কাগজে-কলমে থাকা মাদ্রাসা হলো জাতীয়করণ, যা বললেন শিক্ষক-স্থানীয়রা

হাওলাদারকান্দি এবতেদায়ী স্বতন্ত্র মাদ্রাসা
হাওলাদারকান্দি এবতেদায়ী স্বতন্ত্র মাদ্রাসা  © সংগৃহীত

যুগের পর যুগ বিনা বেতনে নিয়মিত পাঠদান দেওয়া শিক্ষকরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করলেও কাগজে-কলমে থাকা ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা সাদাপোল এলাকার হাওলাদারকান্দি এবতেদায়ী স্বতন্ত্র মাদ্রাসা জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত হয়েছে।

মাদ্রাসার অস্ত্বিত নেই, দীর্ঘ বছর ধরে বন্ধ, লাইব্রেরি নেই, সাইনবোর্ড নেই, ক্লাস রুম নেই। তবু জাতীয়করণের তালিকাভুক্ত হওয়ায় অবাক হয়েছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে ইলিশার হাওলাদারকান্দি মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, তিনজন শিক্ষক মাদ্রাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনজনের একজন সাজানো শিক্ষক, মাদ্রাসাটি জাতীয়করণের তালিকায় শুনে মাদ্রাসায় গিয়ে মেরামতের উদ্যােগ নিতে দেখা যায়।

এ সময় এই প্রতিবেদক জানতে চান মাদ্রাসার সুপারের নাম কী এবং তিনি কোথায়? তারা বলেন, সুপার অজিউল্লাহ উপস্থিত নেই। তবে তার আপন ভাই সফিউল্লাহ এগিয়ে এসে বলেন, যা বলার আমাকে বলেন।

সুপার সাহেব কোথায়? এমন প্রশ্নে তিনি (সফিউল্লাহ) বলেন, একটু দূরে আছে। আপনাদের মাদ্রাসার সাইনবোর্ড কোথায়? এক শিক্ষক বলেন, তিন বছর আগে গাড়ি উল্টে ভেঙে গেছে। আপনাদের লাইব্রেরি কোথায় এবং লাইব্রেরির তালা খোলেন না কত বছর? এমন প্রশ্নে এক শিক্ষক অন্য শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে বলেন, এসব বাদ দেন। ক্ষতি কইরেন না।

মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হাজিরা খাতা কোথায়? তখন শিক্ষক সফিউল্লাহ বলেন, মনির নামের একজন অফিস সহকারী আছেন, তিনি নিয়ে গেছেন। মনিরের নম্বর দিন। তখন সফিউল্লাহ বলেন, তার নম্বর নেই, তবে মনির আমাদের শিক্ষক, আমি ভুলে অফিস সহকারী বলে ফেলসি।

আপনাদের শিক্ষার্থী কতজন এবং সবশেষ ক্লাস করেছেন কবে? এ প্রশ্নে শিক্ষক সফিউল্লাহ বলেন, এসব বলতে পারব না। তবে আমাদের এখানে কিছু না থাকলেও উপজেলা অফিসে কাগজে-কলমে জসিমের কম্পিউটারে সব আছে। আপনারা সেখানে সব পাবেন।

বাস্তবে নেই, কাগজে-কলমে আছে, এটা কীভাবে সম্ভব হয়েছে? এর উত্তরে তিনি বলেন, বুঝেনই তো, কাগজে-কলমে ঠিক আছে। মাদ্রাসার সভাপতি কে, জানতে চাইলে সফিউল্লাহ বলেন, আমার এক ভাই প্রধান শিক্ষক আরেক ভাই আবদুল হাই সভাপতি।

বিষয়টি নিয়ে হাওলাদারকান্দি এবতেদায়ী স্বতন্ত্র মাদ্রাসা এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক বছর আগে নদীভাঙনের পর মাদ্রাসাটি এখান মসজিদের জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে মক্তবের পোলাপান পড়ানো হতো। মাদ্রাসা চলত না। কয়েক মাস পর পর একজন শিক্ষক এসে ঘুরে যেতেন। আবার দু-একজন শিক্ষক ঢাকায় চাকরি করেন। জাতীয়করণের কথা শুনে তারা এখন আসছেন বলে শুনেছি। আপনারা আসবেন শুনে এক শিক্ষক তার আপন ভাইকে শিক্ষক সাজিয়ে পাঠিয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, একটি অচল মাদ্রাসা জাতীয়করণের তালিকায় উঠল অথচ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান নিয়মিত চললেও তালিকাভুক্ত হয়নি। এ ছাড়া শিক্ষক সফিউল্লাহ বলেন তিনি জসিমের কম্পিউটারে সব ঠিক রাখছেন। কে এই জসিম?

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছে সচেতন মহল।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার ফজলে গোফরান বলেন, এই নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, এটা আমি এই প্রথম আপনার কাছে জানলাম। এ রকম প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতাভুক্ত হওয়া সমীচীন হতে পারে না। বিষয়টি আমরা দেখব।

প্রসঙ্গত, আন্দোলনকারী শিক্ষকদের জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১৫১৯টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে, যা সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান পেয়ে থাকে। এসব মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকরা প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা এবং সহকারী শিক্ষকরা ৩ হাজার টাকা অনুদান পান। তবে এ ছাড়া আরও ৫ হাজার ৯৩২টি মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলো সরকারি কোনো অনুদান বা সুবিধা পায় না।


সর্বশেষ সংবাদ