৭৩-এ জাতিসংঘ
আজ ২৪ অক্টোবর, ৭৩ তম জাতিসংঘ দিবস। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও বিভিন্ন আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ব সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। লিগ অব নেশনস বিলুপ্ত হয়ে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতার এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থাটি গঠন করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশগুলোর প্রায় চার বছরের চেষ্টা ও ধারাবাহিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে প্রাথমিকভাবে ৪৬টি সদস্য দেশ জাতিসংঘ সনদকে অনুসমর্থন দেয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২৪ অক্টোবরকে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।
দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বাণীতে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর কল্যাণ কামনা করেছেন। জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালিত হবে। এ দিন বিভিন্ন খাতে অবদানের জন্য মনোনীতদের পুরস্কার দেবে জাতিসংঘ। এ বছর উদ্ভাবন ও সৃষ্টিশীলতা এবং জাতিসংঘের কর্মসূচি বাস্তবায়নে দক্ষতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পুরস্কার দেওয়া হবে। এ ছাড়া ‘এসডিজি চ্যাম্পিয়ন’ বিষয়ে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী ইউএন ডে কনসার্ট।
দিবসটি পালনের লক্ষ্যে ঢাকায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি আজ বিকেল ৫টায় রাজধানীর একটি হোটেলে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। ‘বৈষম্যহীন উন্নয়নে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ: স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালায়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সনদের আদর্শ ও নীতিমালার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে এমন অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ও বাক্য রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘের সনদ ও ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে: ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এই সকল নীতি হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি’ (অনুচ্ছেদ-২৫)। বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত এমন অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ও বাক্য রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘের ভাবধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের বিষয়টি সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার আলোকে প্রণীত হয়েছে, যা আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়।
১৯৭২ সালে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রির নেতৃত্বে একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে তৎপরতা চালায়। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্রোর সময়ে পাকিস্তান সরকারের প্ররোচনায় নিরাপত্তা পরিষদে চীনের ভেটো প্রয়োগের কারণে পর পর দু’বার বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬ তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে। যোগদানের এক সপ্তাহ পর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। বাংলাদেশের উন্নয়নেও জাতিসংঘ তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশন বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত আছে।
বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘের বিগত বছরের যে সম্পর্ক তা দ্বারা বাংলাদেশ সংবিধানের কার্যকারিতা সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্বে আরো সমুন্নত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দ্বিধা বিভক্ত এবং অর্থনৈতিক ভাবে প্রতিদ্ধন্ধিতা পূর্ণ দ্বিমেরু কেন্দ্রীক বিশ্বে জাতিসংঘ একমাত্র সংস্থা যা বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখতে পারে। বাংলাদেশ নীতিগতভাবে তাই জাতিসংঘের মূলনীতিসমূহ মেনে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।