২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১২

২০২৭ সালে মানুষের বেকার হওয়ার কারণ হবে এজিআই, গুরুত্ব বাড়বে যে ৫ চাকরির

এআইয়ের কারণে চাকরি হারাতে পারে ৯ কোটি মানুষ  © আনন্দবাজার

বিগত কয়েক বছর ধরে চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা-উদ্বেগ বাড়ছেই। কৃত্রিম মেধার রমরমার প্রকোপ কি পড়ছে চাকরির বাজারে? সাম্প্রতিক সময়ে এই ভয়ই চেপে বসেছে বিশ্ব জুড়ে। ‘চাকরি গেল, চাকরি গেল’ রব চারদিকে। অনেকেই দাবি করছেন, চাকরির বাজারে ভবিষ্যতে ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। 

আর ২০২৭ সালের প্রথম দিকে আসতে পারে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান কমতে পারে ব্যাপক হারে। এ সময়ে ৫ ধরনের চাকরিতে দক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে।

কৃত্রিম মেধার আগ্রাসী প্রসারের কারণেই বিভিন্ন সংস্থা মানবসম্পদের বোঝা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে। বিশেষজ্ঞদের মুখেও তেমন আশঙ্কার কথা উঠে আসছে বার বার। আশঙ্কা ছড়িয়েছে, বিশ্ব জুড়ে অনেক চাকরি কেড়ে নেবে এআই। এর প্রভাব পড়বে কম-বেশি সব দেশেই। কৃত্রিম মেধা দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে বহু সংস্থাই কর্মীসঙ্কোচনের পথে হাঁটবে। ফলে চাকরির বাজারে হাহাকার দেখা যাবে। উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি পেতে দম বেরোবে তরুণ সমাজের।

বিগত কয়েক বছর যাবৎ চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা-উদ্বেগ চলছেই। তবে এ বার এক অন্য কথা শোনা গেল ভারতের অন্যতম বড় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ইনফোসিসের চেয়ারম্যান নন্দন নীলেকণির মুখে। বিশ্ব অর্থনীতিতে, বিশেষ করে চাকরির উপর কৃত্রিম মেধার প্রভাব সম্পর্কে ইনফোসিস কর্তা নীলেকণির সাম্প্রতিক উপস্থাপনা ইন্টারনেটে ঝড় তুলেছে। 

বেঙ্গালুরুতে ইনফোসিসের ‘এআই ইনভেস্টর ডে ২০২৬’-এ উপস্থিত হয়ে তিনি দাবি করেছেন, এআই বিভিন্ন ব্যবসাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করছে যা আগে অন্য কোনও প্রযুক্তি করেনি। সে দিক থেকে নজির তৈরি করেছে কৃত্রিম মেধা।

এআইয়ের তরঙ্গ প্রযুক্তিগত চাকরির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাবে বলেও মনে করছেন ইনফোসিসের চেয়ারম্যান। তার মতে, এই ‘এআই বিপ্লব’ ভারত জুড়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত অনেক প্রযুক্তিবিদকে সরিয়ে দেবে। পথ প্রশস্ত করবে নতুন এআই-ভিত্তিক চাকরির। নীলেকণির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআইয়ের কারণে বর্তমানে ৯ কোটিরও বেশি চাকরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

নীলেকণি দাবি করেছেন, এআইয়ের যুগে ফ্রন্ট-এন্ড ডেভেলপার, কিউএ পরীক্ষক, আইটি সহায়তা বিশেষজ্ঞ, ব্লকচেইন ডেভেলপারদের মতো নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনের জন্য প্রশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারেরা আর প্রাসঙ্গিক নন। চাকরি হারাতে পারেন তারা। তার বিশ্লেষণ, ওই চাকরি কে়ড়ে নেওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসাবে ‘এআই ডেটা অ্যানোটেটর’, ‘এআই ফরেন্সিক অ্যানালিস্ট’, ‘এআই লিড’, ‘এআই ইঞ্জিনিয়ার’ এবং ‘ফরোয়ার্ড ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’ হিসাবে কমপক্ষে ১৭ কোটি চাকরির সুযোগও খুলে দেবে কৃত্রিম মেধা।

নীলেকণি বলেন, ‘আমরা যেমন একই ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারি না, তেমনই প্রতিভাকেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।’ তিনি এমন ভবিষ্যতের বর্ণনা করেছেন যেখানে কোড লেখা আর কারও লক্ষ্য থাকবে না। পরিবর্তে মনোযোগ দেওয়া হবে প্রযুক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে।

ইনফোসিসের চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দিশা দেখাবে এমন ৫টি নতুন চাকরির ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের রূপান্তরের বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরারও চেষ্টা করছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এখন তাদের বাজেটের ৬০-৭০ শতাংশ ব্যয় করছে শুধুমাত্র পুরোনো সিস্টেমেকে এআইয়ের জন্য মানানসই করার জন্য।

পেশাদারদের সমাজমাধ্যম লিঙ্কডইন এবং নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্ট্যানফোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও নীলেকণির উপস্থাপনা বিশ্লেষণ করে এআই ‘ওয়ার্কপ্লেস সিস্টেম’ তৈরিতে যে পাঁচটি চাকরির চাহিদা তৈরি হতে পারে, সেগুলো উঠে এসেছে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে। কী সেই পাঁচ চাকরি?

এই তালিকার প্রথমেই রয়েছে এআই ইঞ্জিনিয়ার। তথ্যপ্রযুক্তি হাবগুলিতে কর্মপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্য লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) এবং কাস্টম এআই তৈরি, উপস্থাপন এবং নজরদারি এআই ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ। তালিকায় এর পরে রয়েছে এআই ফরেন্সিক অ্যানালিস্ট বা বিশ্লেষকের চাকরি। 

সাইবার আক্রমণ, ডেটা লঙ্ঘন এবং হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনায় ডিজিটাল প্রমাণ শনাক্তকরণ, সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করার জন্য মেশিন লার্নিং, এআই অ্যালগরিদম এবং স্বয়ংক্রিয় সরঞ্জাম ব্যবহার করা এআই ফরেন্সিক বিশ্লেষকদের কাজ। এআই ফরেন্সিক বিশ্লেষকেরা তথ্য সুরক্ষা এবং কোনও তথ্য খুঁজে পাওয়ার জন্য এলএলএমগুলিও পর্যবেক্ষণ করেন। 

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার জন্য বিশাল, জটিল ডেটা সেটগুলি স্বয়ংক্রিয় ভাবে পরীক্ষা করে ‘প্যাটার্ন’ শনাক্ত করার কাজও করেন এই কর্মীরা। চাহিদা তৈরি হতে পারে ‘ফরোয়ার্ড-ডেপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’দেরও। ফরোয়ার্ড-ডেপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ারেরা কেবল একটি ল্যাবে বসে কাজ করার পরিবর্তে গ্রাহকদের (যেমন ব্যাঙ্ক বা হাসপাতাল) সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন। 

মূলত গ্রাহকদের সিস্টেম এআই-নির্ভর করতে এবং সেই সংক্রান্ত কোনও সমস্যা সমাধানের কাজ করেন ফরোয়ার্ড-ডেপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ারেরা। এ ছাড়াও তালিকায় রয়েছে ‘এজেন্টিক ওয়ার্কফ্লো আর্কিটেক্ট’। এই কর্মীদের সাধারণত এআই কর্মী বা এজেন্ট ডিজ়াইন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যাঁরা সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া স্বায়ত্তশাসিত ভাবে পরিচালনা করতে পারেন। ভবিষ্যতে এআই-নির্ভর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই চাকরির চাহিদা অনেক বেশি হবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

তালিকায় পাঁচ নম্বর এবং শেষ যে চাকরির কথা বলা হয়েছে, তা ‘ডেটা অ্যানোটেটর’-এর চাকরি। এ কর্মীরা কৃত্রিম মেধার প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ ডেটা গুছিয়ে রাখেন এবং সরবরাহ করেন। এত দিন এই চাকরির চাহিদা কম হলেও, ভবিষ্যতে তা আকাশ ছোঁবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে।

চাকরির বাজারে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তরুণ পেশাদার এবং শিক্ষার্থীদের এআই নিয়ে পড়াশোনা করা এবং তা শেখার বিষয়ে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। এআই-নির্ভর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন চাকরির সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞেরা আশা দেখালেও কয়েক দিন আগেই এক এআই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম মেধার দ্রুত অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই কর্মক্ষেত্রকে নতুন করে রূপ দিতে পারে। 

আরও পড়ুন: মাতৃভাষা দিবসে ২১ টাকায় ২.১ জিবি ইন্টারনেট কেনার সুযোগ, জেনে নিন নিয়ম

তাঁর দাবি, এআইয়ের জন্য ২০২৭ সাল থেকে শুরু করে পাঁচ বছরের বাজার থেকে উধাও হয়ে যাবে ৯৯ শতাংশ চাকরি। কেবল ৫টি চাকরিই টিকে থাকতে পারে। ওই এআই বিশেষজ্ঞের নাম রোমান ইয়াম্পোলস্কি। তিনি লাটভীয় বংশোদ্ভূত রোমান কম্পিউটার বিজ্ঞানী। লুইসভিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজও তিনি করেন। 

রোমান দাবি করেছেন, ২০২৭ সালের প্রথম দিকে আসতে পারে আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান কমতে পারে ব্যাপক হারে। একটি পডকাস্টে স্টিভেন বার্টলেটের সঙ্গে কথোপকথনের সময় ওই দাবি করেছেন রোমান। 

তিনি জানিয়েছেন, মানুষের চেয়ে প্রতিটি মেধা সংক্রান্ত কাজ আরও ভাল ভাবে করতে সক্ষম হবে এজিআই। রোমানের মতে, এর পরিণতিস্বরূপ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাজার থেকে ৯৯ শতাংশ চাকরি চলে যাবে। চাকরিজীবীদের চাকরি খেয়ে সেই কাজ করবে এজিআই।

শুধু রোমান নন, এআই নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগের কথা শুনিয়েছিলেন মাইক্রোসফ্‌টের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেমানও। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, খুব খুব শিগগিরই বেশিরভাগ ‘হোয়াইট কলার’ চাকরি কেড়ে নিতে পারে কৃত্রিম মেধা। আর তা হতে পারে বছরখানেকের মধ্যেই। 

শুধু কোডারেরা নন, আইনজীবী এবং হিসাবরক্ষকের মতো পেশাদাররাও তাঁদের কাজ এআইয়ের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় ভাবে করতে পারবেন। ফলে এই সব ক্ষেত্রে কমবে পেশাদারদের চাহিদা। তেমনটাই দাবি করেছেন মুস্তাফা। খবর: আনন্দবাজার।