিক্ষকরা জানান, কোর্স শিক্ষক ও দ্বিতীয় পরীক্ষকের খাতা মূল্যায়নে দুইজনের দেওয়া নম্বরের গড় পার্থক্য ১৬ শতাংশের বেশি হলে তৃতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়।
মঈনুল হাসনাত রানা ৫০২ নং কোর্সে তাসনোভা রহমান নোভাকে সর্বোচ্চ নম্বর ৬৫ প্রদান করে। তবে তার কোর্সে ৬০ নম্বরের উপরে পেয়েছে ৫-৬জন এবং বাকীদের নম্বর ৫৫ এর নীচে। অন্যদিকে মঈনুল হাসনাত রানা ও আলী আকবরের পছন্দের প্রার্থী ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ৪১ ব্যাচের তোফায়েল আহমেদ ও ইসমাইল মোর্শেদ।
মঈনুল হাসনাত রানা উচ্চতর ডিগ্রি করতে দেশের বাইরে যাওয়ার আগে দুই শিক্ষার্থীকে টিউটোরিয়ালে ১৭ করে দিয়ে যান। পরে কোর্সটি মূল্যায়ন করেন সহযোগী অধ্যাপক নুসরাত জাহান। দ্বিতীয় পরীক্ষক হিসেবে মূল্যায়ন করেন তাসমিয়া পারসূব। তবে তাদের নম্বরের ব্যবধান ২-৩ এর মধ্যে। একই শিক্ষাবর্ষের আলী আকবরের ৫০৪ নং কোর্সে ইসমাঈল মোর্শেদ ৮০ নম্বরের মধ্যে ৬৮ নম্বর পান। ওই শিক্ষার্থী দ্বিতীয় পরীক্ষকের কাছে পান ৫৫ নম্বর। দ্বিতীয় পরীক্ষক হিসেবে ছিলেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শামছুল আলম সেলিম।
ওই শিক্ষাবর্ষের তাসমিয়া পারসূবের কোর্সে সব শিক্ষার্থী তাদের খাতার মান অনুযায়ী প্রাপ্ত নম্বর পেয়েছেন। তবে অধ্যাপক আবদুল্লাহ হেল কাফী ও সহযোগী অধ্যাপক খালিদ কুদ্দুসের কোর্সে সকলেই ভাল নম্বর পান।
এসব বিষয়ে আলী আকবর বলেন, আমি যা যৌক্তিক মনে করেছি তা প্রদান করেছি। কারো প্রতি কোন অবিচার করিনি। তবে খাতা পূনর্মূল্যায়নের বিষয়ে আমি জানি না। সেটা পরীক্ষা কমিটি বলতে পারবে।
বিভাগের সভাপতি খালিদ কুদ্দুস সাংবাদিকদের বলেন, এসব বিষয়ে আমার জানা নেই। নম্বর প্রদানের বিষয়টি শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিষয়। তাসমিয়া পারসূব বলেন, আমি খাতায় নম্বর কম প্রদান করেছি কিনা তা আমার জানা নেই। সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ মঈনুল হাসনাত রানা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাহিরে অবস্থান করায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।