গ্রাজুয়েট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, স্বীকৃতি ইডেন কলেজের!
গ্রাজুয়েশন শেষ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, স্বীকৃতি পেলেন ইডেন মহিলা কলেজের নামে। সদ্য সমাপ্ত ৫১তম সমাবর্তন শেষে ভুলে ভরা এমন স্বীকৃতিই দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভুল যে প্রতিষ্ঠানের নামেই তা নয়; অনেকের সার্টিফিকেটে নিজ বিভাগের পরিবর্তে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের নাম। ভুল হয়েছে হলের নামেও। যা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারজ্জামানও। সোমবার দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, কিছু ভুলের কথা তিনিও শুনেছেন। এ ব্যাপারে কেউ যদি দরখাস্ত দেন, অবশ্যই তাদের সনদ ঠিক করে দেওয়া হবে।
তবে ভুলের বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি সার্টিফিকেট শাখার কেউ। বিষয়টি নিয়ে সার্টিফিকেট সেকশনে অবস্থানরত একাধিক সহকারি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কাছে জানতে চাইলে ‘বক্তব্য দিতে সমস্যা আছে’ জানিয়ে নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন তারা। যদিও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহলুল হক চৌধুরীর কার্যালয়ে একাধিকবার খোঁজ নিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কন্ট্রোলার অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে কথা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে খুব দ্রুতই এসব ভুল সংশোধন করা হবে। ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২১ হাজার শিক্ষার্থীর সনদ তৈরি করতে হয়েছে। এর বাইরেও আরো কিছু জরুরি সনদ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই দু-একটি ভুল হতে পারে। তবে বিষয়টির তদন্ত হওয়ার উচিত বলে তারা মনে করেন।
এদিকে সার্টিফিকেটে ইডেন কলেজের নাম আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট নাসরীন নাহার শেখ মিতা দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, সমাবর্তনের গাউন নিতে গিয়ে সমস্যাটি ধরা পড়ে। তিনি বলেন, কনভোকেশন বুকলেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে ইডেন মহিলা কলেজের তালিকায় নাম এসেছে তার। আশঙ্কা করছি, সার্টিফিকেটেও এই ভুল বহাল রয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের ভুল হলেও দেখে কষ্ট পাওয়ার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি নাম শুধরানোর জন্য ফের টেবিলে টেবিলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও আক্ষেপ করেন মিতা।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের নামে ভুলের পাশাপাশি একাধিক শিক্ষার্থীর সনদে নিজ বিভাগের স্থলে অন্য বিভাগের নাম আসা নিয়েও তোলপাড় শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। জানা যায়, আখতারুজ্জামান শাওন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অনার্স শেষে সমাবর্তনে যে সার্টিফিকেট হাতে পেয়েছেন, তা দেখে আঁতকে উঠেছেন তিনি। কারণ, তার হাতে দেওয়া হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সনদ। আর ম্যানেজমেন্টে গ্রাজুয়েশন করা গাজী সাজেদুল ইসলাম সার্টিফিকেট পেয়েছেন মার্কেটিং বিভাগের। এছাড়াও মনোবিজ্ঞানে পড়ুয়া অপর এক শিক্ষার্থী দর্শনের নামে সার্টিফিকেট পেয়েছেন। সার্টিফিকেটে এ ধরণের বিভ্রাট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের টেবিলে টেবিলে ঘুরছেন তারা।
তবে সনিয়া ইয়াসমিন নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী জানাচ্ছেন, এমন অদ্ভূত ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল নয়। এর আগেও হয়েছে। ৪৬তম সমাবর্তনের সনদে তার হলের নাম ‘বেগম ফজিলাতুন্নেছা’র স্থলে বঙ্গবন্ধু হল লিখে দেয়া হয়েছিল; যেখানে বঙ্গবন্ধু হল মেয়েদের হলই নয়। পরে তাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরে হলের নাম ঠিক করতে হয়েছে। সনিয়া বর্তমানে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরেশনে অফিসার হিসেবে কর্মরত।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষের এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তীব্র ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে গত কয়েকদিন ধরেই। দেবব্রত দেব নামে একজন লিখেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় ঢাকা কলেজ চলে আসে নাই এটাই কম কিসের?।’ নূর মোহাম্মদ রিটন নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘কপাল ভাল হলের নামের জায়গায় কলেজের নাম আসে নাই।’ একজন শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘আরো কত কী যে হবে’। আর বিভাগের নামে ভুল আসা আখতারুজ্জামান শাওন নিজের ফেসবুক ওয়ালে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘মানুষ ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটা কেমন ভুল? আর একজনের ভুলের মাশুল আরেকজন কেন দিবে?’
কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, এ বছর সমাবর্তন আয়োজনের শুরু থেকেই বিভিন্ন কাজে প্রশাসনিক দায়িত্ববোধের অভাব দেখা গেছে। এর মধ্যে শুরুতেই সার্টিফিকেট দেয়ার খামে 51st সমাবর্তনের জায়গায় লেখা হয়েছে 51th। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর, ভাইস-চ্যান্সেলর ও প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের শব্দচয়নে ঘটানো হয়েছে বাংলা ও ইংরেজির সংমিশ্রণ। চ্যান্সেলর লেখা ঠিক থাকলেও ভাইস চ্যান্সেলরের জায়গায় লেখা হয়েছে উপাচার্য। আবার প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের জায়গায় বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে লেখা হয়েছে প্রো-উপাচার্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কাছ থেকে এ ধরনের ভুল কাম্য নয়।
প্রসঙ্গত, গত ৬অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে সমাবর্তনে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবারই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অধিভুক্ত সাত কলেজের রেজিস্ট্রেশনকৃত গ্র্যাজুয়েটগণ ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকা কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজ ভেন্যু থেকে সরাসরি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সবমিলিয়ে এই সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ১১১ জন; যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনের ইতিহাসে সর্বাধিক। সমাবর্তনে কৃতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ৯৬টি স্বর্ণপদক, ৮১ জনকে পিএইচডি এবং ২৭ জনকে এম ফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়।