০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৪

নির্বাচনের তিন দিন আগে নানা ‘অসঙ্গতি’র শিক্ষা আইন পাসে তড়িঘড়ি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়  © সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে পেশ হতে যাচ্ছে শিক্ষা আইন-২০২৬। অংশীজনদের আলোচনার পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে নানা অসঙ্গতি নিয়ে বেশ তড়িঘড়ি করেই আইনটি পাস হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা আইনের খসড়ায় ব্যাপক অসঙ্গতি থাকলেও মাত্র ছয়দিনের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে, যেখানে তিন দিনই ছিল সরকারি ছুটি, যা অগণতান্ত্রিক এবং যুক্তিসংগত নয়। সরকার যখন মেয়াদকালের একেবারে শেষ মুহূর্তে, সে সময়ে এমন তড়িঘড়ি করে শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ আইনে হাত দেওয়ার ঘটনায় উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদরা।

আগামীকাল সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে নির্বাচনের আগে শেষবারের মত বৈঠকে বসতে যাচ্ছে উপদেষ্টা পরিষদ। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। অপরদিকে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বৈঠকে শিক্ষা আইনের প্রস্তাবনা উঠতে পারে।

শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ির শিক্ষা আইন
অংশীজনরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা শিক্ষাবিদদের নিকট মোটেও সময়োপযোগী ও গ্রহণযোগ্য নয়। অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে এই আইনের খসড়া তৈরি ও প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে, ১ ফেব্রুয়ারি খসড়া প্রকাশ করে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তিন দিনই ছিল সরকারি ছুটি, যা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য তাড়াহুড়োর উদাহরণ। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনের জন্য এত অল্প সময়ে মতামত চাওয়া গণতান্ত্রিক ও যুক্তিসংগত নয়।

সরকার অনেকগুলো কমিশন করেছিল, কিন্তু শিক্ষার জন্য কোন সংস্কার কমিশন করেনি। সরকার যদি প্রথম থেকে সংস্কার কমিশন করে তার আলোকে এই জিনিসগুলো করত, তাহলে সেটা যুক্তিযুক্ত হত। এখন যাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করে যে শিক্ষা আইন করে দিয়ে যাচ্ছে, এটা বরং আরো সমস্যা তৈরি করবে— অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তারা বলছেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই খসড়া আইন প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে সেই কমিটির সুপারিশগুলো আইনে অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগের পরামর্শক কমিটির শতাধিক সুপারিশের অধিকাংশই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষাবিদদের মতে, আইনটি তাড়াহুড়ো করে নয়, বরং পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ও অংশীজনদের মতামত নিয়ে যুগোপযোগীভাবে প্রণয়ন করা উচিত। তারা বলছেন, শিক্ষায় সংস্কার ও পরিবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য একটি কমিটির প্রতিবেদন আসছে, যার ভিত্তিতে সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন: ডিএমপিতে যোগ দিয়েও ছাত্রদলের পক্ষে সক্রিয় ‘হাদির লাশ নিয়া যা’ বলা পুলিশ সদস্য

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন, ২০২৬ প্রসঙ্গে শিক্ষা অধিকার সংসদের আহ্বায়ক প্রফেসর এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেছেন, তড়িঘড়ি করে, পরামর্শ ও ঐকমত্য ছাড়া আইন প্রণয়ন শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য পূরণ করবে না। তিনি বলেন, নতুন সরকার গঠনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কোনোরকম জনসম্পৃক্তি ও জনপ্রতিনিধিত্ব ছাড়া প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন (খসড়া) প্রণয়নের বিষয়ে শিক্ষা অধিকার সংসদ উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, দেশ যখন জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এবং অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে, সে সময়ে এই আইনের অনুমোদন সময়োপযোগী নয় বলে আমরা মনে করি। অন্তবর্তী সরকারের অন্তিমলগ্নে অকস্মিকভাবে তৈরি শিক্ষা আইনের খসড়া অনুমোদন পেলে তা অংশীজনদের সার্বজনীন অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কাঠামোগত ও প্রয়োজনীয় মুক্ত নাগরিক আলোচনার গণতান্ত্রিক অধিকার  ও প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকার অনেকগুলো কমিশন করেছিল, কিন্তু শিক্ষার জন্য কোন সংস্কার কমিশন করেনি। সরকার যদি প্রথম থেকে সংস্কার কমিশন করে তার আলোকে এই জিনিসগুলো করত, তাহলে সেটা যুক্তিযুক্ত হত। এখন যাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করে যে শিক্ষা আইন করে দিয়ে যাচ্ছে, এটা বরং আরো সমস্যা তৈরি করবে। কারণ অংশীজনদের সঙ্গে কথা না বলে এবং সংবিধান, শিক্ষানীতিসহ অন্যান্য পলিসির সাথে এলাইনমেন্ট না রেখে বা সেতুবন্ধন না রেখে বিক্ষিপ্তভাবে একটা শিক্ষা আইন হয়ে যাচ্ছে, এটা মোটেই কাম্য বা ভালো কিছু হবে না।

