১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৩৯

‘পড়ালেহা কইরা শিক্ষক হমু’

  © টিডিসি ফটো

‘আমি অনেক দিন ধইরা ইশকুলে যাই না। আমার মায়ের সাথে কাজ করি। তয় এখন বিকেলে স্বপ্ন পূরণ স্কুলে যাই। আমার স্বপ্ন, পড়ালেহা কইরা শিক্ষক হমু।’ হাসিমাখা মুখে এই কথাগুলো বলছিল খাদিজা।

পরিবারের অভাব অনটনের কারণে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তার। বাধ্য হয়ে তাকে পড়াশোনার পরিবর্তে করতে হতো গৃহস্থালীর কাজ। অথচ তাদের ছোট্ট ঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে খাদিজার স্বপ্ন তাকে অনেক বড় হবার হাতছানি দিত। খাদিজার এই স্বপ্নকে পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে কিছু উদ্যমী তরুণ। শুধু খাদিজা নয় খাদিজার মতো এমন অনেক দ্ররিদ্র শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে এই তরুণরা গড়ে তুলেছে স্বপ্ন পূরণ বিদ্যানিকেতন নামে একটি স্কুল। বরিশালের গলাচিপা পৌর এলাকার ১নং ওয়ার্ডের পুরান লঞ্চঘাটের পাশের বটতলার নিচে মাদুর বিছিয়েই চলে বিদ্যালয়ের পাঠদানের কাজ।  

বরিশাল বিএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র ও গলাচিপা ছাত্র কল্যাণ সমিতির সভাপতি সাকিব হাসান এবং স্থানীয় বেসরকারি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক রুবায়েত হাসান রাসেলের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। 

সাকিব হাসানসহ গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের চার শিক্ষার্থী তৌকিক রাইয়ান সাকিব, তানভির হোসাইন রিফাত, অমিত হাসান অকিব, জিতু আহমেদ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কলেজ পড়ুয়া এসব শিক্ষার্থী পালাক্রমে সপ্তাহে ছয় দিন বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। 

বিদ্যালয়ের সাথে জড়িতরা জানান, ২৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এ বছর বিদ্যালয়টি চালু হয়। মূলত: ঝরে পড়া দরিদ্র শিশুদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিতে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। 

বিদ্যালয়ে আসা শিশুদের বিনা পয়সায় বই-খাতাসহ চিকিৎসা সক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধাও প্রদান করা হয়ে থাকে। লেখাপড়া ও বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিদিন চকলেট, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করে উৎসাহিত করা হয়। 

এক ঝাঁক তরুণের এই মহতি উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও সহযোগিতা করছেন গলাচিপা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. রফিকুল ইসলাম, গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফোরকান কবির, গলাচিপা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হালিম, সিনিয়র সাংবাদিক শংকর লাল দাশ, সমাজকর্মী সর্দার মু. শাহ আলমসহ কয়েকজন গুণী ব্যক্তি।

বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, বটগাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে বসে আছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কখনো সরব পাঠ আবার কখনো লেখালেখিতে ব্যস্ত শিশুরা।এদের একেকজন স্বপ্ন দেখে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ অফিসার কিংবা আরো বড় কিছু হবার। পড়ার ফাঁকে চলে খেলাধুলা, গান, আবৃত্তি ও অভিনয়। আর এসবের পরে ছুটির সময় বিস্কুট বা চকলেট পেয়ে উল্লাস করে বাড়ি ফিরে যায় শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয় সম্পর্কে গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফোরকান কবির বলেন, স্কুলটি আমি প্রায়ই পরিদর্শনে যাই। ছাত্ররা যে উদ্যোগটি নিয়েছে এর প্রশংসা করি। আমরা সবাই এগিয়ে এলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিটি এলাকায় ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা কমে আসবে।

উদ্যোক্তা সাকিব হাসান বলেন, জেলে সম্প্রদায়ের সন্তানদের দেখতাম তারা বাবা-মা এর সাথে মাছ ধরছে। এরা ভর্তি হলেও বিদ্যালয় যায় না। এসব অসচ্ছল পরিবারের শিশুদেরকে বিদ্যালয়মুখী করতে আমাদের এ উদ্যোগ। এভাবে সকল তরুণদের চেষ্টা ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতায় অবহেলিত এই শিশুদের স্বপ্ন পূরণ হবে। এরকম প্রচেষ্টায় একদিন বাংলাদেশ থেকে নিরক্ষতার অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে।