সমাজ বদলাতে গল্প বলেন রিফাত
হুসাইন রিফাত লিখতে ভালোবাসেন। কখনো লেখেন সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে, কখনো অসহায়ের পাশে দাড়াতে। আবার কখনো লেখেন কেবলই মনের খোরাক মেটাতে। হঠাৎ একদিন রিফাতের মাথায় লেখার পরিবর্তে গল্প বলার চিন্তা এলো। সেই লক্ষ্যে তৈরি করলেন ‘দ্য বেঙ্গলি স্টোরি টেলার’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম। চারপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার কথা বলতে ও শুনতে এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেন তিনি।
চট্টগ্রামে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হুসাইন রিফাত। পড়ছেন চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষে। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার জাহানপুরে। ২২ বছর বয়সী হুসাইন রিফাত, জীবনের এই ছোট্ট সময়ে নিজেকে প্রমাণ করার দৌড়ে কোনো অংশেই যে পিছিয়ে ছিলেন না, সেটা তো গল্পই বলে দিবে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে জনপ্রিয় অনলাইন ‘শিক্ষাঙ্গন টেন মিনিট'স স্কুলের গ্লোবাল এম্বাসেডরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা। তবে লেখালেখির চর্চা শুরু হয় ২০১২ সাল থেকে। তখন থেকেই গল্প লেখা শুরু করেছিলেন হুসাইন রিফাত। তবে শুধু গল্প লেখার মাধ্যমে যে নিজের অনুভূতিটা পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন, সেটা বোধহয় আগেই অনুমান করেছিলেন। তার নিজের মুখ থেকেই জানা যাক ‘দ্য বেঙ্গলি স্টোরি টেলার’ এর গড়ে ওঠার গল্প।
''আগেও লেখালেখি করেছি কমবেশি। তবে আমার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ২০১৮ সাল। বছরটা আমাকে দু'হাত ভরে দিয়ে গেছে। এইতো গত বছরের জুন মাসের ঘটনা। চট্টগ্রামের হালিশহরে আমার এক বান্ধবীর মা পানিবাহিত কারনে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে তিনদিনের মাথায় ঈদের আগের দিন মারা যায়। তবে হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি সবাইকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। তাছাড়া নিউজ পোর্টালগুলোও ছিলো নিরব। তবে আমি সেই নিরবতা কাটাতে চেয়েছিলাম। আর তাই আমার সাধ্যের মধ্যে থাকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে 'অ্যাটেনশন হালিশহরবাসী 'You are at risk!' শিরোনামে একটি সচেতনতামূলক আর্টিকেল লিখেছিলাম। আমি চেষ্টা করেছি তাদের সমস্যাগুলো এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে বিস্তারিত লেখার। তবে আরও বিস্মিত হয়েছি আমার কাঁচা হাতের লেখাটির ছড়াছড়ি দেখে। কারন একদিনে ১০ হাজার শেয়ার দেখে আমি রীতিমত অবাক হয়েছিলাম। সেখান থেকেই শুরু। বিভিন্ন নিউজ পেপারেও বিষয়টি উঠে আসে। টেলিভিশনের কয়েকজন রিপোর্টারও যোগাযোগ করেছিলো আমার সাথে। এরপর বিষয়টি সবার দৃষ্টিগোচর হলে ওয়াসা থেকে একটি টিম পাঠানো হয়। মোটামুটি সংস্কারও হয়েছিলো, যা কখনো হওয়ার সম্ভাবনাও ছিলো না।
পরের ঘটনাটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জিনিয়া আপুর ১৮ মাস বয়সী মেয়ে রাওদাকে নিয়ে। ৫০ শতাংশ ব্রেইন ড্যামেজ হয়ে যাওয়া অসুস্থ আদুরে রাওদার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিলো ২৩ লাখ টাকা। যা আমাদের ৪০ জনের একটা টিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে সহ বেশকিছু ক্যাম্পেইন করে এই বিশাল অংকের টাকাটা তুলেছিলো মাত্র দুই সপ্তাহে। আমি নিজেই এতে অনেকবেশি উৎসাহিত হই। এরপর থেকে পরিচিত অপরিচিত অনেকেই আমাকে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলাে। তারপর বিভিন্ন সমাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে লেখালেখি শুরু করি। আমার লেখাগুলো একটু বড় ছিলো। যার ফলস্বরূপ কিছুদিন পরেই আমার সুবিস্তৃত লেখাগুলোর পাঠক যে কমে আসছিলো, বিষয়টা বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম আমি। তাই নতুন কোনো মাধ্যম খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। মানুষের মাঝে প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছানোর জন্য।
