১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৩৪

শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে তারেক রহমান কি পরিবর্তনের প্রতীক?

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান  © ফাইল ছবি

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার পতনের পর ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী পদে মতামত জরিপে এগিয়ে আছেন তিনি। তার এই রাজনৈতিক উত্থানের বিস্তারিত উঠে এসেছে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে।

প্রায় মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ঢাকার উত্তরে গাজীপুর জেলায় পোশাকশিল্প অধ্যুষিত এলাকায় তখনও হাজার হাজার মানুষ একটি নির্বাচনী সমাবেশে জড়ো হচ্ছিলেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য শোনার জন্য অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন। গত ডিসেম্বর মাসে তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি দলটির হাল ধরেছেন।

বিএনপি নেতারা বিপুল উপস্থিতিকে প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছেন যে, শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে নিপীড়নের শিকার হলেও সমর্থকদের সংগঠিত করতে এবং শক্তি পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে দলটি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরতে চায়।

গত বছর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে বিএনপি বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী, যারা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক ছাত্রনেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।

১৭ বছর যুক্তরাজ্যে প্রবাস জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার প্রচারণা শেষ হওয়া পর্যন্ত তার সমাবেশগুলোয় বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় গ্রেপ্তার, দলীয় বিভক্তি এবং ভোটারদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া বিএনপির পুনরুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী তাৎপর্য, দৃশ্যমান, সহজপ্রাপ্য এবং সম্মুখ সারি থেকে নেতৃত্ব দেওয়া—দলের তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এ সমর্থনের শিকড় রয়েছে তার বাবা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারে, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার আগে বিএনপির রাজনীতির ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন।

নেতাকর্মীদের এ উৎসাহের পাশাপাশি ক্রমেই এক ধরনের অস্বস্তিও দেখা দিচ্ছে। ফলে এবারের নির্বাচন যেমন প্রত্যাশায় ভরা, তেমনি সংশয়ও আছে।

নেতৃত্বের পরীক্ষা: নির্বাসন থেকে নিয়ন্ত্রণে
১৭ বছর ধরে লন্ডন থেকে কার্যত বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। ভার্চুয়াল যোগাযোগ ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করে তিনি দল চালিয়েছেন, যখন দেশে দলের শীর্ষ নেতারা বিশেষ করে তার মা খালেদা জিয়াসহ গ্রেপ্তার, মামলা ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন। দেশে ফেরার পর তার নেতৃত্ব বাস্তব রূপ পেলেও, আগের প্রতীকী নেতৃত্বকে কার্যকর সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এর একটি বড় উদাহরণ হলো দলীয় শৃঙ্খলা। দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ৭৯টি আসনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচন করছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় বিভক্তির বিষয়টি সামনে এনেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা বেশি মনে হচ্ছে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির কর্মীরা জড়িত। এ তথ্য দলটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপির শৃঙ্খলাহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

‘এটি একটি বড় দুর্বলতা’, আল-জাজিরাকে বলেন তিনি। ‘এখনো দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি তিনি। বিদ্রোহী প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে প্রকাশ্যেই চ্যালেঞ্জ করছে।’

হাসানুজ্জামান মনে করেন, পারিবারিক উত্তরাধিকার তারেক রহমানের জন্য নির্বাচনী সুবিধা বয়ে আনছে। কিন্তু তার মতে, এই উত্তরাধিকারই তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তার ভাষ্য, ‘খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের মতো নেতাদের ছাপিয়ে যাওয়া সহজ নয়। আমি এখনো তার মধ্যে সেই মাত্রার ক্যারিশমা দেখিনি।’

দিলারা চৌধুরীর মতে, এই নির্বাচনই তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা। সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও যদি তিনি দলকে জয়ের পথে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে সেটিই হবে একজন স্বতন্ত্র নেতা হিসেবে তার প্রথম বড় সাফল্য।

‘খুব কম প্রস্তুতি’
তারেক রহমানের জনসমক্ষে বক্তব্যও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তৃতায় উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি ও তথ্যগত ভুল একসঙ্গে থাকায় বিশেষ করে অনিশ্চিত ভোটারদের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তার একাধিক বক্তব্যের ফ্যাক্ট-চেক সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফরিদপুরের এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, ওই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদিত হয়। কিন্তু দ্রুতই সে দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কারণ ফরিদপুর সয়াবিনের প্রধান উৎপাদন এলাকা নয়; এটির চাষ মূলত উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।

আরেক ঘটনায়, ভাইরাল হওয়া একটি গ্রাফিকে তার কিছু প্রতিশ্রুতিকে বিদ্রূপ করা হয়—যেগুলোর অনেকটাই হয় আগে থেকেই বাস্তবায়িত, অথবা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়কার পুনরাবৃত্তি। এর মধ্যে চট্টগ্রামকে দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ ঘোষণা করার প্রস্তাবও ছিল।

বিশ্লেষক ও দলের ভেতরের লোকজন বলছেন, এসব ঘটনা তারেক রহমানের প্রস্তুতি ও নেতৃত্বে ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। দক্ষিণ বাংলাদেশের এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি বক্তব্যে ভুল করেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে তিনি উন্নতি করবেন।’

দিলারা চৌধুরীর মতে, প্রস্তুতির অভাব একটি বড় সমস্যা। তিনি পুরো প্রচারণার দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু প্রস্তুতি খুবই কম। ৫০ কোটি গাছ লাগানোর মতো অবাস্তব কথা বলছেন—যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি তারেক রহমানের প্রধান নীতিগত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, যেমন নারীদের ও বেকারদের জন্য মাসিক ভাতা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা।

‘এ ধরনের পরিকল্পনায় অর্থ আসবে কোথা থেকে—এ প্রশ্নের উত্তর নেই। আর দীর্ঘমেয়াদে বেকার ভাতা দিলে অর্থনীতি কম উৎপাদনশীল হয়ে পড়তে পারে।’ দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন চৌধুরী। ‘তিনি দুর্নীতি দূর করার কথা বলছেন, অথচ নির্বাচনে ২৩ জন ঋণখেলাপিকে মনোনয়ন দিয়েছেন।’

সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান এসব উদ্বেগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। অতীতের ভুল স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনাই একমাত্র পথ। ক্ষমতা পেলে বিএনপি দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ কঠোর হবে, এটাই জাতির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।’

‘যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য’
শুক্রবার ঢাকার একটি বিলাসবহুল হোটেলে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষ বসানো জরুরি।’ তবে বিশ্লেষক ও দলের অভ্যন্তরের অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এ নীতি তার প্রচারণা দল গঠনে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা।

বিএনপির এক নেতা বলেন, লন্ডন থেকে ফেরা উপদেষ্টাদের প্রভাবেই তারেক রহমানের জনসংযোগ কৌশল বদলে গেছে। ‘তার সঙ্গে যাঁরা এসেছেন, তাঁরাও ১৭ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। এই সময়ে বাংলাদেশ অনেক বদলে গেছে, তারা বাস্তবতা বুঝতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারেক রহমানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সীমিত রাখা হচ্ছে।

‘তিনি সারা দেশ ঘুরছেন ঠিকই, কিন্তু তৃণমূল বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নই থেকে যাচ্ছেন।’ এ নেতা অভিযোগ করেন, তারেক রহমান ‘যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। দল চালানো যায় অনুগত লোক দিয়ে, কিন্তু সরকার চালানো যায় না।

আরও পড়ুন: জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান: যার সঙ্গে সবাই এখন দেখা করতে চায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, তারেক রহমান এখন ‘কঠিন অবস্থানে’ আছেন। ভূমিধস জয় না হলে তাকে দায়ী করা হবে। আর বড় জয় হলে বলা হবে, এটাই স্বাভাবিক। তার জন্য স্পষ্ট কোনও জয় নেই। তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু, দুটোরই মূল হলো তার রাজনৈতিক বংশপরিচয়।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে তিনি একটি রাজনৈতিক ‘রাজবংশের’ প্রতিনিধিত্ব করেন। অনেক তরুণ ভোটার এ রাজনীতির বাইরে যেতে চাইলেও, এই উত্তরাধিকার এখনো দেশজুড়ে মানুষকে সংগঠিত করছে। তবে বিএনপি নেতারা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অস্বাভাবিক নয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যদি কেউ সক্ষম, জবাবদিহিমূলক ও জননজরদারির আওতায় থাকেন, তাহলে পারিবারিক পরিচয় অযোগ্যতার কারণ হতে পারে না।’

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য আরও জটিল। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক খান সুবায়েল বিন রফিক বলেন, ‘তারেক রহমান ব্যক্তি হিসেবে এক বিষয়, বিএনপি দল হিসেবে আরেক বিষয়। আমি তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু দল হিসেবে বিএনপির সামগ্রিক পারফরম্যান্স দুর্বল।’

অন্যদিকে দিলারা চৌধুরীর মতে, বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের একটি অংশ বিএনপির জয় চায়, কারণ তারা পরিচিত একটি স্ট্যাটাসে ফিরতে চান, যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। 

তারেক রহমানের জন্য এ নির্বাচন তাই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি একটি গণভোট, তার প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও নতুন অধ্যায়, নাকি পুরোনো চক্রের পুনরাবৃত্তি? গত সোমবারের ভাষণে তিনি বলেন, ‘অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি অনিচ্ছাকৃত কোনও ভুল হয়ে থাকে, আমি আন্তরিকভাবে জনগণের কাছে ক্ষমা চাই। সে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে, আমাদের অর্জনের ওপর ভিত্তি করে আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই।’