০৯ মার্চ ২০২৬, ০৮:০০

বিশ্ববাজারে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তেলের দাম, ব্যারেলে ছাড়াল ১০০ ডলার

তেল টার্মিনালে একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাঙ্কার  © সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত চার বছরের মধ্যে এই প্রথম বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।

শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে লেনদেন শুরুর পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৬.৫ শতাংশ বেড়ে ১০৭.৯৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত শুক্রবার এর সমাপনী মূল্য ছিল ৯২.৬৯ ডলার। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৬.৯ শতাংশ বেড়ে ১০৬.২২ ডলারে পৌঁছেছে। এটি শুক্রবার ছিল ৯০ দশমিক ৯০ ডলার। সোমবার লেনদেনের শুরুতে এই দাম ১১১ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। বাজার লেনদেন চলতে থাকায় দাম আরও বাড়তে বা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল। যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও স্থাপনাগুলো সংঘাতের মধ্যে পড়ে যাওয়ায় এই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ও পরিবহনের প্রধান পথগুলো সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ (দৈনিক প্রায় ১.৫ কোটি ব্যারেল) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার আশঙ্কায় এই রুটে ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও কাতার থেকে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রপ্তানি করতে না পারায় কুয়েত, ইরাক ও আরব আমিরাত তাদের তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘ইফতারের সময় আকুতি-মিনতি করেছি, একটু পানিও দেয়নি পুলিশ’

রপ্তানি কমে যাওয়ায় সংরক্ষণ ট্যাংক পূর্ণ হয়ে পড়ছে। এ কারণে ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের তেল উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বিভিন্ন তেল ও গ্যাস স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।

সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল ২০২২ সালের ৩০ জুন, তখন দাম ছিল ১০৫ দশমিক ৭৬ ডলার। আর ব্রেন্ট ক্রুড সর্বশেষ ২০২২ সালের ২৯ জুলাই ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারে পৌঁছেছিল।

এদিকে ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের জেরে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ৩.৪৫ ডলারে পৌঁছেছে এবং ডিজেলের দাম গ্যালন প্রতি ৪.৬৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। যদিও মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট আশা প্রকাশ করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তেলের দাম ৩ ডলারের নিচে নেমে আসবে।

তিনি সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘খুব বেশি সময় লাগবে না যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম আবারও গ্যালনপ্রতি ৩ ডলারের নিচে নেমে আসবে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও এই সংকট কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়ার কথা নয়।’

বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের অনেকে সতর্ক করে বলেছেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রবিবার সকালে তেহরানের তেল ডিপো এবং পেট্রোলিয়াম টার্মিনালে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪ জন নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, এসব স্থাপনা ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে ব্যবহৃত জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহার করছিল। এর মধ্যেই ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন এসেছে। নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার পুত্র মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে তেহরানের কঠোর মনোভাব বজায় থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব তেল শিল্পে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে, যার বেশিরভাগই যায় চীনে। যুদ্ধের কারণে এই রপ্তানি ব্যাহত হলে চীনকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হতে পারে, এর কারণে জ্বালানি বাজারে দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এছাড়াও যুদ্ধের প্রভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও কিছুটা বেড়েছে। রবিবার রাতে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ ডলার, এটি শুক্রবারের ৩ দশমিক ১৯ ডলারের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। গত সপ্তাহে গ্যাসের দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছিল।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী নতুন কোনো সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পও বলেছেন, ‘ইরানের সামরিক বাহিনী ও শাসকগোষ্ঠী পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ শেষ নাও হতে পারে।’ তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি