‘অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় চেতনা হলো যেকেনো অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত ছাত্রজনতার প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর ও তার অনুসারীদের ওপর ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে তা অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে ড. আসিফ নজরুল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধির উপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে এটা নজিরবিহীন তো বটেই, একটা ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এর প্রতিবাদ জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি সরকার ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেফতার করেছে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দেয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটাকে সাধুবাদ জানাতে চাই। এর সাথে সাথেই এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই—এটা কি আইওয়াশ নাকি সত্যি কোন পদক্ষেপ? আই ওয়াশ ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে। এর কারণ হলো—এই হামলার পিছনে যাদের নাম এসেছে পত্রিকায় তাদের অনেককে গ্রেফতার করা হয় নাই। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সন্দেহের পেছনে দুই নম্বর জানিয়ে তিনি বলেন, আক্রমণকারীদের যে ভিডিও ফুটেজ সেটাকে গায়েব করে দেয়া হয়েছে। আমরা এর আগে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের নৃশংস-বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। সে হামলার জন্য ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের ধরে নিয়ে অকথ্য অত্যাচার করা হয়। অনেক পেইন দেয়া হয়, অনেক মামলা দেয়া হয়। সেই হামলার ফুটেজ কোথায়, তারা যখন এ দাবি করেন তখন সেই ফুটেজ কেন পাওয়া যায় না? এরকম ঘটনা ঘটলে আমাদের সন্দেহ করার কারণ আছে যে, ছাত্রদের ক্ষোভকে প্রশমিত করার জন্য সরকার আই ওয়াশ হিসেবে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এর সাথে সাথে তিনি বলেন, আমি আশা করি আমার বক্তব্য যাতে ভুল প্রমাণিত হয়। এই ন্যাক্কারজনক হামলায় যারা দায়ী তাদের প্রত্যেককে যেন আইন অনুযায়ী বিচার করা হয়।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি ডাকসুর ভিপি নুরকে বিভিন্নভাবে হুঁশিয়ার দেয়া হচ্ছে—এই বিষয়ে কথা বলা যাবে, এই বিষয়ে কথা বলা যাবে না। যারা এধরনের হুঁশিয়ার দেন দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে তাদের মধ্যে ছাত্রআন্দোলনের অনেক বড় বড় নেতা রয়েছেন। আমি তাদের কাছে প্রশ্ন তুলতে চাই, ছাত্ররাজনীতি জনগণের স্বার্থের ব্যাপারে যদি প্রশ্ন না করত তাহলে কি দেশে মুক্তিযুদ্ধ হতো? তাহলে কি দেশে এরশাদের পতন হত? ১/১১ তে আপনাদের সবাইকে জেলে ভরে রাখা হয়েছিল ছাত্ররা যদি আপনাদের পক্ষে কথা না বলতো আজকে আপনারা বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে পারতেন?
এ সময় তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, বাংলাদেশের কোন সংবিধানে লেখা আছে যে, ছাত্ররা এই বিষয়ে কথা বলতে পারবে এই বিষয়ে কথা বলতে পারবে না। এ সকল হাস্যকর কথাবার্তা এবং আপনাদের উদ্দেশ্য আপনাদের অতীত রাজনীতি সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সরকার দলের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে ঢাবির এই শিক্ষক বলেন, যখনই ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বলা হয় তখন আপনারা এত বেশি অতীষ্ঠ হয়ে যান কেন? আমার কথা হচ্ছে এগুলো তো ভারতের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা না, ভারত রাষ্ট্রের একটা নীতির বিরুদ্ধে কথা। ভারতের সীমান্তে যদি বাংলাদেশের মানুষ মারা যায়, আমরা যদি নদীর পানি না পাই যদি বিনা ফিতে ট্রানজিট দিয়ে দেয়া হয়, যদি বাংলাদেশকে অপমান করে কথা বলা হয়, যদি এনআরসির নামে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাংলাদেশের ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে বাংলাদেশের যেকোনো মানুষের অধিকার রয়েছে এটা নিয়ে কথা বলার। আপনাদের যত ইচ্ছা ভারতের পক্ষে কথা বলুন, তারা কি দিলেন সেটা নিয়ে আপনারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান, কিন্তু আপনারা যখন আত্মহারা হতে পারেন যেকোনো মানুষের দেশের স্বার্থে প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমরা শিক্ষকেরা কেউ ধোয়া তুলসী পাতা না আমাদের মধ্যে দলাদলি আছে। কিন্তু সব কিছুর সীমা আছে। আপনারা সীমালংঘন করে যাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একজন ছাত্রকে যখন নির্মমভাবে পেটানো হচ্ছিল প্রক্টর তখন তাকে পুলিশে দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এর চেয়ে ন্যাক্কারজনক আর দুঃখজনক ঘটনা হতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন টেনে ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় চেতনা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। দেশের পক্ষে দাঁড়ানো। দেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো। যারা দেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে দেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছে তাদের মধ্যে আছেন নুরুল হক নুর। তারা হচ্ছেন ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীবৃন্দ, বাম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীরা।
তিনি বলেন, আজকে মুক্তিযুদ্ধের নাম নিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভালোভাবে ধারণ করছে তাদের উপর আক্রমণ করছে। আপনারা ভয় পাবেন না। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় চেতনাই হচ্ছে যে কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।
ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে সংহতি জ্ঞাপন করেন, ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পার্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদাউস, আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, ঢাবি শামসুন্নাহার হলের ভিপি শেখ তাসনীম আফরোজ ইমি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকী, জাতীয় গণফ্রন্ট-এর সমন্বয়ক টিপু বিশ্বাস, জাসদ ছাত্রলীগ, মুক্তিফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল), সমাজতন্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, স্বতন্ত্রজোটের ডাকসুর ভিপি প্রার্থী অরনি সেমন্তী খান।