এই আইন পরবর্তী সরকারের জন্য একটা ‘ঝামেলা’ তৈরি করবে বলেও মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, যারাই ক্ষমতায় আসুক, তাদের নিজস্ব ইশতেহার আছে, ফিলোসফি আছে, শিক্ষা নিয়ে তাদের পরিকল্পনা আছে। এখন এই শিক্ষা আইন হয়ে গেলে তারা তখন ওটা নিজেদের মত করতে পারবে না; হয় আইন পরিবর্তন করা লাগবে, আর না বাতিল করা লাগবে। অথবা আইনের লঙ্ঘন করা লাগবে।

আরও পড়ুন: ৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়া শীর্ষ তিনের দুজনই ছাত্রলীগের

শিক্ষা আইন করার ‘ম্যান্ডেট’ এই সরকারের নেই বলেও উল্লেখ করেছেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, শিক্ষা তাৎক্ষণিক ফলাফলের বিষয় না। এর প্রসেস দীর্ঘমেয়াদী, ফলও পেতে হয় দীর্ঘ মেয়াদে। এই সরকারকে কেউ ম্যান্ডেট দেয়নি যে তারা একটা আইন করে ফেলবে নিজেদের মত করে। সরকার যদি নির্বাচিত হত অথবা একটা কমিটি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে জাস্টিফাইড করে নিত, তাহলে সেটা এক ধরনের বৈধতা পেত; এখন এটা পাবে না। আমার ধারণা পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা এই আইনকে বাতিল করে দিবেন।

আইনের খসড়ায় অসঙ্গতির অন্ত নেই
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ১১ অধ্যায় ৫৭ ধারার শিক্ষা আইন ২০২৬ এর খসড়ায় সীমাহীন অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রচলিত আইনের যেসব অসঙ্গতি বিধানে দীর্ঘদিনের দাবি-দাওয়া ও আলোচনা রয়েছে, সেসব বিষয়েও কোনো সংস্কার হয়নি এ আইনে। তারা বলছেন, আইনটি পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারেনি।

তাদের মতে, প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে, যা ১৯৯০ সালের বিদ্যমান প্রাথমিক শিক্ষা আইনেরই পুনরাবৃত্তি। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে, যা খসড়ায় উপেক্ষিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক করার বিষয়টি খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একইভাবে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও নোট-গাইড আরও তিন থেকে পাঁচ বছর চালু রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ আগের আইন ও নীতিমালায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নোট-গাইড নিষিদ্ধ এবং শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করানো নিষিদ্ধ ছিল। শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী এসব বন্ধ করার কথা থাকলেও প্রস্তাবিত আইনে তা উপেক্ষা করা হয়েছে, যা সংস্কারের মূল চেতনার পরিপন্থী।

নতুন সরকার গঠনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কোনোরকম জনসম্পৃক্তি ও জনপ্রতিনিধিত্ব ছাড়া প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন (খসড়া) প্রণয়নের বিষয়ে শিক্ষা অধিকার সংসদ উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, দেশ যখন জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এবং অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে, সে সময়ে এই আইনের অনুমোদন সময়োপযোগী নয় বলে আমরা মনে করি। অন্তবর্তী সরকারের অন্তিমলগ্নে অকস্মিকভাবে তৈরি শিক্ষা আইনের খসড়া অনুমোদন পেলে তা অংশীজনদের সার্বজনীন অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কাঠামোগত ও প্রয়োজনীয় মুক্ত নাগরিক আলোচনার গণতান্ত্রিক অধিকার  ও প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে না— প্রফেসর এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ, আহ্বায়ক, শিক্ষা অধিকার সংসদ

খসড়ায় মূলত বিদ্যমান নিয়ম, নির্দেশনা ও পরিপত্র একত্র করা হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি প্রশাসনের সুবিধা দিলেও শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সংস্কারে কার্যকর হবে না। এই খসড়ায় নতুন বা যুগোপযোগী কোনো দিকনির্দেশনা খুব কম রয়েছে এবং আধুনিক শিক্ষার প্রতিফলনও নেই। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন বা বৈপ্লবিক সংস্কারের কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা এতে অনুপস্থিত। এ ছাড়া অধিকাংশ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ভবিষ্যত বিধিমালা ও নির্বাহী আদেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি, সুখবর মিলছে না পুরোপুরি

পর্যালোচনায় তারা বলছেন, শিক্ষক নিয়োগ (এনটিআরসিএ), কওমি মাদ্রাসার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির মত সংবেদনশীল বিষয়ে আইনের ভাষা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন নিষিদ্ধ করা হলেও শাস্তির বিধান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া এই আইনে বিদ্যালয় শিক্ষা সর্বজনীন করা, বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়ানোর কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই।

আইনে নতুন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অনুপস্থিতির কথাও বলছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, একটি দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় পাঠ্যক্রম সংস্কার বা সংস্কারমূলক চেতনার প্রতিফলন এই খসড়ায় যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া শিক্ষা প্রশাসনকে জেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী করার কোনো দিকনির্দেশনাও এতে নেই। অধিকাংশ ক্ষমতা কেন্দ্রীয়ভাবে মন্ত্রণালয়ের হাতে কুক্ষিগত রাখা হয়েছে।

তারা বলছেন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামোরও অভাব রয়েছে খসড়া আইনে। আইনটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ বা স্কুলগুলোতে পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা (যেমন স্কুল টিফিন বা কাউন্সিলর নিয়োগ) নিশ্চিত করার মত বিষয়গুলো আইনের মূল ধারায় বাধ্যতামূলক করা হয়নি, বরং ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে।

আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর পঞ্চম অধ্যায়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা অংশ জুড়ে উপ-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রশাসন ও পাঠ্যতালিকা নির্ধারণের বিধান আছে। ধারা ১২-এ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে ন্যাশনাল কারিকুলাম বোর্ড (এনসিটিবি) জেনারেল পাঠ্যপুস্তক নির্ধারণ করবে এবং সব ধারায় জাতীয় শিক্ষাক্রম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, কোনো বেসরকারি বা আলাদা কারিকুলামের মাধ্যমে পরিচালিত বিদ্যালয়েও বাংলা, গণিত, বিজ্ঞানসহ সরকারি নির্ধারিত শিক্ষাক্রম অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে। এটি একদিকে সাম্যবোধ বৃদ্ধি করবে, তবে ভিন্নতর শিক্ষাক্রম (যেমন কওমি বা আন্তর্জাতিক বোর্ড) পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি শিক্ষাক্রমের স্কুলগুলোকে বাধ্যতামূলক বিষয় সংযোজন ও নন-কমপ্লায়েন্সে রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়ায় গঠনমূলক আলোচনার চেয়ে একপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণমূলক। যেমন আন্তর্জাতিক বোর্ডের স্কুলে যদি বাংলাদেশের ইতিহাস বা মুক্তিযুদ্ধ অন্তর্ভুক্ত না করে, তখন তারা ভর্তিচ্যুত হতে পারে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর মীমাংসা কেমন হবে তা স্পষ্ট নয়।

এমন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সকল অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য। খসড়া আইনে কিছু সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা, শাসন কাঠামোর অনির্দিষ্টতা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত দিকনির্দেশনার ঘাটতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে— প্রফেসর এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ, আহ্বায়ক, শিক্ষা অধিকার সংসদ

