০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:৫৮

বিসিএসে তারুণ্যের আগ্রহ বেড়েছে

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)  © ফাইল ফটো

সরকারি চাকরির প্রতি আগে থেকে অনেকের আগ্রহ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটি বেড়েছে অনেক গুণ। বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় এটি লক্ষ্য করা মতো। কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষা বিচার-বিশ্লেষণ করে বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। এতে দেখা গেছে, চাকরি প্রার্থীদের কাছে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণীয় পরীক্ষা হচ্ছে বিসিএস। 

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) এক পরিসংখ্যানে বলছে, বিসিএসে গত ১০ বছরে পিএসসির সুপারিশ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। পিএসসির পরীক্ষা পদ্ধতিতে গ্রহণযোগ্যতা, চাকরিতে নিরাপত্তা, বেতন বৃদ্ধিসহ নানা সুযোগ-সুবিধার কারণে বিসিএসের প্রতি চাকরি প্রার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিএসসির ২০০৯ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পিএসসি ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ করেছিল ২০ হাজার ২২৫ জন। আর ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত পিএসসি ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ করেছে মোট ৬০ হাজার ১১৮ জন। তাছাড়া ৩৮তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৬ জন চাকরি প্রার্থী আবেদন করেছেল, যা এ যাবৎ বিসিএস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ। জানা গেছে, সরকার পিএসসিকে শক্তিশালী এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এরই ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একসঙ্গে একাধিক বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে প্রতি বছর কমপক্ষে একটি বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল আসছে। ২০১০ সালের নন-ক্যাডার বিধিমালা জারি করে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিন্তু ক্যাডার পদে সুপারিশ পাননি এরকম প্রার্থীদের মধ্য থেকে অনেক প্রার্থীকে নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিভিন্ন গ্রেডে সুপারিশ করায় ক্যাডারের সমসংখ্যক প্রার্থী নন-ক্যাডারেও চাকরি পাচ্ছে। এতে শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে বিসিএস পরীক্ষার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ বেড়েছে।

পিএসসি’র ২০০৯ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত পিএসসি ২৬ হাজার ৬৪৫ জনকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করেছে। এ সময়ের মধ্যে ৩৩ হাজার ৫৭৬ জনকে নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ করে পিএসসি। বিসিএস ছাড়াও পিএসসি কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদেও সুপারিশ করা হয়। ২০০৯ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত পিএসসি ৩ হাজার ১৮ জনকে প্রথম শ্রেণি এবং ২২ হাজার ৬৫৩ জনকে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া, নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণির পদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়াধীন নার্সিংও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স’ পদে ২০১৬-২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজারকে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি।

বর্তমানে কোন বিসিএসের কি অবস্থা 
৩৮তম বিসিএস : ৩৮তম বিসিএসে ক্যাডার শূন্য পদের সংখ্যা ২ হাজার ২৪। মোট প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৪৬। যা এ যাবৎ বিসিএস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকাসহ ৮টি বিভাগীয় শহরের ২৮৩ পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রিলিমিনারি টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পিএসসসির বিশেষ সভায় ১৬ হাজার ২৮৬ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে প্রিলিমিনারি টেস্টের ফল প্রকাশ করা হয়। ৮ থেকে ১৩ আগস্ট আবশ্যিক বিষয়গুলোর লিখিত পরীক্ষা ও ৮ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ঐচ্ছিক বিষয়গুলোর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৩৯তম বিসিএস পরীক্ষা : ৩৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষা ৩ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা (এমসিকিউ টাইপ) অনুষ্ঠিত  হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর কমিশনের বিশেষ সভায় সহকারী সার্জন পদে ১৩ হাজার ২১৯  এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে ৫৩১ জনকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে ৩৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার লিখিত পরীক্ষার (এমসিকিউ টাইপ) ফল প্রকাশ করা হয়। ১০ অক্টোবর হতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

৪০তম বিসিএস পরীক্ষা : ৪০তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ১ হাজার ৯০৩টি ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধিযাচন পাওয়ায় ১১ সেপ্টেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে আনলাইনে আবেদনপত্র জমাদান শুরু হয়েছে এবং ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন জমাদান করা যাবে। আগামী জানুয়ারিতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে।

