দেশে গবেষণাপত্র প্রকাশ বাড়লেও মোট প্রকাশনায় অবস্থান ভারত-পাকিস্তানের পেছনে, কারণ কী?
দেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশের হার বাড়ছে, কিন্তু মোট প্রকাশনার সংখ্যার দিক থেকে এশিয়ায় অবস্থান ভারত-পাকিস্তানের পেছনে। অনলাইন ম্যাগাজিন সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে গবেষণাপত্র প্রকাশ বেড়েছে ২০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই হারে ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেলেও মোট প্রকাশনার সংখ্যার দিক থেকে এখনও এ দুই দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।
স্কোপাস-ইনডেক্সড জার্নাল, কনফারেন্স প্রসিডিংস ও বইয়ের সিরিজে দেশের মোট গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৫ হাজার ৪১৩টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৮ হাজার ৬১৩টিতে দাঁড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যানে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ভারতে গবেষণাপত্র প্রকাশের হার ৯.০১ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৬.৮০ শতাংশ বেড়েছে।
তবে মোট সংখ্যার হিসাবে, ভারতের গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬১৭টি থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭৮২টিতে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রকাশনা ৪২ হাজার ৩৫৩টি থেকে বেড়ে ৪৫ হাজার ২৬০টিতে দাঁড়িয়েছে।
দেশে গবেষণাভিত্তিক ফলাফলকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রাজনীতি কোথাও গবেষণাকে মূল্য দেয়া হচ্ছে না। আমরা গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে দেখছি না। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যা ভালো মনে করেন অথবা রাজনীতিবিদরা যা ভালো মনে করেন অথবা বিদেশী চাপ, ইকুয়েশন, হিসাব, প্রফিট, ব্যক্তিগত লাভালাভ, সুযোগ-সুবিধা, গোষ্ঠীগত সুযোগ-সুবিধা এই সব কারণে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে, গবেষণাকে প্রাধান্য না দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে গবেষণা হয় না। এসব কারণে গবেষক গবেষণায় নিরুৎসাহিত হয়, গবেষণা করে না। যদি গবেষণা গবেষণার গুরুত্ব দেয়া হতো, গবেষণার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, তাহলে গবেষণা ও গবেষণাপত্র বাড়ত -মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কেবল মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। দেশ দুটির প্রবৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৫২.৭ শতাংশ ও ৪৭.৫৩ শতাংশ। যদিও তাদের মোট প্রকাশনার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে গবেষণার শীর্ষ তিনটি ক্ষেত্র ছিল প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান। তবে এই বছর দেশে নতুন কোনো পেটেন্ট নিবন্ধিত হওয়ার রেকর্ড পাওয়া যায়নি। মোট এক হাজার ৭৩১টি প্রকাশনা নিয়ে গবেষণার তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকপ্রতি গবেষণাপত্র প্রকাশের হার এখনও গড়ে ১-এর নিচেই রয়ে গেছে।
গবেষণাপত্র প্রকাশে পিছিয়ে থাকার পেছনে আদর্শ পরিবেশ, গবেষণার যথাযথ মূল্যায়ন ও পর্যাপ্ত অর্থের যোগান না থাকাকে দায়ী বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে যে গবেষণা টা কেন হয়? আমরা বলি যে গবেষণার মূল কাজ হলো ইনোভেশন। কোন একটা বিষয়ে গবেষণা করে গবেষক ফলাফল প্রকাশ করে গবেষণা জার্নালে। এখন বিভিন্ন চাকরির জন্য নিয়ম করে দিচ্ছি গবেষণাপত্র থাকা লাগবে। কিন্তু গবেষণাই যদি না হয়, তবে গবেষণাপত্র আসবে কোথ থেকে? মূলত আমাদের গবেষণার যথাযথ পরিবেশ নেই।
দ্বিতীয়ত, দেশে গবেষণাভিত্তিক ফলাফলকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য রাজনীতি কোথাও গবেষণাকে মূল্য দেয়া হচ্ছে না। আমরা গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে দেখছি না। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যা ভালো মনে করেন অথবা রাজনীতিবিদরা যা ভালো মনে করেন অথবা বিদেশী চাপ, ইকুয়েশন, হিসাব, প্রফিট, ব্যক্তিগত লাভালাভ, সুযোগ-সুবিধা, গোষ্ঠীগত সুযোগ-সুবিধা এই সব কারণে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে, গবেষণাকে প্রাধান্য না দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে গবেষণা হয় না। এসব কারণে গবেষক গবেষণায় নিরুৎসাহিত হয়, গবেষণা করে না। যদি গবেষণা গবেষণার গুরুত্ব দেয়া হতো, গবেষণার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, তাহলে গবেষণা ও গবেষণাপত্র বাড়ত।
এছাড়া গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের যোগান নেই। যার কারণে কেউ চাইলেও গবেষণা করা বা গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে আগ্রহ পাচ্ছেন না। গবেষণার বরাদ্দ নাই। গবেষণার যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তাতে কিচ্ছু হয় না, কাগজ-কলম বা প্রিন্টের টাকা হয় না বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।
আরও পড়ুন : যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমাই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি: শিক্ষামন্ত্রী
এদিকে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো এই র্যাঙ্কিংয়ে জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা (৭০টি প্রকাশনা)। গবেষণাপত্র প্রকাশের তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এরপরেই চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম স্থানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
শীর্ষ দশের তালিকায় থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি)।
২০২৫ সালের সবচেয়ে বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করা তিন গবেষক হলেন এআইইউবির এম ফিরোজ মৃধা, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আহমেদ ওয়াসিফ রেজা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম।
বাংলাদেশি গবেষকরা মোট ১১টি ভাষায় গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, এগুলোর বেশিরভাগই ছিল ইংরেজিতে। আর বাংলা ভাষায় কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় অর্থায়নকারী শীর্ষ ১৫ সংস্থার মধ্যে ৯টি বিদেশি। অন্যদিকে দেশীয় অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং এর পরেই রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে গবেষণায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত সীমিত অংশগ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।