শিথিল শাহবাগের আন্দোলন, বিক্ষোভ কয়েক জেলায়
শাহবাগের মূল পয়েন্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন আন্দোলনরত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা। এতে কিছুটা হলেও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে বিক্ষোভ হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানের মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে। এতে সড়কগুলোতে তীব্র যানজট যেমন তৈরি হয়, তেমনি ব্যাঘাত ঘটে ট্রেন সূচিতে। সোমবার ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড, সিলেট, বগুড়া ও দিনাজপুরসহ বেশ কয়েকটি মহাসড়কে এই আন্দোলন হয়।
সূত্রে জানা যায়, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের ৩০ শতাংশ কোটা বহালের দাবিতে বিকাল তিনটা থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়ার ঘোষণা থাকলেও বিকাল পাঁচটার দিকে নেতাকর্মীদের কয়েকজন এসে রাস্তার একপাশে গিয়ে অবস্থান নেন। বর্তমানে সেখানেই আন্দোলন চলছে।
অন্যদিকে ৫ শতাংশ কোটার দাবিতে শাহবাগ-টিএসসির যাওয়ার এক পাশের সড়কে অবস্থান নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পরিষদ। কোটা বহালের দাবিতে গতকাল তারাও মূল সড়ক অবরোধ করেছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে সোমবার বেলা ১২টা থেকে সিলেটে মহাসড়ক অবরোধ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড সিলেট ও দক্ষিণ সুরমা শাখা। নেতাকর্মীরা দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুল পয়েন্টে মিলিত হয়ে এই অবরোধে অংশ নেয়। অবরোধচলাকালে সন্তান কমান্ডের নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকে পড়ে, তৈরি হয় তীব্র যানজট। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান নিলেও তাদেরকে বাঁধা দেয়নি।
বিক্ষোভ সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সিলেট মঞ্চ ও দক্ষিণ সুরমা শাখার সিলেট মঞ্চের সভাপতি সালাউদ্দিন পরভেজ, সাধারণ সম্পদক জবরুল হোসেন, দক্ষিণ সুরমা শাখার সভাপতি সালা উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মো. জাবের আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অবরোধ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে: এদিকে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান ও ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবিতে চট্টগ্রাম মহাসড়কেও অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা। সোমবার নগরীর আকবর শাহ থানার সিটি গেট এলাকায় চলা আধার এ অবরোধে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে পথচারী ও এলাকাবাসী ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হন।
আকবর শাহ থানার সেকেন্ড অফিসার মো. ওমর ফারুক বলেন, মন্ত্রিপরিষদের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে তা বহালের দাবিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সিটি গেট এলাকায় মানববন্ধন করেছেন। এরপর সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এতে উভয় পাশে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, অবরোধ কর্মসূচি বেলা সাড়ে ১১টায় শেষ হলেও যানজটের প্রভাব থাকে বেলা ১২টা পর্যন্ত। পরে যানজট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে এতে অন্য কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
রেলপথ অবরোধ বগুড়ায়: ঘোষিত কর্মসূচিতে মহাসড়ক অবরোধের ডাক থাকলেও রেলপথ অবরোধ করা হয়েছে বগুড়ায়। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন বগুড়া জেলা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে সান্তাহারগামী ২০ ডাউন মেইল ট্রেনটি আটকা পড়ে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ১৮ মিনিট বিলম্বে ট্রেনটি পুনরায় সান্তাহারের উদ্দেশে যাত্রা করে।
বগুড়া রেল স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার আব্দুল্লাহ জানান, অবরোধের কারণে লালমনিরহাট থেকে ছেড়ে আসা সান্তাহারগামী ২০ ডাউন মেইল ট্রেনটি ১১টা ৫০ মিনিটে বগুড়া স্টেশনে পৌঁছানোর পর আটকা পড়ে। পরে অবরোধকারীরা সরে গেলে ১২টা ৮ মিনিটে ট্রেনটি পুনরায় সান্তাহারের উদ্দেশে বগুড়া রেল স্টেশন ত্যাগ করে।
দিনাজপুরে সড়ক-রেল দুইই অবরোধ: কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান নেন অবরোধকারীরা। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের ব্যানারে । একই সঙ্গে তাঁরা রেলপথের ওপরেও অবস্থান নিলে আটকা পড়ে পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড়গামী একটি ট্রেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করলে ট্রেনটি গন্তব্যের অভিমুখে ছেড়ে যায়।
কর্মসূচি চলাকালে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীরা সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় সরকারি চাকরিতে সব রকম কোটা বাতিল বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ছাড়কৃত পরিপত্র প্রত্যাহারের দাবিও জানান তাঁরা।
দেশব্যাপী ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে সব রকমের কোটা বাতিল করে। এর পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা ও আদিবাসী পরিবারের সন্তানরা কোটা পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আসছেন।
জানা যায়, কোটা বহালের দাবিতে গতকাল রোববার রাজধানীর শাহবাগ আজকের মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতেই সারাদেশে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের কর্মসূচি আসে।
প্রসঙ্গত, কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার। জনপ্রশাসনের চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত ২ জুলাই ২০১৮ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত ১৭ জুলাই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি বাতিলের সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে গত বুধবার তা মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম সাংবাদিকদের মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, ৯ম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত সব নিয়োগ এখন থেকে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে হবে। সরকার সময়ে সময়ে সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখতে পারবে এবং তাদের জন্য কোটা নির্ধারণ করতে পারবে।
এর আগে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫ শতাংশ মিলিয়ে শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা পদ্ধতি চালু ছিল।