পিএসসির নতুন উদ্যোগ : বিসিএস পরীক্ষা ও অন্যান্য নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রশ্ন ব্যাংক করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে নন-ক্যাডার নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ব্যাংক থেকে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষা থেকে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র দুইজন পরীক্ষক দিয়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। দুইজন পরীক্ষকের মধ্যে নম্বরের পার্থক্য ২০ শতাংশ বা তার বেশি হলে তৃতীয় পরীক্ষক দিয়ে ওই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হবে। প্রতিবন্ধী প্রার্থী এবং তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থীদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগও এরই মধ্যে  তৈরি করা হয়েছে।

পিএসসির অবকাঠামোগত উন্নয়ন : পিএসসি যাতে আরও কার্যকর হয়ে ওঠে তার জন্য অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বিভাগীয় সদর দপ্তরের কার্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর করার নিমিত্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনাধীন আছে। তাবে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকা-ের মধ্যে রয়েছেÑ কমিশন সচিবালয়ে প্রশ্নপত্র মুদ্রণের জন্য নিরাপত্তা সংবলিত পৃথক প্রশ্নপত্র মুদ্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নপত্র মুদ্রণের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ৩৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার ৪০ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়াও নন-ক্যাডার বিভিন্ন পদের লিখিত ও বাছাই পরীক্ষা স্বল্পতম সময়ে এবং প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।

অতীতে নিয়োগ পরীক্ষার ফল কর্মকর্তাদের কক্ষে তৈরি করা হতো। বর্তমানে পরীক্ষার ফল প্রণয়নের নিমিত্ত ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদের জন্য পৃথক ফল প্রণয়ন কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে এবং বিজ্ঞ সদস্যদের তত্ত্বাবধানে ফল তৈরি করা হচ্ছে।

কমিশন সচিবালয়ের পরীক্ষা হলকে আধুনিকায়ন ও সংস্কার করে মাল্টিপারপাস মিলনায়তনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এ মিলনায়তনের নামকরণ ’৭১ মিলনায়তন করা হয়েছে; কমিশন সচিবালয়ের প্রথমতলায় ‘মুক্তির পথযাত্রা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে; কমিশন সচিবালয় চত্বরে মহান মুক্তিযুদ্ধে সিভিল সার্ভিসের জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে; কমিশন সচিবালয়ে জাতির পিতার ম্যুরাল স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে; কমিশন সচিবালয়ের লাইব্রেরির আধুনিকায়ন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্রশ্নকারক ও মডারেটরদের  ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বইসহ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধাসহ পৃথক কম্পিউটার সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও সভা-সেমিনার : বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী, দক্ষ ও যোগ্য প্রার্থী বাছাই নিশ্চিত করতে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নকারক, মডারেটর, পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও মৌখিক পরীক্ষার বিশেষজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে পিএসসি। তাছাড়া নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, হল তত্ত্বাবধায়ক, কক্ষ পরিদর্শক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অংশগ্রহণে সভা/ সেমিনার/ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

বিসিএসে চাকরিপ্রার্থীদের কেন এত আগ্রহ বেড়েছে; এর রহস্য কী-এ প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, সরকার পিএসসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে যোগ্য প্রার্থীরাই কেবল বিসিএসে সুপারিশ পাচ্ছে। তাই পিএসসি’র প্রতি চাকরি প্রার্থীদের আস্থা ও বিশ্বাস বেড়েছে। এছাড়া সরকার অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। এসব কারণেই বিসিএসে প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বলে আমি মনে করি।

৪০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি এবং ৩৮তম লিখিত পরীক্ষার ফল কবে নাগাদ হতে পারে-এ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ৪০তম বিসিএস পরীক্ষার আবেদন কার্যক্রম এখনও চলছে এবং আবেদন গ্রহণ শেষ হবে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। ৩৮তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। লিখিত পরীক্ষার খাতা পরীক্ষণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে। 

বিসিএস পরীক্ষায় আগামীতে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা-এ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, বিসিএস পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর গুণগতমান উন্নত করার জন্য প্রতিনিয়ত বিশেজ্ঞদের সঙ্গে এতদসংশ্লিষ্ট মতবিনিময় সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এগুলোতে প্রাপ্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রশ্নব্যাংক এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নপত্র মুদ্রণের কাজটি সম্পন্ন করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে পিএসসি। এটি সফল হলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের উন্নতি হবে বলে মনে করি।