নির্বাচনের হিসাব পাল্টে দিতে পারে তরুণ ভোটার-নৌকা সমর্থকসহ যেসব ‘ফ্যাক্টর’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। তিনি এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটা সুরক্ষিত বাংলাদেশ চাই। নারী পুরুষ জনগণ সবার জন্য ভাল চাই। জামায়াত আসুক, এনসিপি আসুক, স্বতন্ত্র কেউ হোক বা বিএনপি আসুক যেটাই হোক- আমাদের সবগুলো অধিকার যাতে পুরণ হয়।’ খবর বিবিসি বাংলার
এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কী হবে, এ প্রশ্নে ফারজানা বলেন, ‘নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য এবং দেশের সংস্কার। এ ছাড়া আমাদের যে বাক স্বাধীনতা, ওইটা যেন এখনের মত ঠিক থাকে- এটাই আমরা চাই। আর আমাদের যাতে মেয়ে হিসেবে নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করা হয়।’
বিবিসির বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার নির্বাচনে ফারজানার মতো ভোটার আছে মোট ভোটের তিনভাগের একভাগ। বিগত তিনটি নির্বাচনে অনিয়ম এবং একতরফা ভোটের কারণে এবার তরুণ ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ফারাজানার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আড্ডায় ছিলেন ফারহানা খানম। তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু কী এ প্রশ্নে স্বল্প কথায় তার জবাব ছিল ‘যাতে নারীদেরকে সুন্দর চোখে দেখে, সেইফ থাকে, দুর্নীতি যাতে কম হয়, রেইপ যাতে কম হয়।’
আরও পড়ুন : জামায়াত আমিরের ডিবেটের আহবান নিয়ে যা বলছে বিএনপি
দ্বিতীয় বর্ষের একজন ছাত্র বলছেন, ‘বেকার যারা আছে, তাদের চাকরির সুযোগ, যারা ব্যবসা করতে চায় তরুণ, তাদের উদ্বুদ্ধ করা, ঋণ দেয়া। সম্পূর্ণ দুর্নীতি মুক্ত চাইতেছে তরুণরা এরপর ঘুষ ছাড়া চাকরি।’
ভোটের আগে বাংলাদেশে এগুলোই মোটামুটি সার্বজনীন ইস্যু। শিক্ষার্থীদের কথায় দেশের আপামর মানুষের প্রত্যাশারই একটা প্রতিফলন রয়েছে। এই তরুণরাই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
তরুণদের একটা আক্ষেপ দেখা গেল অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে। অনেকে বলছেন, ‘এ সরকার তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারজানার কথায়, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে পদক্ষেপগুলা ওইটার মধ্যেও বেশি একটা পরিবর্তন দেখা গেল না। সবাই এমন একটা ভাব করতেছে যে আমলা, সচিব বা সামরিক বাহিনীর কারণে চেঞ্জগুলো হলো না। ইন দ্য এন্ড রাষ্ট্রের অবকাঠামো ভেতরের দিক থেকে আমাদের যে ন্যায্য দাবিটা ছিল, ভেতর থেকে সংস্কারটা হবে সেটা হলো না।’
তরুণ ভোট ফ্যাক্টর
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোট জয়-পরাজয়ে বড় ফ্যাক্টর হবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই তরুণ ভোটারদের ভাবনায় কী আছে, সেটি নির্বাচন ছাড়া বোঝা অসম্ভব। কারণ বিগত তিনটি নির্বাচনে ভোটের প্রকৃত চিত্র সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ তরুণ ভোট নিয়ে বলেন, ‘এই ভোট নির্বাচনে জয় পরাজয়ে প্রধান নিয়ামক হবে। তারা বিপুল সংখ্যায়, তারা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে এবং তাদের মনে কী আছে আমরা জানি না। বিএনপির মধ্যে অনেক তরুণ আছে, জামায়াতের মধ্যেও অনেক তরুণ আছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলিতে আমরা একধরনের প্রবণতা আমরা দেখেছি। মাদ্রাসাগুলিতে এক ধরনের প্রবণতা আছে। কাজে তরুণ ভোটাররা তাদের টার্ন আউটটা বেশি হবে।’
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, ‘তারাতো (তরুণ ভোটার) আগে ভোট দেন নাই অতএব তাদের ভোটিং প্যাটার্ন নিয়ে কোনো ধারণা কারো নেই। সেইজন্যই এইবারের নির্বাচনটা সবথেকে বেশি আনসার্টন সবার কাছে মনে হচ্ছে। কারণ তারা হচ্ছে থার্টি পার্সেন্ট অব ভোটারস, এবং তাদের ভোটিং পার্সেন্টেজ অনেক বেশি হবে, তাদের ভোটিং রেকর্ডজ কিছু নাই কোনদিকে তারা ভোট দিবে। এছাড়া তাদের খুবই হাই এক্সপেকটেশন আছে এবং তারা নতুন বাংলাদেশ করতে চান।’
আরও পড়ুন : সূত্রাপুর থানার ওসি বদল চেয়ে ইসিতে বিএনপি প্রার্থী ইশরাক
নারী ও নিরাপত্তা
বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে অর্ধেকই হলো নারী। এই ভোট বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে এর সঙ্গে নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিশেষ গরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মহিউদ্দিন আহমদের কথায়, নারীরাও কিন্তু একটা সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে।