প্রসঙ্গত, আগে থেকেই টুকটাক ভিডিও এডিটিং এর কাজ জানা ছিলো। বিভিন্ন সময় ভ্রমনের ভিডিও ইডিটিং করে ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর অভিজ্ঞতা ছিলো আমার। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ভিডিও ইডিটিং আর লেখালেখি, দুটোর সমন্বয়ে কিছু একটা করার। তারপর স্টোরিটেলিং (গল্প-কথক) প্ল্যাটফর্ম তৈরির বিষয়টি মাথায় আসে আমার। তাছাড়া ২০১৭ সালেও নিজের বানানো বেশকিছু গল্পের ভিডিও আপলোড করেছিলাম 'নেভার বিন বেটার' নামক নিজের একটি পেইজে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র আদনান ইসফারের স্কুলের সামনেই সহপাঠীদের হাতে খুন হওয়ার ঘটনা নিয়ে 'হু ইজ দ্য নেক্সট' শিরোনামে একটি ভিডিও বানাই। সেটাবেশ সাড়া জাগিয়েছিলো।
পরে মার্চ মাসে আমার মাকে নিয়ে 'মা দ্য সুপার ওম্যান' নামক আরো একটি গল্পের ভিডিও প্রকাশ করি। সেই গল্পেও বেশ সাড়া পেয়েছিলাম আমি। পরে 'নেভার বিন বেটার' পেইজটাকেই 'দ্য বেঙ্গলি স্টোরিটেলার' প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে নিয়ে আসি। আর দ্য বেঙ্গলী স্টোরিটেলারে আমার সাথে স্টোরিটেলার হিসেবে প্রথম থেকেই কয়েকজন বড় ভাই ফয়সাল মাহমুদ,আকিবুল ইসলাম, ইসহাক খান ছিলেন। যাদের সহযোগিতা না পেলে এমন একটা পূর্নাঙ্গ প্লাটফর্ম তৈরী করা আমার একার পক্ষে সম্ভব হতো না। তবে প্রথমদিকে কেউ কেউ নিরুৎসাহিত করলেও অনেকেই এটাকে খুব সহজে গ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া আমি নিজেও জানতাম না এমন কোনো স্টোরিটেলিং প্ল্যাটফর্ম যে এর আগে বাংলাদেশে ছিলো না। আর তাই মাঝে মাঝেই বন্ধুবান্ধব মজা করেই বলতো, দেশের প্রথম স্টোরিটেলিং প্লাটফর্ম হতে যাচ্ছে 'দ্য বেঙ্গলি স্টোরিটেলার'।
যতদূর মনে পড়ে, ছোটবেলায় বাড়ির উঠোনে এমন গল্পের আসর দেখেছিলাম। তবে কালের বিবর্তনে এসব হারিয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি। এখন আর কারো অন্যের গল্প শোনার সময় পর্যন্ত নেই। তবে সেটাকে একটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আনার চেষ্টা করেছি আমি। আমার স্বপ্ন ছিলো, গল্প বলার একেকটা ইভেন্ট হবে। যেখানে সবাই নিজের গল্প শোনাবে আর শ্রোতা হয়ে অনেকেই সেটা শুনবে। ২০১৮ সালে আমরা আমাদের পেইজে ৭টি গল্পের ভিডিও রিলিজ করি। এর মধ্যে সমীকরন বনাম ভালোবাসা,সাদা কফিনের অভিমান, Dont Share Private Photo, Engineering Life ছিল অন্যতম। নতুন বছরে দ্য বেঙ্গলী স্টোরিটেলারে বেশ কিছু লাইভ ইভেন্ট যুক্ত করতে যাচ্ছি আমরা। আশাকরি বাছাইকৃত গল্পগুলো সবার ভালো লাগবে।"
অপরচুনিটিজ ফর কিডস
এছাড়া ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় জুলাই মাসে স্টোরিটেলারের পাশাপাশি 'অপরচুনিটিজ ফর কিডস' (Opportunities For Kids) নামক ৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর কিশোরীদের জন্য একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরী করি আমরা। যেখানে আমার সাথে ছিলো সাহিফা ইফরাদ রিয়া, সাদমান সাকিব, রাব্বি ,ইসমাত ,সৃষ্টি, সানজিদ সহ বেশ কয়েকজন।
সেখানে কিশোর কিশোরীদের জন্য ফ্রিতে অনলাইন ভিত্তিক আর্ট, ক্রাফট, ক্যালিগ্রাফি, রোবটিক্স, প্রোগ্রামিংসহ ১২টি বিষয়ে দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা করেছি আমরা। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস থেকে আমাদের পেইজ এবং ইউটিউব চ্যানেলে সেই সংক্রান্ত টিউটোরিয়াল ভিডিও আপলোড করা শুরু করি। তিন মাসের মধ্যেই বেশ সাড়াও পেয়েছি আমরা। দেশ বিদেশের অনেক জায়গা থেকেই ছেলেমেয়েরা আমাদের পেইজের ইনবক্সে তাদের কাজের ছবি দিয়ে সক্রিয় রয়েছে। বর্তমানে অপরচুনিটিজ ফর কিডস'র ১৭ জন এক্সিকিউটিভ মেম্বার এবং ৬০ জন ট্রেইনার রয়েছে। এছাড়াও সার্বিক সহযোগীতায় রয়েছে ১০ জন বোর্ড মেম্বার এবং এডভাইজর। আমরা ইতোমধ্যে এটাকে অ্যাপস এবং ওয়েবসাইট ভিত্তিক সেবায় পরিণত করার কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে আমাদের হাতে প্রায় ৬০টিরও বেশি টিউটোরিয়ালের ভিডিও রয়েছে। মানসম্মত ভিডিও আপলোড করে কমপক্ষে ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে ফ্রিতে ১২টা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা। অ্যাপস এবং ওয়েবসাইট তৈরী হলে এবছর আমাদের সেবা আরও বাড়াতে পারবো বলে আমরা আশাবাদি।