প্রতিবন্ধী বিউটি এখন অনুপ্রেরণা

পা দিয়ে লিখছেন রাবি ছাত্রী বাসিরাতুন জান্নাত বিউটি
পা দিয়ে লিখছেন রাবি ছাত্রী বাসিরাতুন জান্নাত বিউটি   © টিডিসি ফটো

অল্পতেই হাল ছেড়ে বিরক্ত হয়ে যারা আশেপাশের জগতটার ওপর দোষ চাপান, শারীরিক অপারগতাকে যারা সকল সফলতায় বাঁধা মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি নেই, এমন অজুহাতে যারা আফসোস করেন এবং বলেন মেয়ে হয়ে জন্মেছি, কী আর করবো— তবে গল্পটি আজ তাদের জন্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আইন বিভাগে অধ্যয়নরত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী বাসিরাতুন জান্নাত বিউটি। জন্ম থেকেই নেই তার দুটো হাত। আছে শুধু দুটো পা। দুই হাত না থাকায় জন্মের পর দেখেছেন জীবনের কঠিন বাস্তবতা। তারপরও থেমে যাননি এই শিক্ষার্থী। ইচ্ছে ছিলো ভালোভাবে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবেন।

যেমন দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি, তেমনি আগ্রগতি বিউটির। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য উৎসাহ নিয়ে পা দিয়ে লিখেই নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ভর্তি হয়েছেন দেশের সনামধন্য বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার শিবপুর গ্রামের বায়েজিদ ও রহিমা দম্পতির গরিব ঘরের অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী বিউটি। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। পরিবারের পাঁচ সদস্যদের মধ্যে বিউটি সবার ছোট। ছোটোবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন এই শিক্ষার্থী। হাত না থাকলেও দুই পায়ের জোরে (পা দিয়ে লিখে) পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছেন জিপিএ-৫। এইচএসসিতে পেয়েছেন ‘এ’ গ্রেড।

যদি থাকে অদম্য সাধনা আর দৃঢ় ইচ্ছে শক্তি, তবে কোনো বাধা-ই যেন বাধা নয়। ঠিক তেমনি এক অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন রাবির এই হার না মানা শিক্ষার্থী। দুই হাত না থাকলেও বিউটি কখনো করো দয়ার পাত্র হননি। গ্রামের আট-দশজনের মতোই তরকারি কাটা, পেঁয়াজ কাটা, রান্না করাসহ দৈনন্দিনের গৃহস্থালীর প্রায়  সব কাজ অনায়াসে করতে পারেন বিউটি।

মেয়েকে নিয়ে মা রহিমা বেগমের এখন অনেক স্বপ্ন। তিনি বলেন, প্রথমে মেয়েকে নিয়ে অনেক চিন্তিত ছিলাম। প্রতিবন্ধী মেয়ে কি করবে, কোথায় যাবে? তবে না, এখন স্বপ্ন দেখছি, আমার মেয়েও একদিন অনেক বড়ো কিছু হবে।

ছোটোবেলায় শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও বিউটি এখন স্বপ্ন দেখেন আইনজীবী হওয়ার। তিনি বলেন, এসএসসি শেষ করার পর স্বপ্ন দেখতাম শিক্ষক হবো। এখন যেহেতু আইন বিভাগে পড়ছি সে সুবাধে দেশের স্বনামধন্য একজন আইনজীবী হতে চাই। তাছাড়া সর্বপরি মানুষের সেবা করা যায় এমন কাজে যুক্ত থাকারো ইচ্ছে এই শিক্ষার্থীর।

সংগ্রামী এই পথ চলার অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিবারের ভূমিকার কথা তুলে ধরে বিউটি বলেন, আমার এতদূর আসার পেছনে সব সময় সহযোগিতা করেছে আমার পরিবার। তারা যদি আমাকে সহযোগিতা না করতো তাহলে আজকের অবস্থানে আসতে পারতাম না।

এছাড়া সেই ছোটোবেলায় স্কুলজীবন থেকেই শিক্ষক, বন্ধুদের অনেক সাহায্য পেয়েছি। পরিবার, প্রতিবেশী সবাই আমাকে অনেক সহযোগিতা করছে। সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতায় আমি এতোদূর আসতে পেরেছি, যোগ করেন বিউটি।

অদম্য এই শিক্ষার্থীর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, সাংবাদিক ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে জেনেছি। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে আসার পরে ও করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সরাসরি তাকে দেখার সুযোগ হয়নি। সে আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। হাজার প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সে পিছিয়ে যায়নি। প্রতিবন্ধী হলেই যে কিছু করা যায় না, সেই প্রথাকে ভেঙে দিয়েছে বিউটি। আমাদের বিভাগে ভর্তি হয়েছে তার জন্য আমরা গর্বিত। বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় অবশ্যই তা করা হবে বলেও জানান তিনি।


সর্বশেষ সংবাদ