দু’ঘন্টা পর মুক্ত ‘অবরুদ্ধ’ ডাকসু ভিপি নুর ও সহপাঠীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ অবরুদ্ধ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। এসময় ডাকসুর স্বতন্ত্র ভিপিপ্রার্থী অরণী সেমন্তী খান, জিএসপ্রার্থী (সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী) উম্মে হাবিবা বেনজীরসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রী লাঞ্চিত হয়েছেন। হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান হোসেন রাসেল ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপসের নেতৃত্বে তাদের অবরুদ্ধ ও লাঞ্চিত করা হয় বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার বিকাল চারটার দিকে ওই হলের এক শিক্ষার্থীকে মেরে রক্তাক্ত করার ঘটনায় বিচার চাইতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওই হলের প্রভোস্ট ঘটনাস্থলে এসে তাদের নিয়ে আসেন। পরে ৭টা থেকে এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার চেয়ে ভিসির বাস ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে তারা। রাত সাড়ে ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারা ভিসির বাস ভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখায়।
জানা গেছে, সোমবার রাতে এসএম হলের ফরিদ হাসান নামের এক শিক্ষার্থী পিটিয়ে আহত করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ডাকসু নির্বাচনে ওই শিক্ষার্থী এসএম হল থেকে স্বতন্ত্র সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে ছাত্রলীগ নেতাদের হুমকির মুখে শেষ মুহূর্তে তিনি নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছিলেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি ফরিদের মাথায় ডান কানের পাশে ও চোখের উপরে জখম হয়েছে, সেখানে ৩২টি সেলাই পড়েছে। মঙ্গলবার বিকাল তিনটার পর এ হামলায় জড়িতদের বিচার দাবিতে নুরের নেতৃত্বে টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল বের করে। এ বিষয়ে এসএম হলের প্রাধ্যক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিতে মিছিলকারীরা ওই হলে ঢুকলে ছাত্রলীগ ও হল সংসদের নেতারা বাধা দেন বলে মিছিলে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ এর আহ্বায়ক হাসান আল মামুন জানান।
তিনি বলেন, নুর এসএম হলে প্রবেশ করার পরপরই হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি তাহসান হোসেন রাসেল ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপসের নেতৃত্বে তাদের অবরুদ্ধ করা হয়। এ সময় হল সংসদের অনুমতি না নিয়ে হলে প্রবেশ করায় নুরকে গালিগালাজ করেন হল সংসদের ভিপি কামাল হোসেন ও জিএস জুলিয়াস সিজার। এ সময় ভিপি নুরের সঙ্গে থাকা একজনকে মারধর করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। পরে কয়েকজন হল থেকে বেরিয়ে আসলে বাইরেও তাদের উপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়। এতে কয়েকজন ছাত্রীও লাঞ্ছিত হন।
এর পরে নুর হল প্রভোস্টের রুমে অবস্থান নিলে সেখানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। তখন সাংবাদিকরা ভেতরে প্রবেশ করতে গেলেও তাদের বিভিন্নভাবে কটু ভাষা ব্যবহার করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় ভিপিসহ অন্যান্যদের উদ্দেশ্যে ভেতর থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের গালি দিতে দেখা যায়।
পরে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুল আলম জোয়ার্দার তার কার্যালয়ে আসেন। সেখানে আগে থেকে উপস্থিত থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত করেন। এসময় হল প্রাধ্যক্ষ ঘটনা জানতে চাইলেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চিৎকার চেচামেচিতে কিছুই শুনতে দেননি। তখন ঘটনার বিচার চাইলে নূরুকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন গালি দিতে থাকে তারা। এরপর তারা প্রোভোস্টের রুম থেকে বের হতে গেলেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করে।
সেখান থেকে বেরিয়ে সাড়ে ৭টার দিকে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছে ভিপি নুর, রাশেদ খান ও ফারুক হাসানসহ তাদের সহপাঠীরা। এসময় ডাকসুর ভিপি নুর বলেন, আজকে রাতের মধ্যে প্রত্যেক হলের বহিরাগত এবং অছাত্রদের বের করতে হবে। নয়তো আমরা এখানে সারারাত বসে থাকবো। তিনি বলেন, আমরা সন্ত্রাসীদের বিচার চাই। সেই সঙ্গে অছাত্রদের হল থেকে বের করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বের না করা হবে এবং হামলার বিচার না হবে; ততক্ষণ পর্যন্ত অবস্থান করব।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানী বলেন, আমি সব শুনে ওই হলে প্রক্টরিয়াল টিম পাঠিয়েছিলাম। তারা বিষয়টা দেখবে। আর হল প্রাধ্যক্ষও আছেন। তিনিও দেখবেন। ছাত্রীরা কেন রাস্থায় নামবে? তাদের কোন অভিযোগ থাকলে তারা লিখিত দিতে পারত। আমরা এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এসএম হলের ঘটনায় তখন শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ কয়েকজনের উপর ডিম নিক্ষেপ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় তাকে বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিতও করা হয়। এ বিষয়ে আফরোজ ইমি বলেন, ফরিদের সঙ্গে কী হয়েছিল গতকাল রাতে তা আপনারা জানেন। আজ যখন আমরা প্রভোস্ট স্যারের কাছে স্মারকলিপি দিতে এসেছি, আমি একটা হলের নির্বাচিত ভিপি। আমি তাদের (ছাত্রলীগ) মতো কারচুপি করে নির্বাচিত হইনি। তারা আমার গায়েও ডিম মেরেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা এঘটনার বিচার চাই। ওখানে যারা ছিল আমি সবাইকে চিনি। এই হলের (এমএম হল) ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তাপস ছিল। সে নিজে একজন অছাত্র। সে আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছে।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে হল শাখা ছাত্রলীগের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস জানান, তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।