ফেনীতে ক্লাসে ফিরছে না অনেক শিক্ষার্থী

ফেনীতে ক্লাসে ফিরছে না অনেক শিক্ষার্থী
শিক্ষার্থী  © সংগৃহীত

মহামারি করোনার ধাক্কায় দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল-কলেজ খুলে দেয়া হয়েছ। প্রতিষ্ঠান খুললেও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা কর্মকর্তাদের উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ করেছেন অনেক অভিভাবক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে এক মাস। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এখনও শিক্ষার্থী কম। এদের অনেকে ঝরে পড়েছে বলে আশঙ্কা শিক্ষকদের। দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কী পরিমাণ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, তা নির্ধারণ করতে পারিনি না শিক্ষা অধিদপ্তর।

এছাড়াও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে চোখে পড়ার মত তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, তারা উদ্যোগ নেবেন। আর অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের বকেয়া টাকা মওকুফ করে দিলে অনেক শিক্ষার্থী ফিরে আসবে।

এমনি ঝরে পড়া শিক্ষর্থী ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার উত্তর চর সাহাভিকারী এলাকার রবিউল ইসলাম ছিল কাজীর হাট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। এবার তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার কথা, কিন্তু করোনার দীর্ঘ ছুটিতে বাবার চাকরি চলে যাওয়ায় তার পরিচয়ই বদলে গেছে।

রবিউল এখন অটোরিকশাচালক। প্রতিদিন দিন আয় সে সন্ধ্যায় তুলে দেয় মায়ের হাতে। তার ওপর তৈরি হয়েছে পরিবারের নির্ভরশীলতা। তাই বিদ্যালয়ে ফেরা নিয়ে পরিবার থেকেও কোনো রকম তাগিদ নেই।

এ বিষয় শিক্ষার্থী রবিউলের সাথে কথা হলে সে বলে, বাবা-মা ও তারা দুই ভাই নিয়ে চার সদস্যের পরিবার। তার বাবা একটি ওয়ার্কশপে চাকরি করতেন। বড় ভাইও বাবার সঙ্গে কাজ শিখতেন। করোনাকালে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় ওয়ার্কশপের চাকরি চলে যায়। একই সঙ্গে তার ভাইও বেকার হয়ে পড়ে। পরে সংসারের হাল ধরতে রবিউল রিকশা চালানো শুরু করে। তার ভাই গ্রামে গ্রামে ফেরি করে সবজি বিক্রি করছে।

সে আরও জানায়, তাদের দুই ভাইয়ের রোজগারের টাকা দিয়ে বাবার ওষুধ খরচ আর পরিবারের খরচ চলে। সবজি বিক্রি করে তার ভাই তেমন লাভ করতে পারে না। পরিবারের কথা ভেবে রিকশা চালানো ছাড়তে পারছে না। তবে রিকশা চালানোর পাশাপাশি তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, কিন্তু মা-বাবা দুজনই অসুস্থ হওয়ায় একই সঙ্গে কীভাবে দুদিক সামাল দেবে, ভেবে পাচ্ছে না।

আরেক কিশোর রিকশাচালক মো. সফিক জানায়, মহামারিতে মাদারাসা বন্ধ থাকায় ঘরে বেকার বসে না থেকে এলাকার একজনের কাছ থেকে দৈনিক ১০০ টাকায় ভাড়ায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নেয় সে। সে একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। দীর্ঘ বিরতির পর মাসুদের মাদ্রাসা খুলেছে। কিন্তু পরিবারের চাহিদা মেটাতে শ্রেণিকক্ষে ফেরা হচ্ছে না মাসুদের।

মাসুদ আরও বলে, তারা চার ভাই-বোন কিন্তু বাবা বেঁচে নেই। এত দিন বড় ভাইয়ের আয়ে পরিবার চলত, কিন্তু করোনাকালে ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছেন। এরপর থেকে সংসারের খরচ চালানো নিয়ে তার মা বেকায়দায় পড়েছেন। ঘরে ছোট এক বোন আছে। সংসারের হাল ধরতে রিকশা চালানো পেশায় তাকে যোগ দিতে হয়েছে। এখন রিকশা চালানো বাদ দিলে তার মা আর বোন বেকায়দা পড়বে।

জেলার বিভিন্ন দোকানে, ওয়ার্কশপে ও যানবাহনে কাজ করা অন্তত ১০-১২ কিশোরের সঙ্গে কথা হয়। তারা করোনাকালে পরিবারের কথা চিন্তা করে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার কাহিনি শোনায়।

এ বিষয় কথা হয় ডা. ফারুকুর রহমান নামের এক অভিভাবকের সাথে তিন বলেন, করোনাকালে বন্ধ থাকা বকেয়া বেতন মওকুফ করলে অনেক শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আবু জায়েদ নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমি রিকশাচালক। আমার ছেলে স্কুলে গেলে স্যারেরা টাকা খুঁজে। সে জন্য আর স্কুলে দিচ্ছি না।’

ফেনী সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, কলেজজীবনে অনেকে ঝরে যায়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় আর ছেলেরা বিদেশে অথবা কর্মজীবনে চলে যায়। তবে আমার দেখা অনেক ছাত্র-ছাত্রী শুধু করোনার কারণে ঝরে গেছে, যারা পড়াশোনায় ভালো ছিল, যাদের ফ্যামিলিও শিক্ষিত ছিল। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় অনিশ্চিত গন্তব্য দেখে তারা পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে।

ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী শাওরীন তাবাসসুম ইফরান বলেন, আমাদের ক্লাসের তিন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। তারা পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিল।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খোন্দকার মহিউদ্দিন বলেন, কয়েকজন ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখনও সব ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিত হয়নি। এই সপ্তাহে বোঝা যাবে কতজন অনুপস্থিত। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু শিক্ষার্থী শিশুশ্রমে চলে গেছে।

এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. নুরুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত ঝরে পড়ার সংখ্যা নির্ণয় করা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কিছু শিক্ষার্থী ঝরে যাবে। তাদের ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকদের বোঝানোর জন্য আমরা শিক্ষকদের বলেছি। ফেনী জেলায় ৫৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সবকটি চালু করা হয়েছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার কাজী সলিম উল্যাহ জানান, ফেনী জেলায় ২০০টি মাধ্যমিক স্কুল, ১০৫টি মাদ্রাসা, ৩৪টি সরকারি-বেসরকারি ও প্রাইভেট কলেজ রয়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে গেছে কি না, সেটি আমরা জরিপ করছি। তবে আমরা কিছু উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পালন করব, যাতে করে যেসব শিক্ষার্থীকে এখনও ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে, তাদের আনা যায়।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