৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:০৮

সাতক্ষীরার তিন আসনে শক্ত অবস্থানে জামায়াত, একটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

সাতক্ষীরা নির্বাচনী প্রার্থী  © সংগৃহীত

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একসময়কার মিত্র বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বী। এই দুই দলের শক্ত অবস্থানের আসনগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এর অন্যতম দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী সুন্দরবনঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরা যাকে ভোটের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে সাতক্ষীরায় পাঁচটি সংসদীয় আসন ছিল। ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটি আসন কমিয়ে চারটি করা হয়। সে সময় তালা-কলারোয়া নিয়ে সাতক্ষীরা-১, সদর উপজেলা নিয়ে সাতক্ষীরা-২, দেবহাটা, আশাশুনি ও কালিগঞ্জের চারটি ইউনিয়ন নিয়ে সাতক্ষীরা-৩ এবং শ্যামনগর ও কালিগঞ্জের আটটি ইউনিয়ন নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তবে এবারের চূড়ান্ত গেজেটে সাতক্ষীরা-১ আসনের সীমানা অপরিবর্তিত রেখে সদর উপজেলার সঙ্গে দেবহাটাকে যুক্ত করে সাতক্ষীরা-২, আশাশুনির সঙ্গে কালিগঞ্জকে যুক্ত করে সাতক্ষীরা-৩ এবং শুধুমাত্র শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সীমানা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, সাতক্ষীরার আসনগুলোতে বরাবরই শক্ত অবস্থানে ছিল জামায়াতে ইসলামী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতেই জয় পায় দলটি। সে সময় ভোটের শতাংশের দিক থেকেও জামায়াত বিএনপির চেয়ে এগিয়ে ছিল। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট গঠন হলে পাঁচটির মধ্যে তিনটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়া হয় এবং সে নির্বাচনে পাঁচটি আসনেই জয় পায় বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জামায়াতের প্রার্থী দেয় চারদলীয় জোট। একসময়কার সেই জোটসঙ্গী জামায়াতই এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

আরও পড়ুন: শক্ত ঘাঁটির দুই আসনে বিএনপির উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থী

জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই উপকূলীয় ও সীমান্তবর্তী জেলায় অতীতের নির্বাচনে প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও এবার সেখানে বড় ধরনের উপস্থিতি জানান দিতে চায় বিএনপি। নিজেদের পুরোনো ভোটব্যাংকের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভোটারদের দিকেও নজর রয়েছে দলটির। ফলে আসনভিত্তিক বিএনপি-জামায়াতের লড়াই কেমন হবে, সেটিই এখন স্থানীয় ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম (হাবিব)। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত এই নেতা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার মামলায় ৭০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পান তিনি। নির্যাতিত নেতা হিসেবে এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেক ভোটার। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ। ব্যক্তি ইমেজ ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে তারও আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

এই আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জামায়াতের আনসার আলী জয়ী হন। সে সময় বিএনপি ১৯ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়, জামায়াত ২৩ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং বিএনপি ১৮ শতাংশ ভোট নিয়ে চতুর্থ হয়। এ আসনে এবার মোট সাতজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাই-বাছাই শেষে দুজনের মনোনয়ন বাতিল হয়। বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব মো. ইয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় এনজিও বিষয়ক সম্পাদক জিয়াউর রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাটকেলঘাটা থানা শাখার সভাপতি শেখ মো. রেজাউল করিম।

সদর ও দেবহাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-২ আসনে ত্রিমুখী সমীকরণে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে বিএনপি। দলটির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রউফ। জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক। এছাড়া জাতীয় পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান, এবি পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক জি এম সালাউদ্দীন, বাংলাদেশ জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী, ইসলামী আন্দোলনের জেলা উপদেষ্টা রবিউল ইসলাম এবং এলডিপির জেলা সদস্য শফিকুল ইসলাম (সাহেদ) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

আরও পড়ুন: নির্বাচনে জিতলে কী করবেন, ৯ পয়েন্টে ইশতেহার দিলেন নুর

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সমর্থকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও লিখিত আবেদন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত কেউ প্রার্থী হননি। অতীত নির্বাচনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জামায়াতের কাজী শামসুর রহমান সংসদ সদস্য হন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট থেকে নির্বাচিত হন মাওলানা আব্দুল খালেক মণ্ডল। ২০০৮ সালে মহাজোটের সমর্থনে জাতীয় পার্টির এম এ জব্বার জয়ী হন। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা দশ বছর আওয়ামী লীগের মীর মোস্তাক আহমেদ রবি এই আসনের এমপি ছিলেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তাকে হারিয়ে জাতীয় পার্টির মো. আশরাফুজ্জামান বিজয়ী হন। সামগ্রিকভাবে স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে পাল্লা কিছুটা জামায়াতের দিকে ভারি হলেও বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কারণে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস রয়েছে।

আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলা নিয়ে সাতক্ষীরা-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে পরিস্থিতি জটিল। জামায়াতের প্রার্থী জেলা শাখার সাবেক আমির মুহাদ্দিস রবিউল বাশার। বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীনকে। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয়তাবাদী চিকিৎসক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. শহিদুল আলম ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশ তার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা জামায়াতের জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করছেন তৃণমূলের কর্মীরা।

শ্যামনগর উপজেলা নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনে তিনজন বৈধ প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম, বিএনপির জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান এবং ইসলামী আন্দোলনের এস এম মোস্তফা আল মামুন। দুইবারের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের নিজস্ব ভোটব্যাংক থাকায় এই আসনে জামায়াতকে শক্ত অবস্থানে দেখা হচ্ছে। বিএনপি দীর্ঘদিন এখানে সংগঠন গুছিয়ে তুললেও শেষ মুহূর্তে নতুন মুখ মনোনয়ন দেওয়ায় দলটি কিছুটা ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মত স্থানীয়দের।

জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে সাতক্ষীরার চারটি আসনেই জাতীয় পার্টি বিজয়ী হবে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ বলেন, দীর্ঘ নির্যাতনের পরও নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে ছিলেন এবং আসন্ন নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি আসনেই বিএনপি জয়ী হবে বলে তিনি আশাবাদী। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল আজিজ বলেন, গত ১৬ বছরেও জামায়াত সাধারণ মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে এবং এবারের নির্বাচনে চারটি আসনেই তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন।

সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার চারটি আসনের নির্বাচনী মাঠে এবার একসময়কার মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সরাসরি মুখোমুখি। সংগঠিত প্রচারণা ও পুরনো ঘাঁটি পুনর্দখলের কৌশলে জামায়াত এগিয়ে থাকলেও প্রার্থী সংকট, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বিএনপি অনেকটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা। তবে শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে—এই অনিশ্চয়তাই এখন সাতক্ষীরার নির্বাচনী আলোচনার মূল সুর।