‘যুব সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ পরিসর’
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে প্রতিবছর ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০০ সাল থেকে বিভিন্ন প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘যুব সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ পরিসর’ এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে পালিত হচ্ছে এবারের আন্তর্জাতিক যুব দিবস।
এখানে নিরাপদ পরিসর বলতে এমন একটি স্থান বা ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে যেখানে যুবকরা মিলিত হবে, তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও আগ্রহের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হবে, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে এবং নিঃসংকোচে নিজেদেরকে প্রকাশ করবে। নিরাপদ পরিসর যুবদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। নিরাপদ নাগরিক পরিসর যুবদের সুশাসন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করে ক্ষমতায়িত করতে পারে।
জনপরিসর উন্মুক্ত থাকলে সেখানে যুবদের জন্য খেলাধুলা ও অবসর সময়ে বিভিন্ন কার্যক্রম সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে ডিজিটাল পরিসর যুব সম্প্রদায়কে ভৌগোলিক ও সামাজিক সীমানা ছাড়িয়ে নানা ধরনের যোগাযোগ স্থাপনে সাহায্য করছে। পরিকল্পিত অবকাঠামোগত পরিসর বিভিন্ন পর্যায়ের যুব, বিশেষত যারা সহিংসতা ও প্রান্তিকীকরণের শিকার তাদের প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করে।
তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রের যুব নারী-পুরুষ, বিশেষত মূলধারার বাইরে যাদের অবস্থান, তাদের সম্মান ও গুণাবলীকে তুলে ধরতে হবে এবং এভাবেই যুবদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপদ পরিসর নিশ্চিত করতে হবে। মানবিক বিপর্যয় বা দ্বন্দ্বপ্রবণ পরিবেশে, নিরাপদ পরিসরের অভাবে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশের ক্ষেত্রে যুবকরা নিজেদেরকে অস্বস্তিকর বা অবাঞ্ছিত মনে করতে পারে। একইভাবে, নিরাপদ পরিসর না পেলে বিভিন্ন জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্মীয় সংহতি বা সাংস্কৃতিক পটভূমির যুবকরা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবাধে অংশগ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে। যখন যুবদের নিরাপদ পরিসর নিশ্চিত হবে, তখন তারা কার্যকরভাবে শান্তি ও সামাজিক সংহতিসহ উন্নযনে অবদান রাখতে পারবে।
আমরা জানি, ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের উদ্দেশ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১১ নং লক্ষ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থায়িত্বশীল নগরায়ণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিসরের সুযোগ থাকার উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, জাতিসংঘের নিউ আরবান এজেন্ডাতেও (New Urban Agenda-NUA) পারিবারিক সম্পর্কোন্নয়ন ও সৃজনশীল আন্ত-প্রজন্ম সংলাপে যুবদের ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে জনপরিসরের গুরুত্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। যুব উন্নয়নে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক বা ওয়ার্ল্ড প্রোগ্রাম অব একশন ফর ইয়ুথ (World Programme of Action for Youth –WPAY) যুব জনগোষ্ঠীর মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক উন্নয়নে তাদের ‘অবসর সময়ের কার্যক্রম’কে প্রয়োজনীয় হিসেবে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে।
যেহেতু দিনদিন যুব সম্প্রদায় প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিশ্বের সাথে বেড়ে উঠছে, তারা রাজনৈতিক, নাগরিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর সাথে আরো গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার আশা করে। সেজন্য নিরাপদ পরিসরের উপস্থিতি ও সেখানে যুবদের অভিগম্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে এখন সামনে চলে এসেছে।
ইতিমধ্যে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায় ওয়েভ ফাউন্ডেশন প্রডিজি (যুবকদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক এবং স্থানীয় সরকারে অন্তর্ভুক্তির প্রচার) প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে যুব সমাজের নেতৃত্বের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার এবং কমিউনিটির যৌথ অংশগ্রহণে উন্নয়নমুলক সামাজিক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সমসাময়িক নেটওয়ার্কের অনুশীলনসমূহ বিনিময়ের পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রমাণ করেছে যে, যথাযথ প্রশিক্ষণ, উৎসাহ এবং সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে যুব নেতৃত্বের বিকাশ এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে যুবসমাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
এই ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় সরকারের যৌথ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ যুবসমাজকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে ও একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে সমাজের পক্ষে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কর্মএলাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে মে ২০১৭ থেকে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২৪ মাস মেয়াদি এ প্রকল্প স্থানীয় সরকারে শান্তিপূর্ণ এবং অর্থপূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, বহুমুখীনতা এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে নাগরিক সম্পৃক্ততার পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং তাদের স্থানীয় কমিউনিটিতে শান্তিপূর্র্ণ পরিবেশ ও সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।
উপরন্তু এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুব সম্প্রদায় উন্নয়নমূলক সামাজিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে। এছাড়াও তারা উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্বকে নিশ্চিত করবে এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে অবদান রাখবে।
অর্থাৎ, এ প্রকল্পটি এবারের যুব দিবসের প্রতিপাদ্য ‘যুব সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ পরিসর’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্রিয় অবদান রাখছে। আন্তর্জাতিক যুব দিবসে এ প্রতিপাদ্য বিষয়টি আরো গভীরভাবে উপলব্ধিতে আসবে এবং যুব সম্প্রদায়ের জন্য নিরাপদ পরিসর সৃষ্টির প্রচেষ্টা সকলের অংশগ্রহণে আরো বিস্তৃতি লাভ করবে।