দেশে দেশে ভাষার লড়াই ও ৫২’র ভাষা আন্দোলন

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০৪ PM
ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী দৃশ্য এবং লেখক ফয়সাল আকবর

ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী দৃশ্য এবং লেখক ফয়সাল আকবর © ফাইল ফটো

ভাষা- মানুষের ভাব বিনিময়ের সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। ভাষাকে বলা যায় সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে মূল্যবান একটি উপহার। এ মূল্যবান উপহারের মধ্যে আরও মূল্যবান হলো ‘মাতৃভাষা’। মাতৃভাষায় ভাব বিনিময় যে কত মধুর তা কখনো লেখনীতে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মাতৃভাষার সম্মান রাখতে গিয়ে দেশে দেশে লড়াই-সংগ্রাম কম হয়নি। সেসব লড়াইয়ের মধ্যে বাঙ্গালির আত্মদান পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে এবং থাকবে। বাঙালি তাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মর্যাদাবান করতে রক্ত ঝরিয়েছে, জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, সৃষ্টি করেছে আত্মত্যাগের মহান ইতিহাস। যে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সৃষ্টি হয় নতুন একটি জাতিরাষ্ট্র- স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ভাষা আন্দোলের প্রচলিত বয়ানে একটি ভুল তথ্য আমাদের বাচ্চাদের, ছাত্রদের শেখানো হয়; পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় পাতায়ও লেখা হয়- পৃথিবীতে বাংলাদেশের বাঙালীরাই একমাত্র জাতি যারা আপন মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এবং বুকের রক্ত ঝরিয়েছে। সঠিক তথ্য হলো, পৃথিবীর আরও অনেক জাতি ভাষার জন্য বুকের রক্ত ঝরিয়েছে এবং জীবন দিয়েছে। ভারতের আসাম প্রদেশেও বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন ১১ জন। তামিলনাড়ুতে তামিল ভাষার জন্য যে রক্তপাত ঘটেছে, তা পৃথিবীতে নজিরবিহীন। নিঃসন্দেহে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙ্গালীর আত্মত্যাগ পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। কিন্তু একমাত্র জাতি হিসেবে যে প্রচার-প্রচারণা তা অনেকাংশেই অতিশয়োক্তি।

ভাষা নিয়ে কিংবা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লাটভিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ পৃথিবীর নানা জায়গায় সংগ্রাম হয়েছে, মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছে। প্রথমেই আমরা চোখ দিতে পারি, আমাদের পার্শ্ববতী ভারতে দিকে। ভারতের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দেশটির স্বাধীনতারও আগের। ১৯৩৭ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির স্থানীয় কংগ্রেস সরকার স্কুলে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করলে ভাষা নিয়ে প্রথম আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৩৯ সালে দুই আন্দোলনকারী পুলিশি হেফাজতে মারা গেলে আন্দোলন চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। অবশেষে তুমুল প্রতিবাদের মুখে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি সরকার হিন্দিকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

ভাষাকে কেন্দ্র করে ভারতে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ-সংগ্রাম হয় ১৯৬৫ সালে। তবে এর সূচনা ১৯৫০-এ, তখন হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে আইন পাস হলেও তখন তেমন কোন প্রতিবাদ বা আলোচনা দেখা যায়নি। ১৯৬৫-তে এসে আইনটি কার্যকর হলে শুরু হয় প্রতিবাদ-সংগ্রাম। শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। প্রায় দুইমাস যাবত দাঙ্গা হয় মাদ্রাজে। পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখেই ১৯৬৭ সালে হিন্দির সঙ্গে ইংরেজিকেও ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এখনো ভারতে আইনগতভাবে ‘রাষ্ট্রভাষা’ কিংবা ‘জাতীয়ভাষা’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয় না। বর্তমানে ভারতে ২২টি ভাষাকে সরকারি ভাষা এবং ৪টি ভাষাকে ঐতিহ্যবাহী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

এছাড়া স্বাধীন ভারতে বাংলা ভাষাকে আসামে প্রাদেশিক ভাষা করার দাবিতে ১৯৬১ সালে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাও ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ। আসাম প্রদেশে অসমিয়াকে একমাত্র প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সরকারের এই অবিচারের প্রতিবাদে বাংলা ভাষাভাষীরা রাস্তায় নেমে আসে। গড়ে তোলে আন্দোলন। সেই আন্দোলনে সামরিক বাহিনী গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৯ জন। পরে বুলেটবিদ্ধ আরও দুজন হাসপাতালে মারা যান। এই ঘটনার পর ভারতজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে এবং আসাম রাজ্য সরকার বাধ্য হয়ে অসমিয়াকে একমাত্র প্রাদেশিক ভাষা করার আইন বাদ দিয়ে বাংলাকেও অন্যতম প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়।

নানা দেশে ভাষার জন্য যে লড়াই-সংগ্রাম হয়েছে, সেসব লড়াইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ৫২’র বাংলা ভাষা আন্দোলনের কিছুটা মিল পাওয়া যায়। দুটো আন্দোলনের মূলে ছিল ছাত্ররা। তবে পার্থক্য হল বাংলাদেশে নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আর দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বে ছিল স্কুলের ছাত্ররা। দক্ষিণ আফ্রিকার গাউটাং এর জোহানসবার্গ শহরের সোয়েটোতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন। গাউটাং কর্তৃপক্ষ আফ্রিকানার ভাষায় শিক্ষাদান স্কুলে বাধ্যতামূলক করলে স্কুলের শিশু-কিশোররা প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। কারণ তারা তাদের মাতৃভাষা জুলু এবং ব্যবহারিক লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজিতে শিক্ষা নিতে বেশি আগ্রহী ছিল।

তৎকালীন বর্ণবাদী সরকার প্রতিবাদ সভায় গমনরত ছাত্রদের মিছিলে গুলি করলে ২০ জনেরও অধিক মানুষ নিহত হয়, যাদের প্রায় সবাই শিশু-কিশোর! কোমলমতি শিশুদের আত্মত্যাগের খবর দাবানলের মতো সোয়েটো থেকে ছড়িয়ে পড়ে পাশের শহর প্রিটোরিয়া, ডারবান ও কেপটাউনে। ১৯৭৬ সালের এই আন্দোলনে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৪৫১ জন মারা যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণবাদী সরকারের উদ্যোগ ভেস্তে যায় এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের কার্যক্রম বেগবান হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় আজো দিনটি বিশেষ স্মৃতির মধ্য দিয়ে পালন করা হয়।

আমেরিকাতে গত শতাব্দীতে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় নেটিভ আমেরিকান ভাষা রক্ষার দাবিটি অন্যতম ছিল। বহু বছর নেটিভ আমেরিকান ভাষাগুলো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট থাকায় অনেক ভাষার মৃত্যু হয়। এমনই প্রেক্ষাপটে গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় এই নেটিভ আমেরিকান ভাষা রক্ষার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে আমেরিকার বিভিন্ন নেটিভ, আদি ও স্থানীয় ভাষা রক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য আইন পাস করে সরকার।

কানাডার পূর্ব অংশের অঙ্গরাজ্য কুইবেকের রাজনীতিতেও ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কুইবেক রাজ্যের ফ্রেঞ্চবাসী স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাওয়ার দরুন ভাষার প্রশ্নে স্বাধীনতা চেয়েছিল। ফলে ১৯৮০ সালে এবং ১৯৯৫ সালে দুই দফায় ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়। সে আন্দোলনের তীব্রতা কমে গেলেও তাদের ‘স্বাধীনতা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ থেমে যায়নি।

ভাষার প্রশ্নে লাটভিয়ানদের ভূমিকাও ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। রুশ ভাষাকে দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা করার প্রশ্নে ২০১২ সালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে রুশ ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করেন লাটভিয়ানরা। যদিও রুশ সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকাকালে কয়েকশ বছর ধরে রুশ ভাষাই ছিল লাটভিয়ার প্রধান ভাষা।

বেলজিয়ামে ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ ছাড়া ইউরোপের বলকান অঞ্চল, স্পেনের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, আফ্রিকার গোল্ড কোস্ট অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষা নিয়ে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় আন্দোলন হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি কিংবা তৎকালীন মেক্সিকোর উত্তরাংশে আন্দোলন হয়েছে স্প্যানিশ-ইংরেজি নিয়ে। এমনই অসংখ্য লড়াই সংঘটিত হয় মায়ের ভাষা-মাতৃভাষাকে মর্যদাবান করার, যা ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে আছে।

মায়ের ভাষা-মাতৃভাষা রক্ষা কিংবা মর্যদাবান করার দেশে দেশে যে লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলন হয়েছে সেখানে ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন এক অনন্য ঘটনা। এই আন্দোলনের বিশেষত্ব হল- এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙ্গালীর জাতীয় চেতনা; যার চূড়ন্ত ফল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের। তাই বাঙালী জাতির সহস্র বছরের ইতিহাসে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। মুলত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও বাঙ্গালীয়ানার জোয়ার ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্য দিয়েই এসেছে।

একুশের চেতনার প্রভাব থেকেই ছয় দফা, ছাত্রদের ১১ দফা ও মওলানা ভাসানীর ১৪ দফা- যার সম্মিলিত ফলই হলো উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান। আর চূড়ান্ত ফল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই এটা বলা যায়, ৫২’র ভাষা আন্দোলন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার এবং ৫২’র চেতনা বাঙ্গালীকে একটি জাতিরাষ্ট্র উপহার দিয়েছে এবং ৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারিতে সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরের আত্মত্যাগ ‘২১ ফেব্রুয়ারি’-কে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত করেছে।

দেশে দেশে ভাষার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁদের সবার প্রতি রইল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

লেখক: সিনিয়র লেকচারার, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
এবং ৩৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত

৪৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ চলতি মাসেই
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
কৃষি গুচ্ছের বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দক্রমের ফল আজ, ভর্তি …
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
বিদ্যুৎ পরিদর্শকের মৌখিক পরীক্ষা ১ ফেব্রুয়ারি
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
ইউটিউব থেকে বাড়তি আয়ের ৩ কৌশল
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
এখন প্রতারিত বোধ করছেন ইরানের বিক্ষোভকারীরা
  • ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9