এ ছাড়া পঞ্চম অধ্যায়ের ১১ ধারায় ভর্তি নীতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষা বোর্ড দ্বারা ভর্তির নিয়মশৃঙ্খলা নির্ধারিত হবে এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য কোটা থাকবে। এটি শিশু অধিকার অনুযায়ী নমনীয়তা ব্যবস্থার বিপরীতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে জাতিগত, চরমপন্থী, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য কোনো স্পষ্ট বিশেষ বিধান (যেমন সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের জন্য আংশিক বৃত্তি, মেধা-ভিত্তিক কোটাসমূহ) উল্লেখ নেই। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ যৌনভিত্তিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ন্যূনতম কোটা আলাদা ছিল, কিন্তু খসড়া আইন সেই অনুযায়ী প্রস্তাব দেয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা উপেক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০২৬ এর খসড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে সেন্টার ফর ইন্টেলেকচুয়াল রিফর্ম অ্যান্ড থটস (সিআইআরটি)। এতে বিশেষভাবে কওমি মাদ্রাসা সংক্রান্ত বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। পর্যালোচনায় খসড়ার প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় ধারায় ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই শব্দের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত যেন তা দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ পরিপন্থী না হয়। এ ছাড়া ২(৩) ধারায় মসজিদ ও মক্তবভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমকে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা’য় অন্তর্ভুক্তির দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া ২(২৮) ধারায় ‘সাধারণ শিক্ষা’র সংজ্ঞাটি ভাষা ও ধারণাগতভাবে স্ববিরোধপূর্ণ এবং আইনগত শ্রেণিবিন্যাসের দৃষ্টিতে অস্পষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ধারায় ‘মাদ্রাসা শিক্ষা’, ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ’ এবং ‘বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের অধীন সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা’কে সাধারণ শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, আবার একই ধারার শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যতীত, মাদ্রাসা শিক্ষাসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা’। ফলে এখানে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তির যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান যেন পারিবারিক সম্পত্তি, ২৬ বছর ধরে চলছে ‘ভুয়া অধ্যক্ষ’ দিয়ে

এ ছাড়া ধারা ৮ ও ২(২০) এর মধ্যকার অসঙ্গতি নিয়েও আপত্তি তুলেছে সংগঠনটি। এতে বলা হয়েছে, যেখানে ধারা ২ এর উপাধারা ২০-এ ‘মাদ্রাসা শিক্ষা’র সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষা বলতে আলিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি কওমি নেসাবভিত্তিক মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রমকেও বোঝাবে। কিন্তু ৮ ধারায় মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর ও ধারা নির্ধারণ করতে গিয়ে ‘মাদ্রাসা শিক্ষা’কে মাধ্যমিক শিক্ষার একটি ধারা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেখানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর তাকমিল ও দাওরায়ে হাদিস সরকার কর্তৃক ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ের স্নাতকোত্তর সমমান হিসেবে স্বীকৃত। ফলে যে শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সমমান, তাকে সামগ্রিকভাবে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা’র কাঠামোর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা আইনগতভাবে যুক্তিসংগত নয়।

এতে আরও বলা হয়, চতুর্থ অধ্যায়ে ধারা ১০-এ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলা হলেও তা স্পষ্ট নয় বলে মতামত দিয়েছে সিআইআরটি। এ ছাড়া ষষ্ঠ অধ্যায়ে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর তাকমিল ও দাওরায়ে হাদিসকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তির দাবি জানানো হয়েছে। ভাষা শিক্ষা সংক্রান্ত ২৮ ধারায় ইংরেজির পাশাপাশি আরবিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সিআইআরটি বলছে, ধারা ৪২-এ ধর্মীয়, নৈতিক শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বিষয়ে একত্রে উল্লেখ করা হলেও মূল আলোচনায় ধর্ম ও নৈতিকতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

জরুরি বিষয় আইনে উপেক্ষিত
শিক্ষাবিদরা বলছেন, যেসব বিষয় প্রকৃতপক্ষে আইনের আওতাভুক্ত হওয়া প্রয়োজন— বিশেষত জরুরি, যুক্তিসংগত ও নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অনেকটাই আইন নয়, বরং বিধিমালার স্তরে স্থান পেয়েছে, যা আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি শিক্ষা আইন প্রণয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের বিদ্যমান ও প্রচলিত–অপ্রচলিত নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সেসব দুর্বলতা চিহ্নিত করা, যা শিক্ষার গুণগত উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধানের জন্য বাধ্যতামূলক আইনি ধারা সংযোজন করা। পাশাপাশি সরকার সচেতন বা অবচেতনভাবে যেসব বিষয় শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে— বিশেষ করে যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেশে গুণগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

