০৮ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩৮

মৌলিক অধিকার বঞ্চিত জিয়া হলের শিক্ষার্থীরা, নির্বাচনে আশার সঞ্চার

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল  © টিডিসি ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী হলগুলোর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল অন্যতম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ হলটি পড়ে আছে অযত্ন ও অবহেলায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিবছর হলের জন্য বাজেট আসলেও হল প্রশাসন দেয়ালে হালকা ঘষামাজার কাজ করে তাদের দায়িত্ব শেষ করে। জিয়া হলে প্রবেশ করতেই শিক্ষার্থীদের এ অভিযোগের প্রমাণ মেলে। সব হলের গেইট থাকলেও এ হলের কোনো গেইট নেই। শিক্ষার্থীরা জানান, হল প্রশাসন বারবার আশ্বাস দিলেও কোনো গায়েবি কারণে হল গেইট নির্মিত হয়নি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হলটি আবাসন সংকট, পাঠকক্ষ সংকট, ক্যান্টিনের নিম্ন মানের খাবার, নিরাপদ পানি, ভাঙ্গাচোরা অস্বাস্থ্যকর ওয়াশরুমসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। একটি কক্ষের মধ্যেই গেমসরুম, পত্রিকারুম, ডিবেটিং ক্লাব, কুইজ ক্লাব ও বাঁধনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে!

অফিস সূত্রে জানা গেছে, হলে ৪৮৫টি আসন থাকলেও অবস্থান করছেন প্রায় দেড় হাজারের মতো শিক্ষার্থী। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এত সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য রিডিং রুম মাত্র একটি যেখানে ৬০টির মতো ভাঙাচোরা সিট রয়েছে। নুরুল আশফাক নামে একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমরা এখানে এসেছি পড়াশোনার জন্য। কিন্তু হলের রিডিং রুমে জায়গা পাওয়া যায় না। সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতেও একই অবস্থা— এই বলে তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে আমরা যাবো কোথায়।

অন্যদিকে হল ক্যান্টিনের অবস্থা আরও শোচনীয়। খাবারের নিম্নমানের পাশাপাশি এখানে নিয়মিত টিকটিকি, তেলাপোকা ও শামুক পাওয়া যায় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। ফলে শিক্ষার্থীরা ভুগছেন অপুষ্টি, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন পেটের সমস্যায়। ক্যান্টিনের খাবারের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইউনুস নাদিম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, না খেয়ে থাকলে তো মারা যাবো। কোনো রকম বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে খেতে হয়।

ক্যান্টিনের খাবারে টিকটিকি

 

শিক্ষার্থীদের দাবি, হলে আবাসন সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এ হলে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্লক মিলিয়ে মোট এগারোটি গণরুম রয়েছে যেখানে প্রতিটি রুমে ২৫ থেকে ৩০জন করে শিক্ষার্থী থাকেন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরাও এসব অস্বাস্থ্যকর গণরুমে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে শিক্ষার্থীদের চর্মরোগ, জ্বর, সর্দিকাশিসহ নানা রোগবালাই সারা বছর লেগেই থাকে। এছাড়া সভাপতি ব্লকের গণরুমগুলোতে জায়গা না পেয়ে অনেকে রিডিং রুম ও মসজিদে ঘুমাতে বাধ্য হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

রিডিং রুমে গাদাগাদি করে ঘুমানোর দৃশ্য

রাকিবুল ইসলাম নামে একজন শিক্ষার্থী দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম, হলে উঠার পর স্বপ্ন গুলো স্বপ্নই রয়ে গেল। রাতে ঘুমানোর জন্য অপেক্ষা করতে হয় কখন রিডিং রুম খালি হবে। গণরুমে এক জন ছাত্র যে পরিমাণ জায়গা নিয়ে ঘুমায়, একজন মৃত ব্যক্তিও এরচেয়ে বেশি জায়গা নিয়ে থাকে! রিডিং রুমে পড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় কখন একটা চেয়ার খালি হবে।হল প্রশাসন এসব সমস্যা দেখেও না দেখার ভান করে আছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বিতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, রুমের অবস্থা খুব খারাপ। এছাড়া রাতে ছারপোকা ও মশার কামড়ে ঘুমাতে পারি না। ফলে সকালে ক্লাস করতে কষ্ট হয়ে যায়। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত সারা বছর তাদের দুর্দশা লেগেই থাকে বলে জানান তিনি।

এদিকে, ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন জিয়া হলের বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে আশার আলো জাগিয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, হল সংসদে যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়া পাওয়াগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরবেন। তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করবেন। হল সংসদের বিভিন্ন প্রার্থীরাও শিক্ষার্থীদের ধারে ধারে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন অঙ্গীকার করছেন।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ছাত্রলীগ মনোনীত প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী শরিফুল ইসলাম শাকিল দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের প্যানেল নির্বাচিত হলে গণরুমকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা; বহিরাগত মুক্ত হল; রিডিং রুম প্রসারিত করা; টিভি রুমের ভবনটি পাঁচ তলায় উপনীত করে সেখানে জিমনেশিয়াম, পত্রিকারুম ও গেমসরুম করা হবে। এছাড়াও তিনি হলের অতি গরীব দশজন শিক্ষার্থীকে পাঁচ মাস ফ্রিতে খাওয়ানোর প্রথা চালু করবেন বলে জানান।

অন্যদিকে ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী তারেক হাসান বলেন, আমরা নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা, আধুনিক লাইব্রেরি ও রিডিং রুম, জিমনেশিয়ামসহ জিয়া হলের সার্বিক উন্নয়নে আমরা শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে কাজ করে যাবো।