‘তাদের বিপুল উপস্থিতি যদি হয় এবং সেভাবে যদি একটা অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায় তাহলে এটা নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। এখন নারীদের উপস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপরে। গোলমালের আশঙ্কা থাকলে তারা অনেকেই যাবেন না। হ্যারাসড হতে চান না কেউ।’
ভোটের দিন পরিস্থিতি কেমন হয়, সেটি নির্বাচনে প্রভাব ফেলে। ভোটার উপস্থিতিতেও নিরাপত্তার ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এরই মধ্যে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচনী প্রচারে ভোট কেন্দ্র পাহারা দেয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে যা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান।
‘অলরেডি যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে আপনারা সকালে গিয়ে ভোটকেন্দ্র পাহারা দেন। এখন যদি দুইটা বড় অ্যালায়েন্স তাদের দুই দলেরই কর্মী যদি গিয়ে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে যায় চেষ্টা করে এবং করবে হয়তো বা তখন যে একটা মুখোমুখী সংঘর্ষ হবে না সেটাতো বলা যাচ্ছে না। আর যদি সকালের দিকে এরকম একটা সংঘর্ষ হয় তাহলে তো নারী ভোটাররা ভয়ের চোটে আসতে চাইবে না।’
বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকরা দন্দ্বে জড়িয়ে পরছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান মনে করেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে এবং সহিংসতা নিয়ে দুটি গ্রুপের উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। প্রথমত নারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
আরও পড়ুন : ‘এক পুলিশ জড়িয়ে ধরে বাঁচাতে চাইলে রাগে তাকে সরিয়ে দিই’
ফ্যাক্টর নৌকার ভোট
এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাদের ভোটব্যাংক নিয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। নৌকার ভোটাররা অনেক আসনে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে বলেও বিশ্লেষণ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। তবে সমর্থকরা যাবেন সেক্ষেত্রে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বিবেচনাই কাজ করবে।
‘আওয়ামী লীগকে আগে যারা ভোট দিত মনে করেন আওয়ামী লীগকে যারা ২০০৮ পর্যন্ত ভোট দিয়েছে এর পরেতো ভোট হয় নাই। তো তারা দেখবে অনেকে নানান বিবেচনা কাজ করবে, আমরা যদি ম্যাক্রো লেভেলে চিন্তা করি তাইলে হয়তো তারা চিন্তা করবে যে কম ক্ষতিকর তাকে হয়তো তারা ভোট দিবে। এখন তাদের চোখে যদি মন্দের ভালো হয় বিএনপি তাকে তারা ভোট দিবে যদি তারা যদি মনে করে মন্দের ভালো জামায়াতে ইসলামী তাকে তারা ভোট দেবে।’
এ ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের মত, নৌকার সমর্থক ভোটারদের ভোট কিছু কিছু আসনে জয় পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার মূল্যায়ন নৌকার সঙ্গে প্রবাসী ভোট ক্ষেত্র বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‘যদি বিশ হাজার ভোটের মারফতে সিট এদিক সেদিক হতে পারে সেক্ষেত্রে প্রবাসী ভোট একটা ভূমিকা রাখতে পারে। সেরকমভাবে আমি বলবো আওয়ামী লীগ যে সাপোর্ট আছে ট্রেডিশনাল আওয়ামী লীগ সাপোর্ট সেগুলো কোনো কোনো আসনে ওইভোটগুলা মার্জিন-এই যে টেন পার্সেন্ট এডিশনাল ভোট যদি পড়ে সেটাই জয় পরাজয় নির্ধারণ করবে।’
রওনক জাহানের মতে, এবার নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার প্রচারণাও ভোটের দিনেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন অতীতে কোনো নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ার রোল এতটা প্রাধান্য ছিল না।
‘এখন সোশ্যাল মিডিয়া এআই জেনারেটেড অনেক মিথ্যা খবর ছড়িয়ে দেয়া হবে, আরো বেশি কাদা ছোড়াছুড়ি হবে এবং সেদিন যে আসলে সহিংসতা না হলেও সহিংসতা হচ্ছে- এরকম নানান কিছু প্রচার বা অপপ্রচার হবে। এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে কাউন্টার করার জন্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইসি তাদের কী ধরনের প্রস্তুতি আছে- সেটা বলা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত যেটা দেখা যাচ্ছে যে, কোঅর্ডিনেটেডভাবে কাজ হচ্ছে না।’