এবারই প্রথমবারের মতো শিক্ষা আইন হচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে অনেকগুলো পৃথক পৃথক নীতিমালা, পরিপত্র হচ্ছে। এ আইন হলে সব বিষয়গুলো, এমনকি যেসব বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা আছে- সেগুলোও একটি আইনের মধ্যে আসবে। এর ফলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, অর্থ বরাদ্দের মতো বিষয়গুলোর জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি হবে— অধ্যাপক ড. সিআর আবরার, উপদেষ্টা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়

শিক্ষা আইন ২০২৬-এ নানা অসঙ্গতি থাকলেও তারা বলছেন, বেশ কিছু বিষয় রয়েছে— আইনে যেসব বিষয় একেবারেই উচ্চারিত হয়নি। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এর কোনো স্তরে কোনো ধরনের পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন না করা, কওমি মাদ্রাসায় আধুনিক ও প্রাসঙ্গিক জ্ঞান প্রদান নিশ্চিত করা, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয় শিক্ষার মূলধারার সাথে সমন্বয় করা, অনলাইন ও ডিজিটাল শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির সুস্পষ্ট উল্লেখ, স্ব-স্ব ধর্মের মাধ্যমে ব্যবহারিক নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলককরণ, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পরামর্শ সেবা উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষা অধিকার সংসদের আহ্বায়ক প্রফেসর এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রস্তাবিত খসড়া শিক্ষা আইনটিতে এক দিকে যেমন বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়সমূহই মূলত প্রাধান্য পেয়েছে, অন্যদিকে এতে নেই ভবিষ্যতমুখী সংস্কার, কাঠামোগত পরিবর্তন ও গুণগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দিকনির্দেশনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন । যেসব বিষয় প্রকৃতপক্ষে আইনের আওতাভুক্ত হওয়া প্রয়োজন (বিশেষত জরুরি, যুক্তিসংগত ও নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়) সেগুলো অনেকটাই বিধিমালার স্তরে স্থান পেয়েছে, যা আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আরও পড়ুন: তত্ত্বীয় গবেষণাই সার, পেটেন্ট শূন্যতায় দেশীয় গবেষকরা

শিক্ষা আইন-২০২৬ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন আইন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সকল অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য। খসড়া আইনে কিছু সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা, শাসন কাঠামোর অনির্দিষ্টতা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত দিকনির্দেশনার ঘাটতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা আইন প্রণয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের বিদ্যমান ও প্রচলিত–অপ্রচলিত নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সেসব দুর্বলতা চিহ্নিত করা, যেগুলো শিক্ষার গুণগত উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, সেগুলোর কার্যকর সমাধানের জন্য বাধ্যতামূলক আইনি ধারা সংযোজন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকার সচেতন বা অবচেতনভাবে যেসব বিষয় শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, বিশেষ করে যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে দেশে গুণগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

প্রফেসর এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহর মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশিত একটি স্বাধীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থায়ী শিক্ষা সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষা খাতের সামগ্রিক সংস্কার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করা যায়নি। তিনি বলেন, এই প্রেক্ষিতে শিক্ষা অধিকার সংসদ বিনীতভাবে প্রস্তাব করছে যে, শিক্ষা আইন ২০২৬ বর্তমান পর্যায়ে অনুমোদন না দিয়ে বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হোক, যাতে সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়।

এ বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আইনটির খসড়ার বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার গণমাধ্যমকে বলেন, এবারই প্রথমবারের মতো শিক্ষা আইন হচ্ছে। শিক্ষা নিয়ে অনেকগুলো পৃথক পৃথক নীতিমালা, পরিপত্র হচ্ছে। এ আইন হলে সব বিষয়গুলো, এমনকি যেসব বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা আছে- সেগুলোও একটি আইনের মধ্যে আসবে। এর ফলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, অর্থ বরাদ্দের মতো বিষয়গুলোর জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি হবে।