২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:০৭

ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তিন হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

বন্যার পানিতে ডুবে গেছে স্কুলের মাঠ  © টিডিসি ফটো

প্রতি বছরই বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো বিভিন্ন দুর্যোগের কবলে পড়ে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু প্রতিষ্ঠান মেরামত করা হলেও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই দুর্যোগের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারে না। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো বিভিন্ন দুর্যোগের কবলে পড়া তিন হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতি বছর ‘বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রণয়ন করে আসছে ব্যানবেইস। ব্যানবেইসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০১৭ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্যোগ কবলিত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সর্বমোট ১৫ হাজার ৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির স্বীকার হয়। দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দুর্যোগের ধকল কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। যদিও ২০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো ভবন সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। সে হিসেবে দুর্যোগ কবলিত তিন হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে ব্যানবেইসের পরিচালক ফসি উল্ল্যা দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। দুর্যোগ কবলিত ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা একটি অধ্যায় সংযুক্ত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়ার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুললেও শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার খুবই কম থাকে। ব্যানবেইসের ওই প্রতিবেদন মতে, দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনিয়মিত উপস্থিতি খুবই সাধারণ। এর অন্যতম কারণ, বাসস্থানের স্থানান্তর, শিক্ষা উপকরণ হারিয়ে ফেলা, রাস্তা-ঘাটের সমস্যা, পারিবারিক অস্বচ্ছলতা, বকেয়া ফি ও পারিবারিক কাজে সহযোগিতা।

গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দুর্যোগ নিয়মিত ঘটনা। যদিও দুর্যোগ মোকাবেলায় অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই কোর ধরণের প্রস্তুতি থাকে না। এর ফলে ক্ষতির পরিমাণটা বেশি হয়। পাশাপাশি দুর্যোগ পরবর্তী সময়েও দ্রুত কোন ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয় না। যেসব প্রতিষ্ঠানে ভবন ক্ষতির স্বীকার হয়, সেগুলো পুনঃনির্মাণের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা পরিলক্ষিত হয়। এর ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বেড়ে যায়। তাই দুর্যোগ কবলিত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। 

দুর্যোগ মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতি না থাকার ফলে এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সমস্যায় পড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। ইউনেস্কো ও ব্যানবেইসের অন্য একটি গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৬ সালে সাতক্ষীরা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজার ও কুড়িগ্রামসহ দেশের ১২টি জেলায় একটি জরিপ চালায় সংস্থা দুটি। এসব অঞ্চলের মোট ১ হাজার ৮০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮৪৩, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫৫০, মাদ্রাসা ৩২৯ ও কলেজ ৭৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানের ৪৬ দশমিক ৭২ শতাংশ পরিচালিত হয় সরকারি অর্থায়নে। আর বাকি ৫৩ দশমিক ২৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারি উদ্যোগে। এ জরিপের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে দুর্যোগ মোকাবেলায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে।

ইউনেস্কো ও ব্যানবেইসের প্রতিবেদন মতে, দুর্যোগ মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে অর্থের প্রয়োজন থাকলেও এ ধরনের কোনও তহবিল নেই উপকূলীয় অঞ্চলের ৮৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কোনও ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। দুর্যোগ কবলিত হওয়ার পর প্রাথমিক সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা নেই ৭০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। দুর্যোগ মোকাবেলায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই জনবলের কোনও প্রশিক্ষণ নেই। এছাড়া রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট। প্রতিবেদন মতে, জরিপভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় অর্ধেক শ্রেণীকক্ষই ব্যবহারের অনুপযোগী। নিরাপদ পানির উৎস না থাকা, খেলার মাঠের অভাব, স্কুলের বেশি দূরত্ব, শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক না থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যার তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণা প্রতিবেদনটিতে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্রতার হার বেশি। এজন্য উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীকে শিক্ষা ব্যবস্থায় আকৃষ্ট করতে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়া প্রয়োজন। অথচ এর বিপরীত চিত্রই উঠে এসেছে গবেষণায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীকেও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এজন্য উপকূলীয় অঞ্চলের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিশেষভাবে অর্থ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন।