তারাবি নামাজ ৮ রাকাত পড়া যাবে কি, ইসলামিক স্কলারদের ব্যাখ্যা
বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আবারও উপস্থিত হলো পবিত্র রমজান মাস। আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) থেকে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সিয়াম সাধনা বা রোজা রাখা শুরু করেছেন।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় দেশের আকাশে রমজানের চাঁদ উঠার পর রাতেই এশার নামাজের পর সারা দেশের মসজিদে মসজিদে শুরু প্রথম তারাবির নামাজ মাধ্যমে শুরু হয় প্রথম রোজার আনুষ্ঠানিকতা।
রমজানের এই বিশেষ নফল ইবাদতকে কেন্দ্র করে মুসল্লিদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন আলোচনায় থাকে তারাবি ৮ রাকাত পড়া যাবে কি, নাকি ২০ রাকাতই আদায় করতে হবে?
ইসলামিক স্কলারদের মতে, রাসুল (সা.) তার জীবনের শেষ রমজানে মাত্র দুই বা তিন দিন জামাতে তারাবি আদায় করেছিলেন। বুখারি শরীফের হাদিস অনুযায়ী, তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে নিয়মিত জামাতে পড়লে এটি উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যেতে পারে। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল (সা.) রমজান বা অন্যান্য সময়ে ১১ রাকাতের বেশি নামাজ পড়তেন না, এর মধ্যে ৮ রাকাত তারাবি ও ৩ রাকাত বিতর অন্তর্ভুক্ত। এই হাদিসকে ভিত্তি করে অনেক আলেম মনে করেন ৮ রাকাত তারাবি পড়া সুন্নাহসম্মত এবং বৈধ।
অন্যদিকে খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সময় মুসলমানদের জামাতে একত্রিত করে ২০ রাকাত তারাবি পড়ানোর প্রথা চালু করেন। সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই পদ্ধতি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে অনুসৃত হতে থাকে। বিশেষত উপমহাদেশে হানাফি মাযহাব অনুসারে, ২০ রাকাত তারাবি সুন্নতে মুয়াক্কাদা হিসেবে গণ্য।
আরও পড়ুন: সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন শিক্ষামন্ত্রী
বিখ্যাত মুজতাহিদ ও ইমামগণ যেমন ইবনে তাইমিয়া ও ইমাম সুয়ুতি এই দুই মতের মধ্যে সমন্বয় করেছেন। তাদের মতে, কেউ যদি রাসুল (সা.)-এর মতো দীর্ঘ কেরাত দিয়ে নামাজ পড়তে চান, তাহলে ৮ রাকাত যথেষ্ট। আর যারা সাধারণ মুসল্লি এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর মনে করেন, তাদের জন্য ২০ রাকাত আদায় করা উত্তম।
বিখ্যাত ইসলামিক স্কলার শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে কেউ চাইলে তারাবির নামাজ ৪, ৬ বা আরও কম রাকাত পড়তে পারেন, এতে কোনো সমস্যা নেই।
মিজানুর রহমান আজহারীও উল্লেখ করেছেন, তারাবির নামাজের রাকাত নিয়ে বিতর্ক করা উচিত নয়। ৮ বা ২০ রাকাত যেভাবেই পড়া হোক, তা গ্রহণযোগ্য। সৌদি আরবের মক্কা-মদিনা মসজিদে ২০ রাকাত পড়া হয়, আবার অনেক মসজিদে ৮ রাকাত পড়া হয়; এ নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। আলেমদের মতে, আল্লাহর দরবারে কোনো আমল সংখ্যার বিচারে গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং উত্তমতার বিচারে গ্রহণযোগ্য হবে।
মূল কথাটি হলো, তারাবি একটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ নফল বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ। রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিবাদে না জড়িয়ে একাগ্রতার সাথে দীর্ঘ সময় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়াই রমজানের মূল শিক্ষা।
শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী মুসল্লিরা নামাজের রাকাত সংখ্যা সমন্বয় করতে পারেন। যারাই দীর্ঘ কেরাত পড়তে সক্ষম, তাদের জন্য ৮ রাকাত যথেষ্ট। আর যারা সহজভাবে নামাজ আদায় করতে চান, তাদের জন্য ২০ রাকাত আদায় করা যেতে পারে। এভাবে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভিন্ন মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও তারাবির নামাজের ফজিলত বজায় থাকবে এবং রমজানের আসল উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।